ইসলামে রিযক বৃদ্ধির আমলসমূহ
মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
তরুণ আলোচক, গবেষক ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ
মানুষ জন্মের পর থেকেই এক অদৃশ্য সংগ্রামের নাম শিখে যায়— “রিযক”।জীবনের প্রতিটি সকাল যেন শুরু হয় এই চিন্তা নিয়ে— কীভাবে চলবে সংসার? কোথা থেকে আসবে প্রয়োজনের অর্থ? কীভাবে পূরণ হবে ভবিষ্যতের স্বপ্ন?কেউ দিনরাত পরিশ্রম করেও অভাবের অভিযোগে ক্লান্ত, আবার কেউ অল্প উপার্জনেও হাসিমুখে জীবন কাটায়। কেউ কোটি টাকার মালিক হয়েও মানসিক অশান্তিতে ঘুমাতে পারে না, আবার কেউ ছোট্ট ঘরে থেকেও তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে আলহামদুলিল্লাহ বলে।
এখানেই ইসলামের এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে—রিযক শুধু অর্থের নাম নয়; বরং রিযক হলো আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নিয়ামত, যা মানুষের জীবনকে শান্তি, প্রশান্তি ও বরকতে পূর্ণ করে তোলে।একটি সুস্থ শরীর, ঈমানভরা হৃদয়, নেক জীবনসঙ্গী, ভালো সন্তান, নিরাপদ ঘুম, মানুষের ভালোবাসা, সম্মান, দ্বীনের উপর অটল থাকা— সবই রিযকের অন্তর্ভুক্ত।আর এই রিযকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা।তিনি চাইলে মরুভূমিতেও ফুল ফোটে, আর তিনি না চাইলে সোনার পাহাড়ও মানুষের অন্তরের ক্ষুধা মেটাতে পারে না।আজ মানুষ রিযকের জন্য পৃথিবীর পথে পথে ঘুরছে, অথচ অনেকেই ভুলে যাচ্ছে—রিযকের দরজা জমিনে নয়, আসমানে খোলে।আর সেই দরজার চাবি হলো আল্লাহর আনুগত্য।
ইসলাম আমাদের এমন কিছু আমল শিক্ষা দিয়েছে, যেগুলো শুধু সম্পদ বৃদ্ধি করে না; বরং জীবনে এনে দেয় রহমত, প্রশান্তি ও অদৃশ্য বরকত।
১. তাকওয়া অর্জন করুন — অদৃশ্য দরজায় নেমে আসবে রিযক আল্লাহ তাআলা বলেন—“আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”— আল-কুরআন (৬৫:২-৩)তাকওয়া মানে শুধু ভয় নয়; বরং এমন এক জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষ প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহকে স্মরণ করে।যেখানে গোপনে যেমন পাপ থেকে বাঁচে, প্রকাশ্যেও তেমনি সততার উপর অটল থাকে।আজ আমরা রিযকের জন্য দৌড়াই, কিন্তু অনেক সময় সেই রিযকের মধ্যেই হারাম মিশিয়ে ফেলি। মিথ্যা, প্রতারণা, সুদ, ঘুষ, অন্যের হক নষ্ট করা— এগুলো সাময়িক লাভ দিলেও বরকত কেড়ে নেয়।তাকওয়া মানুষকে শুধু নেককার বানায় না; বরং তার জীবনে এমন অদৃশ্য সাহায্য নিয়ে আসে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
কত মানুষ আছে— সামান্য আয়ে জীবন কাটাচ্ছে, তবুও তাদের ঘরে প্রশান্তি আছে।আবার কত ধনী পরিবার আছে— অর্থ আছে, কিন্তু ভালোবাসা নেই; হাসি আছে, কিন্তু শান্তি নেই।কারণ রিযকের সৌন্দর্য টাকার অঙ্কে নয়; বরং বরকতে।২. বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন — আসমানের রহমত নেমে আসবেনূহ আলাইহিস সালাম তাঁর জাতিকে বলেছিলেন—“তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর অঝোর ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সাহায্য করবেন।”— আল-কুরআন (৭১:১০-১২)ইস্তিগফার এমন এক আমল, যা শুধু গুনাহ মাফ করায় না; বরং বন্ধ হয়ে যাওয়া রিযকের পথও খুলে দেয়।অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারে না— তার জীবনের অশান্তি, সংকীর্ণতা ও কষ্টের পেছনে রয়েছে গুনাহের অন্ধকার।গুনাহ মানুষের হৃদয়কে ভারী করে দেয়, দোয়া কবুলে বাধা সৃষ্টি করে এবং জীবনের বরকত কমিয়ে দেয়।কিন্তু যখন বান্দা কাঁদতে কাঁদতে বলে—“আস্তাগফিরুল্লাহ”তখন আসমানের দরজা খুলে যায়।ইস্তিগফার হৃদয়কে নরম করে, দুশ্চিন্তা কমায় এবং মানুষকে আল্লাহর রহমতের কাছাকাছি নিয়ে যায়।৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখুন — বরকতের ঘর গড়ে উঠবে মুহাম্মাদ ﷺ বলেছেন—“যে ব্যক্তি চায় তার রিযক বৃদ্ধি পাক এবং আয়ুতে বরকত হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।”— সহিহ বুখারি আজকের পৃথিবীতে মানুষ আত্মীয়দের থেকে যত দূরে সরে যাচ্ছে, ততই জীবনের প্রশান্তি হারিয়ে ফেলছে।মায়ের খোঁজ নেওয়া, অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে যাওয়া, ভাই-বোনের পাশে দাঁড়ানো, অভিমান ভুলে সম্পর্ক জোড়া লাগানো— এগুলো শুধু সামাজিকতা নয়; বরং ইবাদত।যে ঘরে আত্মীয়তার সম্পর্ক সুন্দর থাকে, সে ঘরে রহমত নেমে আসে।আর যে সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে নিজের জীবনের বরকতের দরজাও বন্ধ করে দেয়।৪. সদাকাহ করুন — দানেই লুকিয়ে আছে প্রাচুর্যের রহস্য রাসূল ﷺ বলেছেন—“সদাকাহ সম্পদ কমায় না।”— সহিহ মুসলিম
দুনিয়ার হিসাব বলে— দিলে কমে যায়।
কিন্তু আসমানের হিসাব বলে— দিলে বাড়ে।এক মুঠো খাবার কোনো ক্ষুধার্তকে খাইয়ে দেওয়া, একজন এতিমের মাথায় হাত রাখা, অসহায়ের চিকিৎসায় সাহায্য করা, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা করা— এগুলো শুধু মানবতা নয়; বরং নিজের রিযককে বরকতময় করার মাধ্যম।অনেক সময় একটি ছোট সদাকাহ এমন বিপদ দূর করে দেয়, যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।সদাকাহ হৃদয়কে প্রশান্ত করে, অহংকার ভাঙে এবং মানুষকে আল্লাহর আরও প্রিয় বানিয়ে দেয়।৫. শুকরিয়া আদায় করুন — নিয়ামতের দরজা আরও খুলে যাবে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমরা কৃতজ্ঞতা আদায় করলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।”— আল-কুরআন (১৪:৭) মানুষ সাধারণত যা নেই তা নিয়েই বেশি কষ্ট পায়।কিন্তু ইসলাম শেখায়— আগে যা আছে তার কদর করতে শিখো। একটি সুস্থ শরীর, নিরাপদ পরিবার, ঈমান, নামাজ পড়ার তাওফিক— এগুলো কত বড় নিয়ামত! যে ব্যক্তি শুকরিয়া আদায় করে, আল্লাহ তার হৃদয়কে প্রশান্ত করেন।আর অকৃতজ্ঞতা মানুষের জীবন থেকে বরকত সরিয়ে নেয়।৬. হালাল উপার্জন করুন — কম হলেও শান্তি থাকবে হারাম সম্পদ দেখতে বড় হতে পারে, কিন্তু তার ভেতর থাকে অশান্তির আগুন।
আজ অনেক মানুষ অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে হালাল-হারামের সীমা ভুলে যাচ্ছে। অথচ হারাম খাদ্য ইবাদতের স্বাদ নষ্ট করে দেয়, দোয়া কবুলে বাধা সৃষ্টি করে এবং পরিবার থেকে বরকত উঠিয়ে নেয়।অল্প হালাল রিযকও অনেক সময় এমন সুখ দেয়, যা হারামের পাহাড়সম সম্পদেও পাওয়া যায় না।কারণ হালালের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর রহমত।
৭. ফজরের পর অলসতা নয় — সকালেই লুকিয়ে আছে বরকত রাসূল ﷺ দুআ করেছেন—“হে আল্লাহ! আমার উম্মতের সকালবেলার কাজে বরকত দান করুন।”— জামে তিরমিযি ফজরের পর সময়টি অত্যন্ত মূল্যবান।এই সময় ঘুমিয়ে কাটানো নয়; বরং ইবাদত, তিলাওয়াত, জ্ঞানচর্চা ও কর্মে দিন শুরু করা উচিত।ভোরের নির্মল বাতাস, নীরব পরিবেশ এবং আল্লাহর রহমতে ভরা সেই মুহূর্ত মানুষের হৃদয়কে সতেজ করে তোলে।যারা সকালকে কাজে লাগায়, তাদের জীবনে সাধারণত শৃঙ্খলা ও সফলতা বেশি দেখা যায়। শেষ কথা রিযক শুধু টাকার নাম নয়।রিযক মানে— এমন একটি জীবন, যেখানে অল্পের মাঝেও শান্তি থাকে।রিযক মানে— এমন একটি ঘর, যেখানে ভালোবাসা আছে। রিযক মানে— এমন একটি হৃদয়, যেখানে আল্লাহর স্মরণ আছে।আজ মানুষ সম্পদের পেছনে ছুটতে গিয়ে বরকত হারিয়ে ফেলছে।অথচ প্রকৃত সফলতা সেই জীবনে, যেখানে আল্লাহ সন্তুষ্ট থাকেন।তাই আসুন—তাকওয়া অর্জন করি,ইস্তিগফার করি,হালাল পথে চলি,সদাকাহ করি,আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করি,আর প্রতিটি নিয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি।দেখবেন— শুধু রিযকই বাড়বে না; বরং জীবনও হয়ে উঠবে আলো, প্রশান্তি ও রহমতে ভরপুর।আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল, প্রশস্ত ও বরকতময় রিযক দান করুন। আমীন।
লেখক তরুণ আলোচক ও গবেষক বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com