মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
ইসলামী গবেষক, লেখক ও দাঈ
রবিউল আউয়াল—হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস। এ মাসের নাম উচ্চারিত হলেই মুসলিম হৃদয়ে ভেসে ওঠে মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্মৃতি। এ মাসেই তাঁর বিলাদাত, নবুয়তের সূচনা-পর্বের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, মক্কা থেকে মদিনায় ঐতিহাসিক হিজরত এবং পরবর্তীতে তাঁর ওফাত সংঘটিত হয়েছে। তাই রবিউল আউয়াল শুধু একটি মাসের নাম নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর আত্মপরিচয়, ঈমান, ভালোবাসা ও আদর্শিক অঙ্গীকারকে নতুন করে জাগিয়ে তোলার এক অনন্য সময়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—রবিউল আউয়াল আমাদের জীবনে কী পরিবর্তন আনে? আমরা কি এ মাসকে কেবল আবেগের উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করি, নাকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার করি? কারণ ইসলাম শুধু স্মৃতিচারণের ধর্ম নয়; ইসলাম অনুসরণের ধর্ম, আমলের ধর্ম এবং চরিত্র গঠনের ধর্ম।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “রাসুল তোমাদের যা দিয়েছেন তা গ্রহণ করো এবং তিনি যা থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো।” (সূরা আল-হাশর: ৭) এই একটি আয়াতই মুসলমানের জীবনের দিকনির্দেশনা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা, সুন্নাহ ও আদর্শই একজন মুমিনের জীবন পরিচালনার মূল ভিত্তি।
অনেকেই মনে করেন, রাসুলপ্রেমের প্রকাশ কেবল নির্দিষ্ট কিছু অনুষ্ঠান বা আবেগঘন আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন, প্রকৃত ভালোবাসার পরিচয় তাঁর অনুসরণে। তিনি ইরশাদ করেছেন, “তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সমগ্র মানবজাতির চেয়েও অধিক প্রিয় হই।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
এই ভালোবাসা মুখের উচ্চারণে নয়; বরং নামাজে, সততায়, ন্যায়বিচারে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, পরিবার পরিচালনায়, প্রতিবেশীর হক আদায়ে, ক্ষমাশীলতায়, মানবিকতায় এবং সর্বোপরি সুন্নাহর অনুসরণে প্রকাশ পায়। যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্রকে নিজের চরিত্রে ধারণ করতে পারে, সেই প্রকৃত অর্থে তাঁর ভালোবাসার দাবিদার।
রবিউল আউয়ালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো বেশি বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা। আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবির প্রতি দরুদ প্রেরণ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করো।” (সূরা আল-আহযাব: ৫৬)
দরুদ এমন একটি ইবাদত, যা বান্দাকে আল্লাহর রহমতের আরও নিকটবর্তী করে। সহিহ হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাজিল করেন, দশটি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। (সহিহ মুসলিম)
আরও এসেছে, যতক্ষণ কোনো বান্দা দরুদ পাঠ করতে থাকে, ততক্ষণ ফেরেশতারা তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকেন। কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়ায় তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে। (সুনানে তিরমিজি)
তবে দরুদ পাঠের ফজিলত যতই মহান হোক, তা কখনোই সুন্নাহ অনুসরণের বিকল্প নয়। দরুদ ও সুন্নাহ—দুটিই একে অপরের পরিপূরক। একজন মুসলমান যত বেশি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করবে, ততই তার দরুদ হবে আন্তরিক, আর যত বেশি আন্তরিকভাবে দরুদ পাঠ করবে, ততই তার অন্তরে সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেবে।
আজকের সমাজে আমরা নানা সংকটে আক্রান্ত—নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক ভাঙন, দুর্নীতি, হিংসা, প্রতারণা, মিথ্যাচার এবং আত্মকেন্দ্রিকতা দিন দিন বেড়েই চলছে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন ছিল সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, আমানতদারি, দয়া, ক্ষমাশীলতা ও মানবকল্যাণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর আদর্শকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—যে আল্লাহ ও পরকালকে আশা করে এবং অধিক পরিমাণে আল্লাহকে স্মরণ করে।” (সূরা আল-আহযাব: ২১)
অতএব, রবিউল আউয়াল আমাদের জন্য কেবল স্মরণ কিংবা আবেগের মাস নয়; এটি আত্মসমালোচনার মাস, সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনার মাস এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে গড়ে তোলার অঙ্গীকারের মাস। তাঁর ভালোবাসার দাবি তখনই সত্য হবে, যখন আমাদের চরিত্রে ফুটে উঠবে তাঁর শিক্ষা, আমাদের আমলে প্রতিফলিত হবে তাঁর সুন্নাহ এবং আমাদের জীবন আলোকিত হবে তাঁর মহান আদর্শে।
আসুন, আমরা এ রবিউল আউয়ালে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করি, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নিজেদের জীবনকে গড়ে তুলি এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রদর্শিত পথকে জীবনের একমাত্র আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি। এটাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার সর্বোত্তম প্রকাশ এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার নিশ্চিত পথ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্যিকার অনুসারী হওয়ার, তাঁর সুন্নাহকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার এবং তাঁর প্রতি আন্তরিক দরুদ ও সালাম পাঠের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক, দাঈ ও গবেষক
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com