মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
লেখক, দাঈ ও গবেষক
সন্তান লালন-পালনে একজন মায়ের ভূমিকার গুরুত্ব আমরা প্রায়ই শুনি, এবং যথার্থভাবেই শুনি। মা সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম আশ্রয় এবং ভালোবাসার সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা। কিন্তু একজন বাবার ভূমিকাও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং সন্তানের ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা, শিক্ষা, আদর্শ, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে বাবার সক্রিয় উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন বাবার দায়িত্ব শুধু সন্তানদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা কিংবা পরিবারের আর্থিক চাহিদা পূরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সন্তানকে খাবার, পোশাক ও শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি তাকে মানুষ করে তোলাও একজন বাবার দায়িত্ব। তাকে শেখাতে হবে সত্য কথা বলতে, অন্যের অধিকার সম্মান করতে, দুর্বলকে সহযোগিতা করতে, বড়দের সম্মান করতে এবং ছোটদের স্নেহ করতে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর।”
—সূরা আত-তাহরীম, ৬
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবারের দায়িত্ব শুধু পার্থিব জীবনের প্রয়োজন পূরণ করা নয়; বরং তাদের ঈমান, আমল ও আখিরাতের নিরাপত্তার ব্যাপারেও দায়িত্বশীল হওয়া।
একজন বাবার উচিত সন্তানকে শুধু পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা না করে আখিরাতেও সফল করার চেষ্টা করা। তার ভালো স্কুল, ভালো ফলাফল ও ভালো পেশার জন্য যেমন চিন্তা করবেন, তেমনি তার নামাজ, কুরআন, চরিত্র, হালাল-হারামের জ্ঞান এবং আল্লাহভীতির জন্যও চিন্তা করবেন।
সন্তানের প্রয়োজন এমন একজন বাবা, যিনি শুধু প্রয়োজনের সময় পাশে থাকবেন না; বরং তার আনন্দ-বেদনা বুঝবেন, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন, ভুল হলে ভালোবাসা দিয়ে সংশোধন করবেন, সঠিক পথে চলার পরামর্শ দেবেন এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে প্রজ্ঞার সঙ্গে দিকনির্দেশনা দেবেন।
অনেক সন্তান বাবার কাছে অর্থ চায় না, তারা চায় একটু সময়। তারা দামি খেলনা চায় না, চায় বাবার সঙ্গে একটু হাঁটতে। তারা সবসময় বড় কোনো উপহার চায় না, কখনো কখনো শুধু চায়—বাবা তার কথা মন দিয়ে শুনুক।
কর্মব্যস্ত একজন বাবা হয়তো মনে করেন, “আমি তো সন্তানের জন্যই এত পরিশ্রম করছি।” কিন্তু সন্তান হয়তো অপেক্ষা করছে—কখন বাবা কাজ থেকে ফিরে তাকে একবার জিজ্ঞেস করবেন, “আজ তোমার দিনটা কেমন গেল?”
এই একটি প্রশ্নের মধ্যেও যে কতটা ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে, তা একজন সন্তানের হৃদয়ই সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারে।
একজন বাবার উচিত সন্তানের চরিত্র নিয়ে যেমন চিন্তা করা, তেমনি তার শিক্ষার বিষয়েও চিন্তা করা। তার নামাজ নিয়ে যেমন উদ্বিগ্ন থাকা, তেমনি তার ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও পেশা নিয়েও ভাবা। তার শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি তার হৃদয়, মন ও আত্মার প্রতিও যত্নশীল হওয়া।
সন্তানদের শুধু একজন উপার্জনকারী বাবা প্রয়োজন নেই। তাদের প্রয়োজন একজন আদর্শ, একজন শিক্ষক, একজন রক্ষক, একজন পরামর্শদাতা এবং একজন নির্ভরতার আশ্রয়।
বাবা যদি নিজে নামাজে যত্নবান হন, সন্তান নামাজের গুরুত্ব শিখবে। বাবা যদি সত্যবাদী হন, সন্তান সত্যবাদিতার সৌন্দর্য দেখবে। বাবা যদি মায়ের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেন, সন্তান পরিবারে সম্মানের ভাষা শিখবে। বাবা যদি মানুষের প্রতি দয়ালু হন, সন্তানও দয়ার শিক্ষা পাবে।
কারণ সন্তান শুধু বাবার মুখের কথা শোনে না; সে বাবার জীবনও পড়ে।
একজন বাবা সন্তানের সামনে যে আচরণ করেন, অনেক সময় সেটিই সন্তানের কাছে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে যায়। তাই সন্তানকে ভালো হওয়ার উপদেশ দেওয়ার আগে বাবাকে নিজের জীবনকেই একটি জীবন্ত আদর্শে পরিণত করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
—সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
অতএব পিতা হওয়া শুধু একটি পরিচয় নয়; এটি একটি দায়িত্ব, একটি আমানত এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বড় পরীক্ষা।
বাবার একটি ভালো কথা, একটি আন্তরিক পরামর্শ, একটি সঠিক সময়ে দেওয়া সতর্কতা কিংবা সন্তানের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা—এসবই কখনো কখনো একটি সন্তানের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
আবার একজন বাবার অবহেলা, কঠোরতা কিংবা সন্তানের প্রতি দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতিও তার হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে। তাই শাসন করতে হলেও ভালোবাসা দিয়ে শাসন করতে হবে। সংশোধন করতে হলেও অপমান করে নয়, বরং সম্মান ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সংশোধন করতে হবে।
একজন বাবা যদি সন্তানের জীবনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন, তার বন্ধু হতে পারেন, তার কথা শুনতে পারেন এবং ছোটবেলা থেকেই তার সঙ্গে বিশ্বাস ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত ও বিপথগামিতা শুরু হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বিশেষ করে সন্তান যখন কৈশোরে পৌঁছে, তখন বাবার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই বয়সে সন্তান প্রশ্ন করবে, দ্বিধায় পড়বে, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হবে, নানা মতাদর্শ ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসবে। তখন বাবার কাজ শুধু “এটা করো না” বলা নয়; বরং কেন করা যাবে না, তার কারণ বোঝানো। তাকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে বাবা পাশে না থাকলেও সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
সন্তানকে সবসময় ভয় দেখিয়ে ভালো রাখা যায় না; ভালোবাসা, বিশ্বাস, জ্ঞান ও আদর্শের মাধ্যমে তাকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হয়।
তাই যারা বিয়ের কথা ভাবছেন এবং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার আশা রাখেন, তাদের মনে রাখা উচিত—পিতৃত্বের প্রস্তুতি সন্তান জন্মের পর নয়, বরং সন্তান জন্মের অনেক আগেই শুরু হয়।একজন পুরুষের উচিত নিজেকে সংশোধন করা, নিজের চরিত্রকে সুন্দর করা, প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করা, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা এবং একটি পরিবার পরিচালনা ও সন্তান লালন-পালনের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি অর্জন করা।কারণ সন্তান শুধু বাবার কাছ থেকে ভরণপোষণ পায় না; সে বাবাকে দেখে জীবন শিখে। বাবার কথা, আচরণ, আদর্শ, ইবাদত, সততা এবং মানুষের সঙ্গে তার ব্যবহার—সবকিছুই সন্তানের মনে গভীর ছাপ ফেলে।আজ যে বাবা সন্তানের হাত ধরে মসজিদে নিয়ে যাচ্ছেন, কাল সেই সন্তানই হয়তো বাবার জন্য মসজিদের পথে হাত বাড়াবে। আজ যে বাবা সন্তানকে কুরআনের একটি আয়াত শেখাচ্ছেন, কাল সেই সন্তানই হয়তো বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত করবে। আজ যে বাবা সন্তানের চরিত্র গঠনে সময় দিচ্ছেন, ভবিষ্যতে সেই সন্তানই হয়তো বাবার জন্য দুনিয়ায় সাদাকায়ে জারিয়ার কারণ হবে।
সন্তান আল্লাহর দেওয়া একটি আমানত। আর আমানতের যথাযথ হেফাজত করা প্রত্যেক দায়িত্বশীল পিতার কর্তব্য।
একদিন সন্তান বড় হয়ে যাবে। বাবার হাত ধরে হাঁটার বয়স শেষ হবে, একই ঘরে বসে গল্প করার সময় কমে যাবে, সন্তান নিজের সংসার গড়ে নেবে। তখন হয়তো বাবা বুঝবেন—সন্তানের শৈশবের সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়।তাই সন্তান ছোট থাকতেই তাকে সময় দিন। তার সঙ্গে কথা বলুন। তার হাত ধরুন। তার ভুল শুনুন। তার স্বপ্ন শুনুন। তাকে নামাজ শেখান। কুরআনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন। তাকে ভালোবাসুন। কারণ অর্থ দিয়ে সন্তানের প্রয়োজন মেটানো যায়, কিন্তু বাবার ভালোবাসার শূন্যতা কোনো অর্থ দিয়ে পূরণ করা যায় না।
একজন আদর্শ বাবা হয়তো সন্তানের জন্য বিশাল সম্পদ রেখে যেতে পারবেন না; কিন্তু তিনি যদি একজন সৎ, নীতিবান, আল্লাহভীরু ও মানুষের উপকারে আসা সন্তান রেখে যেতে পারেন, তাহলে সেটিই হতে পারে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল বাবাকে তাঁদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের তাওফিক দান করুন। যারা ইন্তেকাল করেছেন, আল্লাহ তাঁদের ক্ষমা করুন, তাঁদের কবরকে নূরে ভরিয়ে দিন এবং তাঁদের সন্তানদের নেক আমলের মাধ্যমে তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।আল্লাহ আমাদের সন্তানদের নেক, আদর্শবান ও দ্বীনদার সন্তান হিসেবে কবুল করুন এবং প্রত্যেক বাবাকে তাঁর সন্তানদের জন্য উত্তম আদর্শ হওয়ার তাওফিক দান করুন।আমিন।
Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com