নারী জাগরণের প্রকৃত অগ্রদূত কে?—ইতিহাসের ছায়ায় উপেক্ষিত নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী

Spread the love
মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
বাংলার নারী জাগরণের ইতিহাস বলতে আমরা প্রায়ই এক নামই শুনে আসছি—বেগম রোকেয়া। পাঠ্যপুস্তক, গণমাধ্যম, দিবস–উদযাপন—সবখানে তাঁর নামই সর্বাধিক প্রচারিত। কিন্তু ইতিহাস কি সত্যিই এতটা সরল এবং একমুখী? ঘনিষ্ঠভাবে দেখলে বোঝা যায়, নারীশিক্ষা ও সমাজ পরিবর্তনের প্রকৃত ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আরও আগে, আরও শক্তিশালী হাতে—একজন ধার্মিক, পর্দাশীল, মুসলিম নারী নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর মাধ্যমে।
দুঃখজনকভাবে, তাঁর অসীম অবদান ও সংগ্রামকে মূলধারার ইতিহাস প্রায়ই ছায়ার আড়ালে রেখে এসেছে।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা: সময়ের চেয়ে বহু দূর এগিয়ে থাকা এক বিস্ময়কর নারীনওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী (১৮৩৪–১৯০৩) ছিলেন উপমহাদেশের নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাহিত্য ও সমাজসেবার অগ্রদূত। লাকসামের জমিদার পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি বিলাসিতায় ডুবে যাননি; বরং ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করে মানবকল্যাণে জীবন উৎসর্গ করেছেন।তিনি ছিলেন বহুভাষাজ্ঞ—আরবি ফার্সি বাংলা সংস্কৃত উর্দু ও ইংরেজি সম্পর্কে ধারণাসম্পন্ন আজ থেকে দেড় শতাব্দী আগে, পর্দানশীল এক নারীর এমন বিস্ময়কর শিক্ষাগত দক্ষতা সত্যিই বিরল।
নারীশিক্ষায় বিপ্লবরোকেয়ার জন্মের আগে যে আলো ছড়িয়ে গিয়েছিল১৮৭৩ সালে—যখন নারী শিক্ষার ধারণাই সমাজে তেমন গ্রহণযোগ্য ছিল না—তখন তিনি কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠা করেন:ফয়জুন্নেসা গার্লস স্কুলযা পরবর্তীতে সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে রূপ নেয় এবং উপমহাদেশের প্রাচীনতম বেসরকারি বালিকা বিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি পায়।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় বেগম রোকেয়ার জন্মও হয়নি।এর পাশাপাশি তিনি—
হোমনাবাদে বালিকা মাদ্রাসালাকসামের বিভিন্ন অঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয়জমিদারির ১৪টি মৌজায় ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন।একজন নারী হিসেবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এত বড় আকারে শিক্ষাবিস্তার—উপমহাদেশে বিরল নজির।মেয়েদের পড়াশোনায় হোস্টেল ও বৃত্তি সেই সময় মেয়েদের বাইরে পড়তে পাঠানো প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু ফয়জুন্নেসা—নিরাপদ হোস্টেল নির্মাণ করেন হোস্টেলের সম্পূর্ণ ব্যয় নিজ জমিদারির আয় থেকে বহন করেনদরিদ্র মেধাবী ছাত্রীদের জন্য মাসিক বৃত্তি চালু করেনআজও তার ওয়াকফ সম্পত্তির আয় থেকে অসংখ্য ছাত্রী উপকৃত হয়। স্বাস্থ্যসেবায় বিপ্লবী উদ্যোগ১৮৯৩ সালে তিনি পর্দানশীল নারীদের চিকিৎসার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন—ফয়জুন্নেসা জেনানা হাসপাতাল এর পাশাপাশি—স্বতন্ত্র নারী হাসপাতাল দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র বঞ্চিত নারীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা তৎকালীন সমাজে নারীদের স্বাস্থ্যসেবায় এ উদ্যোগ ছিল অনন্য ও অতুলনীয়। সাহিত্যেও প্রথম কণ্ঠ—মুসলিম নারীর প্রথম বাংলা রচনা নওয়াব ফয়জুন্নেসাই রচনা করেন মুসলিম নারী কর্তৃক রচিত প্রথম বাংলা সাহিত্যকর্ম— ‘রূপজালাল’ এই উপন্যাস তাঁর সাহিত্যদক্ষতা, সমাজচেতনা ও সৃজনশীলতার অসামান্য পরিচয় বহন করে। দান ও জনহিতকর কাজে বিশাল অবদান রাস্তাঘাট নির্মাণ দিঘি ও জলাশয় খনন মসজিদ–মাদ্রাসা নির্মা গরিব ছাত্রীদের বৃত্তি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বহু স্থায়ী সম্পদ
মৃত্যুর আগে (১৯০৩ সালে) তিনি নিজের জমিদারির বড় অংশ ওয়াকফ করে যান।এ ওয়াকফের সুফল আজও লাকসাম অঞ্চলের মানুষ ভোগ করছে।
তাহলে কেন তাঁকে সামনে আনা হয় না? কারণ তিনি—ধার্মিক পর্দাশীল ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজসংস্কারের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি এ ধরনের নারীদেরকে “নারীবাদী আইকন” হিসেবে তুলে ধরতে অনেকেই আগ্রহী নন। কারণ তাদের তৈরি বয়ানে ধর্মপরায়ণ নারী উন্নয়নের নায়ক হতে পারে না—এমন ধারণা প্রচলিত।
অন্যদিকে বেগম রোকেয়া—ধর্মীয় মূল্যবোধ বিরোধী মত পুরুষবিদ্বেষী ভাষা পশ্চিমা প্রভাবে নির্মিত চিন্ত ইত্যাদির কারণে মূলধারার মিডিয়ার কাছে বেশি জনপ্রিয়। ফলে তাঁর অবদান অতিরঞ্জিতভাবে প্রচারিত হয়, আর ফয়জুন্নেসার বাস্তব ও মহত্তর অর্জন আড়ালে পড়ে যায়।
শেষকথা
ইতিহাস একদিন সত্যের কাছে ফিরে আসবেই।এখন প্রয়োজন—নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর অবদানকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।
তিনি প্রমাণ করেছেন—পর্দানশীল, ধর্মপরায়ণ নারীও সমাজের প্রকৃত অগ্রদূত হতে পারেন।নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্য, সাহিত্য, সমাজসেবা—সবক্ষেত্রেই তাঁর অবদান বেগম রোকেয়ার তুলনায় অধিক বিস্তৃত, শক্তিশালী এবং সুদূরপ্রসারী।এই মহান নারীকে উপেক্ষা করা ইতিহাসের প্রতি অবিচার। বাস্তব অগ্রদূতকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেওয়া—এখনই সময়।
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD