ফেসবুকে যারা থাকে তাদের মাথা নিচু থাকে তাদের মাথা কখনোও উপরে উঠবে না

Spread the love

এস এম শিমুল

​একটি দেশের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না; পুরো প্রজন্মকে যদি একটি ছয় ইঞ্চির কাচের স্ক্রিনে বন্দি করে ফেলা যায়, তবে সেই সমাজ এমনিতেই পঙ্গু হয়ে পড়ে। লেখক-সাহিত্যিক ও ফিচার-কলামিস্ট  এর এই সুনির্দিষ্ট লেখাটি  আজ আর কেবল কোনো রূপক লেখা নয়, এটি আমাদের বর্তমান বাস্তবতার সবচেয়ে রূঢ় ছবি। বিগত ১৭ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা বা কড়াকড়ি না থাকায় শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই আজ স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার চরম আসক্তিতে নিমজ্জিত। বিশেষ করে জন্মের পরপরই যে শিশুটি মায়ের হাসিমুখ বা প্রকৃতির বৈচিত্র্য দেখে বড় হওয়ার কথা ছিল, সেই শিশু বড় হচ্ছে ফোনের নীল আলো দেখে। খাওয়ার সময় হাতে ফোন না দিলে শিশুর মুখে খাবার উঠছে না, খেলার মাঠে যে শিশুর দৌড়ানোর কথা ছিল, সে আবদ্ধ ঘরে, পেছনের বেঞ্চে বা বাড়ির ছাদে মাথা নিচু করে স্ক্রিন স্ক্রোল করছে। এই নিচু হওয়া মাথা কেবল ফোনের দিকে ঝুঁকে থাকা নয়, এটি মূলত একটি পুরো জাতির আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার মাথা নিচু হওয়া।

​অথচ প্রযুক্তির উদ্ভাবক ও উৎপাদক উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে (যেমন—যুক্তরাষ্ট্র, চীন কিংবা ইউরোপে) শিশু-কিশোরদের জন্য এমন অবাধ সুযোগ নেই। খোদ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহীরাও তাঁদের সন্তানদের হাতে নির্দিষ্ট বয়সের আগে স্মার্টফোন তুলে দেন না। চীনে ১৬ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য রাতে ইন্টারনেট ও গেমিং ব্যবহারে কঠোর রাষ্ট্রীয় সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। উন্নত বিশ্বে ‘ডিজিটাল প্যারেন্টিং’ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চর্চা করা হয়; আমাদের দেশের মতো কাজকর্ম ও পড়াশোনা ফেলে সারা দিন স্ক্রিনে ডুবে থাকার অবাধ্য সুযোগ সেখানে দেওয়া হয় না।

​গভীর সামাজিক বিশ্লেষণ ও গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই চরম আসক্তির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায়। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে যে আশঙ্কাজনক বিপর্যয় ঘটেছে, তার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল আসক্তিকেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। পড়ার টেবিল কিংবা ক্লাসরুমে মনোযোগ না দিয়ে বন্ধ ঘরে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ও ক্ষতিকর কনটেন্ট এরা হজম করছে, তা তাদের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর ফলে শিক্ষক ও অভিভাবকের নির্দেশনা অমান্য করার মানসিকতা তৈরি হচ্ছে এবং একই ছাদের নিচে থেকেও পরিবারের সদস্যরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। মেধা ও ঘন মনোযোগের ঘাটতি নিয়ে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় চরমভাবে পিছিয়ে পড়বে। তারা কেবল প্রযুক্তির উপভোক্তা হয়েই থাকবে, কখনোই নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে পারবে না।

​এই জাতির সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সরকারকে এখনই কঠোর আইনগত পদেক্ষেপ নিতে হবে। ১৮ বছরের নিচে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খোলা এবং ব্যবহারের ওপর আইনি কড়াকড়ি আরোপের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা জরুরি। ইন্টারনেটে ক্ষতিকর গেম, জুয়া ও পর্নোগ্রাফিক সাইটগুলো ব্লক করার পাশাপাশি প্রতিটি আমদানিকৃত বা প্রস্তুতকৃত ফোনে বাধ্যবাধকতামূলক ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন করা সময়ের দাবি। মাথা নিচু করে স্ক্রিনে ডুবে থাকা কোনো জাতি কখনো বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না; রাষ্ট্র যদি এখনই কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন না করে, তবে আমাদের জাতীয় সম্ভাবনা কেবল এই ভার্চুয়াল অন্ধকারেই বিলীন হয়ে যাবে।

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD