ব্যর্থ সমাজ : কুরআন–সুন্নাহর আলোকে আত্মবিনাশের নির্ভুল মানচিত্র

Spread the love
✍ মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ হাফিজাহুল্লাহ
সমাজ ভাঙে না একদিনে।
একটি সমাজ ধ্বংস হয় তখনই, যখন মানুষের চিন্তা বিকল হয়, বিবেক নিস্তব্ধ হয় এবং আল্লাহর ভয় হৃদয় থেকে উঠে যায়। বাইরে তখন আলো ঝলমল, ভেতরে কেবল শূন্যতা। ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজের সাফল্য নির্ধারিত হয় দালান-কোঠা, প্রযুক্তি বা সংখ্যার দ্বারা নয়; বরং নির্ধারিত হয় ইমান, ইলম, ইনসাফ ও আখলাক দ্বারা। এই চার স্তম্ভ দুর্বল হলেই সমাজ ব্যর্থতার অতল গহ্বরে নেমে যায়।
নিচে ব্যর্থ সমাজের সেই ১২টি নির্ভুল আলামত তুলে ধরা হলো—যেগুলো কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং নিজেকে মাপার জন্য।
১. ইলমের মৃত্যু, হুজুগের রাজত্ব
ব্যর্থ সমাজে মানুষ জাগে না জ্ঞানে, জাগে উত্তেজনায়। সেখানে বইয়ের তাক ধুলোয় ঢাকা পড়ে, আর গুজবের বাজার উপচে পড়ে।
কুরআন বলেছে—
“তাদের অন্তর আছে, কিন্তু তারা তা দিয়ে উপলব্ধি করে না।”
যেখানে চিন্তা নেই, সেখানে সিদ্ধান্ত অন্ধ হয়।
২. বিনোদনের নামে আত্মবিস্মরণ
ইসলাম সময়কে আমানত বলেছে। কিন্তু ব্যর্থ সমাজে সময় নষ্ট করাই সংস্কৃতি। মানুষ এমন বিনোদনে ডুবে থাকে যা তাকে দায়িত্বহীন, উদাসীন ও শূন্য করে তোলে। ফলে যারা মানুষ গড়ে না, কেবল হাসায়—তারাই নায়ক হয়ে ওঠে।
৩. হারামকে সাফল্যের মাপকাঠি বানানো
ইসলামে সফলতা মানে হালাল পথে অল্প হলেও বরকতপূর্ণ জীবন।
ব্যর্থ সমাজে প্রশ্ন করা হয় না—টাকা এসেছে কোথা থেকে; শুধু দেখা হয়—কতটা এসেছে। এতে দুর্নীতিবাজ হয় আদর্শ, আর সৎ মানুষ হয়ে পড়ে বেমানান।
৪. অযোগ্য নেতৃত্বের দুঃশাসন
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, অযোগ্যকে দায়িত্ব দিলে ধ্বংস অনিবার্য।
ব্যর্থ সমাজে নেতৃত্ব পায় মুখের জোর, অর্থ ও চাতুর্য—যোগ্যতা নয়। এতে ন্যায়বিচার অদৃশ্য হয়, আর বিশৃঙ্খলা নিয়মে পরিণত হয়।
৫. সংখ্যার দম্ভ, সত্যের নির্বাসন
সত্য কখনো ভিড়ের পক্ষে দাঁড়ায় না।
ব্যর্থ সমাজে হাজার বোকার চিৎকারে একজন বিবেকবান হারিয়ে যায়। সেখানে ট্রেন্ডই সত্য, আর সত্য হয়ে পড়ে একাকী।
৬. উৎপাদনবিমুখ মানসিকতা
ইসলাম মানুষকে কর্মসৃষ্টির শিক্ষা দেয়। নবীগণ নিজের হাতে কাজ করেছেন।
কিন্তু ব্যর্থ সমাজে উদ্যোক্তা অবহেলিত, ঝুঁকি নেওয়া উপহাসের বিষয়। ফলে সমাজ স্থবির হয়ে পড়ে, নতুন কিছু জন্ম নেয় না।
৭. কঠিন সত্য বললে শত্রুতা
যে ব্যক্তি সমাজের অসুখ চিহ্নিত করে, ব্যর্থ সমাজ তাকে গ্রহণ করে না।
নসিহত সেখানে অপমান, আর সতর্কতা সেখানে শত্রুতা হিসেবে বিবেচিত হয়। অথচ ইসলাম নসিহতকেই দ্বীনের প্রাণ বলেছে।
৮. লক্ষ্যহীন যুবসমাজ
যুবসমাজ যদি আদর্শহীন হয়, ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
ব্যর্থ সমাজে তরুণরা স্বপ্ন দেখে দ্রুত বড়লোক হওয়ার, কিন্তু স্বপ্ন দেখে না উপকারী মানুষ হওয়ার।
৯. তুচ্ছতায় ডুবে থাকা
ইসলাম মানুষকে অগ্রাধিকারের শিক্ষা দেয়।
ব্যর্থ সমাজে তুচ্ছ ইস্যু নিয়ে তোলপাড় হয়, অথচ জুলুম, অবিচার ও নৈতিক পতন নির্বিঘ্নে চলতে থাকে।
১০. বাতিল চিন্তার নেশা
কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দূরে সরে গেলে মানুষ নিজস্ব তত্ত্ব বানায়।
ব্যর্থ সমাজে এই ভ্রান্ত চিন্তাগুলো মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে রাখে—চিন্তাশীল নয়, ভোক্তা বানায়।
১১. অজ্ঞতার অহংকার
ইসলামে “আমি জানি না” বলা জ্ঞানের দরজা।
ব্যর্থ সমাজে সবাই সবজান্তা, কেউ শিক্ষার্থী নয়। ফলে কথা হয় অনেক, সমাধান হয় না।
১২. দায়হীনতা ও দোষারোপের সংস্কৃতি
মুমিন নিজের ভুল স্বীকার করে, সংশোধনের চেষ্টা করে।
ব্যর্থ সমাজে সবাই দোষ চাপায় অন্যের ঘাড়ে। সমস্যা থাকে, কিন্তু সমাধান জন্ম নেয় না।
শেষ কথা : আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সাহস
এই লক্ষণগুলো কোনো সমাজকে গালি দেওয়ার জন্য নয়; এগুলো আত্মজিজ্ঞাসার আয়না।
আজ যদি আমরা এই আলামতগুলো নিজের ঘর, নিজের চিন্তা ও নিজের আচরণে দেখতে পাই—তবে বুঝতে হবে, পরিবর্তনের দায়িত্ব আমাদেরই।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয় আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।”
আসুন, সমাজ বদলানোর আগে নিজেকে বদলাই।
আল্লাহ আমাদেরকে সত্য দেখার দৃষ্টি, গ্রহণ করার সাহস এবং সে অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দিন।
আমিন।
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD