একগুচ্ছ ফুল কখনো অপরাধের অস্ত্র হতে পারে না। ফুলের মূল্য তার দামে নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর অনুভূতিতে। যে ফুল একজন মানুষ নীরবে শ্রদ্ধা জানাতে হাতে তুলে নেন, সেটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি তার ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ। তবু ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২-এর সামনে ফুল হাতে দাঁড়ানো মানুষগুলোকে ঘিরে ওঠা মবের উত্তেজনা আমাদের সামনে এক নির্মম প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—এই দেশে শ্রদ্ধা জানানোও কি এখন অপরাধ? মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। ইতিহাসের ব্যাখ্যাও ভিন্ন হতে পারে। রাজনৈতিক অবস্থানও হতে পারে আলাদা। কিন্তু একজন নাগরিকের হাতে থাকা ফুল যদি নিরাপত্তার কারণ না হয়ে ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে, তবে বিষয়টি শুধু ৩২ নম্বরের নয়। এ প্রশ্ন আমাদের রাষ্ট্রের, সমাজের, এমন কি আমাদের নাগরিক বিবেকের। কারণ, একটি সভ্য সমাজে মতের জবাব মত দিয়ে দেওয়া হয়; ফুলের জবাব মবের উন্মত্ততা দিয়ে নয়। যে সমাজে একটি ফুলও ভয় ও উত্তেজনার কারণ হয়ে ওঠে, সেই ভয় শেষ পর্যন্ত শুধু একজন মানুষকে নয়—আঘাত করে আমাদের মানবিকতাকেই।
কোনো নাগরিক অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হবে, তদন্ত হবে, প্রমাণ থাকলে মামলা হবে এবং আদালত সিদ্ধান্ত দেবে। কিন্তু একটি মানুষকে ঘিরে জনতা জড়ো হয়ে তাকে মারধর করবে, অপমান করবে এবং পরে পুলিশ তাকে হেফাজতে নেবে—এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আইনের শাসনের স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না। ধানমন্ডি ৩২-এর সাম্প্রতিক ঘটনায় ঠিক কী কারণে কতজন আটক হয়েছেন, তার প্রতিটি প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর রাষ্ট্রের কাছ থেকেই আসা প্রয়োজন।
কারণ, ফুল দেওয়া আর রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনা এক বিষয় নয়। কেউ যদি উসকানিমূলক বক্তব্য দেয়, সহিংসতা করে, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে কিংবা আইন ভঙ্গ করে—তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ অবশ্যই রাষ্ট্রের আছে। কিন্তু শুধু কারও হাতে ফুল দেখে তাকে অপরাধী ধরে নেওয়া কিংবা জনতার হাতে অপমানিত হওয়ার পর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলে সেখানে আইনের শাসনের মৌলিক দর্শনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
রাজনৈতিক বাস্তবতাও এখানে অস্বীকার করার উপায় নেই। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২-এর ভবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনাও সেই রাজনৈতিক সংঘাতের গভীর ক্ষতকে সামনে এনেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ অতীত ও বর্তমানের তুলনা করতে গিয়ে লিখেছেন, আগে ১৫ আগস্টে ধানমন্ডি ৩২-এর রাস্তা বন্ধ করে সরকারি ও দলীয়ভাবে শ্রদ্ধা জানানোর আয়োজন হতো; পরবর্তী সময়ে একই জায়গায় লাঠিসোঁটা নিয়ে মানুষকে মারধরের দৃশ্য দেখা গেছে। তাঁর পর্যবেক্ষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—ক্ষমতার পালাবদল যদি শুধু ‘কারা কাকে দমন করবে’ সেই প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক পরিবর্তন ঘটে না।
একসময় ক্ষমতাবানরা ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে—এমন অভিযোগ বহুবার উঠেছে। আজ যদি তার প্রতিক্রিয়ায় অন্য একটি পক্ষ ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায়কে মুছে দিতে চায়, স্মৃতিকে অপমান করতে চায়, কিংবা বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করার অধিকারকে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করে, তাহলে সেটিও একই অসহিষ্ণুতার আরেক রূপ।
অতীতের ভুলের প্রতিশোধ বর্তমানের নাগরিকের ওপর নেওয়া যায় না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বিভিন্ন সময়ে মব-সংস্কৃতির সমালোচনা করে বলেছেন, মব তৈরি করার সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। এমনকি ২০২৪ সালে ধানমন্ডি ৩২-এ ফুল দেওয়া নিয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল—ফুল দিতে যাওয়ায় আপত্তি ছিল না, আপত্তি ছিল অন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার বিষয়ে।
এই বক্তব্যের মধ্যেই গণতান্ত্রিক সমাজের একটি মৌলিক শিক্ষা রয়েছে—রাজনৈতিক মতের বিরোধিতা করা যায়, কিন্তু মানুষের শান্তিপূর্ণ স্মরণ ও শোক প্রকাশের অধিকারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধে পরিণত করা যায় না।
অবশ্য অন্য একটি বাস্তবতাও রয়েছে। ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালেও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে ধানমন্ডি ৩২-এ দুই পক্ষের উপস্থিতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ করতে পারে।
অর্থাৎ রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল আরও বেশি। রাষ্ট্র চাইলে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে পারত। প্রবেশের নিয়ম নির্ধারণ করতে পারত। নির্দিষ্ট সময় ও পদ্ধতিতে শ্রদ্ধা জানানোর ব্যবস্থা করতে পারত। কেউ আইন ভাঙলে পুলিশ তাকে আটক করতে পারত। কিন্তু রাষ্ট্রের জায়গা কখনোই মব নিতে পারে না।
পুলিশের দায়িত্ব মবকে থামানো—মবের হাতে কাউকে মারধরের শিকার হতে দেওয়া নয়। জনতা কাউকে ধরে পিটিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেবে, আর পুলিশ শুধু তাকে গ্রহণ করবে—এটি আইনের শাসনের স্বাভাবিক চিত্র হতে পারে না।
এই প্রশ্নটি তাই শুধু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নয়। আজ যে মানুষটি বঙ্গবন্ধুর ছবিতে ফুল দিতে গিয়ে মারধরের শিকার হলেন, কাল অন্য কোনো মানুষ অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ, কবি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব কিংবা ঐতিহাসিক স্থানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে একই আচরণের শিকার হতে পারেন। তখন আমরা কোন নৈতিক অবস্থান নেব?
ইতিহাসকে ভালোবাসার অধিকার যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে, তাহলে ইতিহাস আর ইতিহাস থাকে না—তা হয়ে যায় ক্ষমতার সম্পত্তি।
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সবার রাজনৈতিক মূল্যায়ন এক হতে হবে—এমন কোনো গণতান্ত্রিক শর্ত নেই। কেউ তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশংসা করবেন, কেউ তাঁর শাসনামলের সমালোচনা করবেন, কেউ তাঁর ঐতিহাসিক অবদানকে অন্যভাবে মূল্যায়ন করবেন। এসব মতপার্থক্য গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু মতপার্থক্যের উত্তর যদি লাঠি হয়, তাহলে গণতন্ত্র কেবল কাগজে থাকে।
আর বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও গভীর। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক চরিত্রগুলোর একজন। তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে গবেষণা হতে পারে, তাঁর শাসনামলের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে—কিন্তু তাঁকে ঘিরে মানুষের স্মৃতি, আবেগ ও শ্রদ্ধাকে অস্বীকার করে ইতিহাস লেখা যায় না।
একইভাবে বঙ্গবন্ধুর নামে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া, তাঁর উত্তরাধিকারকে দলীয় সম্পত্তি বানানো কিংবা তাঁর সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য করে দেখা—এসবও ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়।
ইতিহাসের সৌন্দর্য হলো—সেখানে শ্রদ্ধার পাশাপাশি প্রশ্ন, প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনারও জায়গা থাকে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাই প্রয়োজন আরও আলোচনা, গবেষণা ও যুক্তিনির্ভর বিতর্ক। ইতিহাসের জবাব লাঠি দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে দিতে হয়। ভিন্নমতকে ভয় দেখিয়ে নয়, আলোচনার মধ্য দিয়েই ইতিহাসকে বুঝতে হয়। ফুল হাতে আসা মানুষকে ভয় দেখানো কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না।
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের পুরোনো পর্যবেক্ষণে দেখা যায়—রাজনৈতিক পালাবদল ঘটলেও যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদল না হয়, তবে কেবল ক্ষমতার মুখ বদলায়; আচরণ বদলায় না। মহিউদ্দিন আহমদের বিশ্লেষণে ১৫ আগস্টের অতীত ও সাম্প্রতিক ধানমন্ডি ৩২-এর পরিস্থিতির মধ্যে সেই বেদনাদায়ক সাদৃশ্যই ফুটে উঠেছে।
আমাদের সবচেয়ে বড় ভয় সেখানেই। আজ যদি একদল মানুষ বলে, ‘তুমি বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে পারবে না’; কাল আরেক দল বলবে, ‘তুমি অমুককে স্মরণ করতে পারবে না’। একদিন হয়তো দেখা যাবে, বাংলাদেশের নাগরিককে ফুল দেওয়ার আগেও অনুমতি নিতে হচ্ছে—কাকে ফুল দেবে, কেন দেবে, কোন ইতিহাসে বিশ্বাস করো, কোন রাজনৈতিক পরিচয় তোমার—সবকিছুর জবাব দিতে হচ্ছে।
এটি স্বাধীনতার চেতনা নয়। স্বাধীনতার চেতনা হলো—মানুষের মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং নিজের বিবেক অনুযায়ী ইতিহাসকে স্মরণ করার অধিকার।
সুতরাং রাষ্ট্রের কাছে একটি সরল প্রশ্ন —ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিতে যাওয়া কি কোনো অপরাধ? যদি অপরাধ না হয়, তাহলে ফুল হাতে আসা মানুষকে কেন মবের হাতে মারধরের শিকার হতে হবে? আর কেউ অপরাধ করে থাকলে, তার বিচার জনতা কেন করবে? আইন আছে, রাষ্ট্র আছে, বিচারব্যবস্থা আছে—তাহলে বিচার কেন মবের হাতে?
বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো কারও রাজনৈতিক অধিকার হতে পারে, কারও ব্যক্তিগত আবেগ হতে পারে, আবার কারও কাছে ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা হতে পারে। কিন্তু সেই শ্রদ্ধাকে ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দেওয়া হলে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস ছোট হয় না; বরং আমাদের গণতন্ত্রের আয়নাটিই আরও মলিন হয়ে যায়।
যে মানুষটি ফুল হাতে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁর হাতে অস্ত্র ছিল না। তাঁর হাতে ছিল কয়েকটি ফুল। সেই ফুল যদি একটি স্বাধীন দেশের রাস্তায় নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে, তাহলে প্রশ্নটি শুধু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নয়—প্রশ্নটি আমাদের স্বাধীনতার অর্থ নিয়ে।
কারণ স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—আপনি আপনার প্রিয় মানুষটির জন্য যতটা অধিকার চান, আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রিয় মানুষটির জন্যও কি সেই একই অধিকার দিতে পারেন?
নইলে ইতিহাসের পাতায় একদিন হয়তো লেখা থাকবে—আমরা সরকার বদলেছিলাম, ক্ষমতার পালা বদলেছিলাম; কিন্তু মবের রাজনীতি থেকে মুক্ত হতে পারিনি।# ১৮.০৮.২৬
মো: মাজেম আলী মলিন, সহকারী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান সমাজবিজ্ঞান বিভাগ রোজী মোজাম্মেল মহিলা অনার্স কলেজ। মোবাইল: ০১৭১৯-৭৩৪৫২০ .ই-মেইল: md.magem1974@gmail.com
Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com