ব্যস্ত সময় কাটছে চলনবিলের জেলেদের

Spread the love

লিখন আহমেদ: বর্ষায় বিল আর গ্রীষ্মে আবাদি জমি এ নিয়ে গঠিত বাংলাদেশের বৃহত্তম বিলের নাম চলনবিল। সিরাজগঞ্জ নাটোর ও পাবনা জেলা জুড়ে যে জলাভুমি বর্ষা এবং বর্ষা পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সেটাই বিখ্যাত চলনবিল। শুকনো মৌসুমে চলনবিলের আসল সৌন্দর্য উপলব্ধি করা না গেলেও বর্ষাকালে চলনবিলের অপরুপ সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। বর্ষায় বিশাল চলনবিল কানায় কানায় পানিতে পূর্ণ হয়ে রুপের পসরা সাজিয়ে বসে। পুরো বর্ষাকাল জুড়েই চলনবিল পানিতে পুর্ণ থাকে। চারদিকে পানি থৈ থৈ করে। এসময় বিলের সৌন্দর্যে মানুষ বিমোহিত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা চলনবিলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চলনবিলে আসেন। এই মুহুর্তে দিগন্তপ্রসারি টলমল জলে এক নয়নমনোহর রুপে, এক অপরুপ সাজে সেজেছে চলনবিল। চলনবিল শুধু রুপে নয় গুনেও যেন অতুলনীয়। শুকনা মৌসুমে বিলের উচু জমিতে প্রায় সব ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়। দেশের অধিকাংশ খাদ্য শষ্যের যোগান আসে চলনবিল থেকে। খাদ্যশষ্যের মতোই মাছের ভান্ডার হিসেবে দেশে ব্যাপী পরিচিত রয়েছে চলনবিলের। ভরা বর্ষায় চলনবিল হয়ে ওঠে অনন্তযৌবনা। বর্ষার পানির সাথে প্রচুর পরিমান দেশি মাছ প্রবেশ করে বিলে। জেলেরা এসময় মেতে ওঠে মাছ শিকারে। বর্ষা মৌসুম ছাড়াও বিলের নিচু অংশে প্রায় পুরো বছরই চলে মাছ শিকার। বিলের মাছ দেশের বিভিন্ন স্থানের হাট-বাজারে বিক্রি হয়। এছাড়া চলনবিলের মাছের শুটকি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে ও রপ্তানি হচ্ছে। এ থেকে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে বহু মানুষের। পেশাদার জেলের পাশাপাশি অনেকে মৌসুমী জেলেরা মাছ ধরে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে তা বাজারে বিক্রি করে বাড়তি অর্থ উপার্জন করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশাল চলনবিলের সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, তাড়াশ, নাটোরের গুরুদাসপুর, পাবনার ভাঙ্গুড়া অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তৃত জলরাশির বুকে ঢেউ ভাঙার খেলা। মাঝেমধ্যে দিগন্ত রেখায় সবুজের আলপনা। এরই মধ্যে চলছে যান্ত্রিক শ্যালো নৌকা। আবার আছে মাছ ধরার বিচিত্র আয়োজনও। বর্ষাকালে মাছ ধরাতে মেতে উঠেছে বিল অঞ্চলের জেলেরা। খড়াজাল, মইজাল, ধর্মজাল, কারেন্টজাল, ঝাকিজাল, বাদাইজালসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে মাছ শিকার করছেন জেলে ও শৌখিন শিকারিরা। তাদের জালে ধরা পড়ছে পুটি, ট্যাংরা, পাঁতাসি, রায়েক, বাইলা, গুচি, টাকি, মৃগেল, কই, শিং, মাগুড়, বোয়াল সহ হরেক রকমের মাছ। জেলেরা শেষরাতে জাল ও নৌকা নিয়ে মাছ ধরে স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে। বর্ষাকালে স্থানীয় হাট-বাজার গুলোতে চাহিদার তুলনায় মাছের সরবরাহ বেশী থাকায় অন্যান্য সময়ের তুলনায় কম দামে বেচাকেনা হচ্ছে বিলের মাছ। এসব মাছ এলাকার স্থানীয়দের চাহিদা পুরন করার পর দেশের আনাচে কানাচে পৌঁছে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলনবিল দেশের মিঠা পানির সর্ববৃহৎ জলাভুমি। যমুনা নদীর বাঘাবাড়ি হুরাসাগর হয়ে বড়াল ও গুমনি নদীপথে বন্যার শুরুতে বিলে দেশীয় প্রজাতির মা মাছ প্রবেশ করে প্রজনন শুরু করে। এক সময় এ বিলটিতে শতাধিক প্রজাতির দেশি মাছ উৎপাদিত হতো। জমিতে অধিক পরিমান সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, যত্রতত্র পুকুর খনন ও স্থাপনা নির্মাণসহ নানা কারনে অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
চলনবিলে নৌকায় বসে চাঁই পেতে মাছ শিকারি বৃদ্ধ গোলাম মোস্তফা দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন, পাড়ে বাড়ি হওয়ায় ছোট বেলা থেকে বাবার সাথে বিলে মাছ ধরেন তিনি। শখ করে মাছ ধরতে শুরু করলেও পরবর্তীতে তা পেশা হয়ে হয়ে গেছে তার। এখন বয়সের ভারে আগের মতো আর মাছ ধরতে পারেন না তবুও সংসার চালাতে মাছ শিকার করছেন তিনি। পাঁচ বছর বয়স থেকে তিনি নানান সরঞ্জাম দিয়ে চলনবিলে মাছ ধরে আসছেন। একসময় বিলের পানিতে প্রচুর পরিমান দেশিয় মাছ থাকতো। কারেন্টজাল পেতে রাখলে দশ মিনিট পর তা তুলে দেখা যেতো মাছে ভরপুর। বাড়ির বউদের বর্ষাকালে মাছ পরিষ্কার করতে করতে হাতে ঘা হয়ে যেতো। সেসময়ের তুলনায় বর্তমানে বিলে মাছ নেই বললেই চলে। এখন বিলের মধ্যে যত্রতত্র পুকুর খনন বিলের মধ্যে দালান কোঠা নির্মাণ হয়েছে যার ফলে বিলের মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এখন দেশীয় প্রজাতির যেসব মাছ আছে বাজারে তার চাহিদা অনেক বেশী। অন্যান্য নদী কিংবা খালের মাছের তুলনায় চলনবিলের মাছ বেশী দামে বিক্রি করা যায়। তার মতো শতশত মানুষ মাছ ধরে জিবীকা নির্বাহ করছে বলে তিনি জানান।
চলনবিল অধ্যুষিত উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া এলাকার আলাউদ্দিন নামে এক জেলে বলেন, প্রথম ধাপের বন্যায় চলনবিলের প্রতিটি অঞ্চল কানায় কানায় পানিতে ভরপর। এখন চারদিকে পানিতে থৈ থৈ করছে। বিলে পানি ঢোকার আগে থেকেই আমরা জাল নৌকা সব প্রস্তুত করে রাখি। পানি আসলে কয়েকমাস জেলেরা মাছ ধরতে ব্যস্ত সময় পার করে। বর্ষার পুরো সময় জুড়ে চলনবিলের বিভিন্ন স্থানে জেলেরা সন্ধা থেকে সারারাত মাছ ধরে এবং সকালে স্থানীয় হাট-বাজারে তা বিক্রি করে। বর্তমানে বিলের পানি কমতে শুরু করেছে। পানি কমার সময় বেশী মাছ পাওয়া যায়। এখন তাদের জালে পুটি, ট্যাংরা, পাতাসি রায়েক ইত্যাদি দেশিয় প্রজাতির মাছ বেশী ধরা পড়ছে।
চলনবিল অঞ্চলের মাছ আড়তের কয়েকজন পাইকার বলেন, জেলেরা সারারাত বিলে মাছ ধরে ভোর থেকে মাছ আড়তে আনতে শুরু করে। এসময় বিলের মাছে আড়ত জমজমাট। পুরো বর্ষার সময়কাল জুড়ে জেলেরা চলনবিলে মাছ ধরে হাট-বাজার ও আড়তে বিক্রি করে। চলনবিল অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ মাছ শিকার করে তাদের তাদের জিবীকা নির্বাহ করছেন বলে তারা জানান।
চলনবিল অঞ্চলের প্রবীন সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক রাজু বলেন, শষ্য ও মৎসভান্ডার খ্যাত চলনবিল। এ বিলের উদারতায় কখনো সোনালী ধানে ভরে যায় কৃষকের গোলা, উঠোন জুড়ে শোভা পায় সরিষা, গম ভুট্টাসহ রকম শষ্য দানা। আবার কখনো জাল ভরা মাছে প্রাণ জুড়িয়ে যায় জেলেদের। বর্ষাকালে জেলেরা চলনবিলে মাছ শিকারে মেতে ওঠে। মাছ শিকার করে জিবীকা নির্বাহ করে অনেকে। জেলেরা সারারাত মাছ শিকার করে ভোর থেকে হাট-বাজারে তা বিক্রি শুরু করে। বর্ষাকালে চলনবিল অঞ্চলের হাট-বাজারে প্রচুর পরিমান দেশীয় মাছ পাওয়া যায়। চলনবিলের মাছে জেলেদের জীবিকা নির্বাহ ও সাধারন মানুষের দেশীয় মাছের চাহিদা পুরন হয়।
তিনি আরো বলেন, একসময় চলনবিলকে দেশীয় মাছের ভান্ডার বলা হতো। তবে এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। চলনবিল থেকে অসংখ্য প্রজাতির মাছের বিলুপ্তি ঘটেছে। জলবায়ুর প্রভাব ও মানবসৃষ্ট কারনে চলনবিলের জীব বৈচিত্রের অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে। চলনবিল রক্ষায় সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা দরকার বলে তিনি জানান।

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD