নিমগাছি হাটের বেহাল দশা : করনীয়

Spread the love
এম এ হাশিম সরকার  –  সিরাজগঞ্জ জেলার বৃহৎ হাট বাজার গুলোর অন্যতম রায়গঞ্জ উপজেলাধীন নিমগাছি হাট  । ইতিহাস বর্জিত পূর্ব কালের মৎস্য নগরী হিসাবে স্বীকৃত নিমগাছি হাটটি বর্তমানে ধান ও মাছ রপ্তানীতে সমৃদ্ধ। জেলার সবচেয়ে বেশী রাজস্ব প্রদানকারী হাটের মধ্যে নিমগাছি হাট অন্যতম বটে। এবারেও এই হাটের ডাক হয়েছে ৪৬ লাখ টাকা। তবে রাজস্ব প্রদানের দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও বরাবরই হাটটি সরকারী উন্নয়নে রাজনৈতিক ভাবে বিভিন্ন রুপে বঞ্চিত ও বর্জিত হয়েছে। দেশের বৃহত্তম ফিডার হাটগুলোর মাঝে প্রথম সারির হাট হওয়া সত্বেও নানা সমস্যায় জর্জরিত নিমগাছি হাট। বিশেষ করে হাটের অভ্যন্তরের রাস্তাগুলি একান্তই চাপা ও খানা খন্দকে ভরপুর। ড্রেনেজ ব্যাবস্থা এতই সংকীর্ন যে সামান্য বৃষ্টিতেই হাটে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে নাভিশ্বাস পরিস্থিতির উদ্ভব হয় হাটুরে জনতার। নিমগাছি বাজারে স্বাভাবিক দিনেও নিত্য প্রায় ১০/১৫ হাজার লোক সমাগম হয়, হাটের ২ দিন তা প্রায় লক্ষাধিক হয়ে থাকে হাটুরে মানুষের আগমনে।  ধান কাটার মৌসুমে শতাধিক ট্রাকে কিংবা অন্যান্য বাহনে ধান চলে যায় এলাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানের চালকলে। নিজ জেলা ছাড়াও নাটোর, পাবনা, কুষ্টিয়া, জামালপুর, বগুড়া, শেরপুর জেলার মিল মালিকগন নিমগাছি হাট থেকে ধান সংগ্রহ করে থাকে। ধানের হাটটি একসময় খুবই ছোট ছিল। তবে গত শতাব্দীর শেষ লগ্নে সোনাখাড়া ইউপির তৎকালীন চেয়ারম্যান আতাউর রহমান তালুকদারের প্রচেষ্টায় ও নিজস্ব উদ্দ্যোগে হাটের সম্প্রসারন এবং সংস্কার করা হয়। উল্লেখ্য, নিমগাছি হাট রায়গঞ্জ উপজেলাধীন সোনাখাড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত। নতুন ভাবে  ধান হাটা প্রতিষ্ঠিত হয় বেশ কয়েক বিঘা জমির উপর।  এক সময় নিমগাছি হাট গবাদি পশু ক্রয় বিক্রয়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। তবে সে খ্যাতি নানান প্রতিযোগিতার কারনে আগের মত আর নেই। বর্তমানে বিখ্যাত হয়েছে মাছের আড়তের জন্য। চলন বিলের মাছসহ নিমগাছির জয়সাগর মৎস্য খামারের বিভিন্ন জলাশয় এবং সাধারন মাছ চাষীদের একটি অংশ তাদের পুকুরের মাছ এখানে বিক্রয়ের জন্য নিয়ে আসে। ফলে এই আড়ৎ থেকে লোকাল মৎস্য ব্যাবসায়ীর পাশাপাশি ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাংগাইল, পাবনাসহ দূর দূরান্তের ব্যাপারীগনও মাছ সংগ্রহ করে থাকে। প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার মৎস্য সম্পদ ক্রয় বিক্রয় হয় এই মাছের আড়ৎ হতে। মাছের আড়ৎটি নিমগাছি তথা এই জনপদের  প্রবেশ দ্বার নিমগাছি বাজারের ভূইয়াগাঁতি – তাড়াশ – মহিষলুটি কানেকটিং রোডের কোল ঘেঁসে গড়ে উঠেছে। রোডটি সড়ক বিভাগের সাব হাইওয়ে। প্রতিদিন সকাল ৭ টা হতে বেলা ১১ টা পর্যন্ত মাছের আড়ৎ জমজমাট থাকে। এ সময় প্রবেশ দ্বারের দুই দিকে আগমনী ও বহি: গামী মাছ বহনকারী গাড়ীগুলো রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধভাবে জমায়েত হতে থাকে। মাঝখানের রাস্তার বিস্তৃতি এ সময় এত চাপা হয়ে যায় যে পাশাপাশি দুটো ভ্যানগাড়ী পর্যন্ত যাতায়াত করতে জ্যাম তৈরী করে ফেলে। হাট বা বাজারে আগন্তক জনসাধারন, পাশের স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীসহ এপথে যাতায়াতকারী মানুষদের এমন সমস্যা হয় তাতে যে, জীবনহানি ঘটার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এছাড়া এই পথে যাতায়াতকারী বড় বড় ট্রাক বাসের মাছ আড়ত এলাকা অতিক্রম করার জন্য পরিস্থিতির এমন নাজুক হয়ে পড়ে যে ৫০ মিটার রাস্তা পার হতে ঘন্টারও বেশী সময় আটকে থাকতে হয় জ্যামে পড়ে। কয়েকদিন আগে নিমগাছি বাজারের এক মাছ ব্যাবসায়ীর মৃত্যু হয় এই স্থানে ট্রাকের নীচে চাপা পড়ে, যার বাড়ী তাড়াশের আড়ংগাইল গ্রামে। ট্রাকের চাপায় তার মাথার মগজ বেরিয়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই  প্রান হারান। নিমগাছি হাটের উন্নয়নের জন্য খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে মাছের আড়ৎ সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেয়া। নিমগাছি বাজারের মেইন রোড হলো ভূয়াগাঁতী – তাড়াশ সড়ক। এই রোডে দিনের বেশীর ভাগ সময় জ্যাম লেগে থাকে মানুষজন ও যানবাহন চলাচলে। সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় শনি ও মংগলবার। ঐ দুইদিন সিরাজগঞ্জ  জেলার সবচেয়ে বড় হাট লাগে চান্দাইকোনা গরুর হাট। হাটে গরু আসে পাবনার ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ,  নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম প্রভৃতি উপজেলা থেকে। এসব গরুর গাড়ী তথা ট্রাক, নসিমন, করিমন, ভটভটির চাপ, স্কুল  – কলেজগামী শিক্ষার্থীদের যানবাহনের চাপ, মাছের আড়তে আগত গাড়ীর চাপ, সাধারন পাবলিকের চাপে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারন করে।  এজন্য হাটের দক্ষিন পাশ দিয়ে নিমগাছি কলেজ হতে পুল্লা কবরস্থান পর্যন্ত বাইপাস হলে তাড়াশ-  ভূয়াগাঁতী সড়কে চলাচলরত যানবাহনগুলো বাজারের জ্যামের হাত হতে মুক্তি পেয়ে সহজভাবে চলতে পারতো। নিমগাছিতে অবস্থিত সোনাখাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি নিজেই একটা অস্বাস্থ্যকর কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে। নাকে কাপড় দিয়ে বাজার হতে ঐ কেন্দ্রে যেতে হয়। যাওয়ার পথে বাজারের আবর্জনা ফেলার স্থান অতিক্রম করতে হয় যা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একবারে সামনে। তাই সেখানে কোনো ভাল মানুষ যেতে চায় না নিজে রোগী হবার ভয়ে, রোগীদের অবস্থা তার চেয়েও ভয়ংকর । তার পাশে পরিত্যক্ত ইউপি অফিস যা বিগত সরকার প্রধান দেশ ত্যাগ করার পর জঙ্গীরা জ্বালিয়ে দেয় ও অফিসের সব লুট করে নেয়। সেখানে এখন রাতে দিনে সমাজ বিরোধী তথা নেশাঘোরদের পদচারনায় মুখর। নিমগাছিতে একটি অনার্স কলেজ, একটি কারিগরি কলেজ, একটি গার্লস স্কুল এ্যান্ড কলেজ, তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি দাখিল মাদ্রাসা, একটি হাইস্কুল, ৫ টি মাদ্রাসা, ৪ টি মহিলা মাদ্রাসা প্রভৃতি গড়ে ওঠায় নিমগাছিকে একটা আধুনিক শিক্ষানগরী হিসাবে গন্য করা যায়।  নিমগাছি একসময় ইতিহাস সমৃদ্ধ রাজাধীরাজদের স্বর্গরাজ্য ছিল, আজ তা ইতিহাস বর্জিত রুপকথা মাত্র। তবে নিমগাছিকে আধুনিক সাজে সজ্জিত করতে রাজনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতা একান্ত অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD