চলনবিলে ইউক্যালিপটাস : পরিবেশ হুমকির মুখে

Spread the love

শাহজাহান আলী

চলনবিলের সিরাজগঞ্জ, নাটোর পাবনাসহ উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় রাক্ষুসে বৃক্ষ ইউক্যালিপটাসের বিরূপ প্রভাবে জনস্বাস্থ্যসহ পরিবেশ ও কৃষি জমি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। পরিবেশ বিপর্যয়ে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে কৃষি জমিসহ জনজীবন। যেসব জনবসতি এলাকায় অধিক পরিমাণে ইউক্যালিপটাস গাছ আছে সেসব বাড়ির শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্ট হতে পারে। কৃষি বিভাগ বলছে, কৃষকদের এই গাছের চারা উৎপাদন, রোপণ, সংরক্ষণ ও সরবরাহে নিরুৎসাহিত করা হয়ে থাকে। এরপরও মানুষ পরিবেশ বিধ্বংসী এই রাক্ষুসে বৃক্ষ ইউক্যালিপটাস রোপণ করছে দেদারছে।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশের হামকুড়িয়া গ্রামের কৃষিবিদ শিহাব উদ্দিন বলেন, বাড়ীর আশেপাশে রাস্তার দুপাশে নিষিদ্ধ এই গাছ লাগাচ্ছে লোকজন। ইউক্যালিপটাস বড় হলে বিক্রি করে কাটার পর আবার এই গাছ লাগাতে একের পর এক প্রতিযোগিতা করতে দেখা যাচ্ছে। কিছু কিছু ব্যক্তিদের দেখা যায়, লাগানো ইউক্যালিপটাস গাছ বিক্রি করে এবার নতুন ঘর তুলেছেন। শূন্যস্থানে আবারো লাগাবে সেই ইউক্যালিপটাস গাছ। কিন্তু তারা নিজেও জানেনা তার অজান্তে পরিবেশের কি ক্ষতি করছে বিষময় ইউক্যালিপটাস লাগিয়ে।

তার মত অনেকেই জানেনা ইউক্যালিপটাস এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে। একজন কৃষক জানান, ‘তার প্রতিবেশির দেখাদেখি সেও জমির আইলে ৫০-৬০টি ইউক্যালিপটাস লাগিয়েছেন। সাময়িক লাভের আশায় ইউক্যালিপটাস লাগিয়ে এখন তিনি ক্ষতিগ্রস্থ। আগের মতো তার জমিতে ভালো চাষাবাদ হচ্ছে না। দিন দিন পানিশূন্যতায় শুকনো হয়ে পড়েছে তার জমি।এমন অসংখ্য মানুষ ইউক্যালিপটাস গাছকে ঘিরে স্বল্প সময়ে বেশি লাভের স্বপ্ন দেখছেন। একারণে গত দুই দশকে অস্বাভাবিক হারে এই গাছে ছেয়ে গেছে পুরো উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলা যার মধ্যে চলনবিলও রয়েছে।

চলনবিলের বিভিন্ন সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসভূমি ও কৃষি জমি সবখানেই এর ছড়াছড়ি। যেন দিগন্ত জুড়ে ইউক্যালিপটাসের সমারোহ। কৃষকরা বলছেন, জমির আইলে ইউক্যালিপটাস রোপণ করার পর থেকে ক্ষেতে আর পানি থাকে না। দিন দিন ফসলের উৎপাদন কমে যায়। কম সময়ে এই গাছ অনেক বড় হয় এটাই এ গাছের প্রতি আকর্ষণের মূল কারণ। ইউক্যালিপটাস গাছ আশপাশে প্রয় ৫০ ফুট এলাকার পানি শোষণ করে ও আকাশে তুলে দেয়। জমির আইল, কৃষি জমি ও পতিত জমিতে লাগানো এই গাছ উপকারের পরিবর্তে অপকারই বেশি করে। পরিবেশ উপযোগী না হওয়ায় ২০০৮ সালে সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশে ইউক্যালিপটাসের চারা উৎপাদন নিষিদ্ধ করে। তবে কৃষকরা না জেনে ইউক্যালিপটাসের চারা রোপণ করছেন। এভাবেই গড়ে উঠেছে শত শত ইউক্যালিপটাসের বাগান। এতে হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ ও কৃষি জমি।

নিষিদ্ধ এই গাছের চারা উৎপাদনের সরকারি নিয়ম-নীতির কথা জানেন না স্থানীয় নার্সারি মালিকরাও। অন্যান্য বনজ বা ফলদ চারার চেয়ে এই চারা উৎপাদনে ২ থেকে ৩ গুণ বেশি লাভ হয়। এই লোভে তারা বেশি করে চারা উৎপাদন করছেন। ফলে স্কুল-কলেজ-মাদরাসা, বসত-বাড়ি, অফিস-আদালত, রাস্তা-ঘাটে, খেলার মাঠে, হাট-বাজারসহ ফসলের মাঠজুড়ে অন্যান্য ফসলের সঙ্গে ব্যাপকভাবে শোভা পাচ্ছে ইউক্যালিপটাস গাছ। সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন বৃক্ষ ও পরিবেশবিদগণ।

ইউক্যালিপটাস গাছের চারার অবাধ উৎপাদন, বিপণন ও রোপণ বৃদ্ধির ফলে দেশের উত্তরাঞ্চল মরুভূমির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দিন দিন এ অঞ্চলে পানির স্তর কমে আসছে। এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাবের ফলে চলনবিলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছরই নীচে নেমে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবেকাজ দিচ্ছে ক্ষতিকর  ইউক্যালিপটাস । এক সময়ের বেলে দোআঁশ আর কাঁদা মাটিভরা উত্তরাঞ্চল এখন পানি শুষ্কতায় ভুগছে। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষি জমি ও চাষাবাদ। পরিবেশ ভারসাম্যহীন ইউক্যালিপটাস গাছের কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়ছে। সাধারণ গাছ প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারাসাম্য রক্ষার পাশাপাশি প্রাণীকূলের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসে নাইট্রোজেন গ্রহণ করে আর অক্সিজেন সরবরাহ করে সহায়তা করে। কিন্তু ইউক্যালিপটাস তা না করে বরং এই গাছ অক্সিজেন গ্রহণ, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ এবং নাইট্রোজেন নির্গমণ করে। ইউক্যালিপটাসের পাতা ও ডালপালা অজৈব পদার্থের মত কাজ করে কৃষি জমিকে অনুর্বর করে। ফলে ফসলের উৎপাদন কমে যায়। সামাজিক বনায়ন নার্সারী ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সামাজিক বন বিভাগের একজন চারা উৎপাদনকারী জানান, এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ৫ শতাধিক ইউক্যালিপটাস গাছ আছে। এই কেন্দ্র প্রতিবছর ৫শ হাজার ইউক্যালিপটাস গাছের চারার উৎপাদন করে থাকে। যা সামাজিক বন বিভাগের সদস্যরা পেয়ে থাকে। তিনি বলেন এখানকার সদস্যরা তাদের বাড়ীর আশেপাশে,রাস্তার ধারে ইউক্যালিপটাস গাছের চারা রোপণ করে থাকে। রংপুর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুজ্জামান শাহ বলেন, সরকারীভাবে ইউক্যালিপটাস গাছের চারার উৎপাদন করা হয় না। বেসরকারী কিছু নার্সারী এসব গাছের চারা উৎপাদন করে থাকে। কারমাইকেল কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক নাজমা বেগম জানান, ‘আমাদের দেশে বর্তমানে বৃষ্টিপাত খুব বেশি হয় না। গ্রামের বেশিরভাগ বড় বড় নদ-নদী বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে হয়েছে। এতে দেশের কৃষি জমি শুকনো হয়ে যাচ্ছে। এই রকম শুকনো জমিতে ইউক্যালিপটাস গাছ রোপণ করা ঠিক নয়। কারণ ইউক্যালিপটাস গাছ প্রচুর পানি শোষণ করে। তাড়াশ রিপোটার্স ইউনিটির সভাপতি মির্জা ফারুখ আহম্মেদ জানান, ‘আমাদের জলবায়ুর জন্য ইউক্যালিপটাস গাছ মোটেও উপযোগী নয়। উপরন্তু কৃষি জমি এবং আশপাশের মাটি থেকে অতিমাত্রায় পানি শোষন করে মারাত্মকভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছে এই রাক্ষুসে গাছ।’ এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক ডক্টর সারওয়ারুল হক জানান, ‘কৃষি জমির জন্য ইউক্যালিপটাস মারাত্বক হুমকি। পানি খেকো এই গাছ প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ লিটার পানি শোষণ করে মাটিকে নিরস ও শুষ্ক করে ফেলে। ইউক্যালিপটাস গাছ ৫ বছরে ৯২ মিটার লম্বা হতে পারে। মাটির নীচের গোড়ায় ২০-৩০ ফুট জায়গা নিয়ে চারদিকে থেকে ইউক্যালিপটাস পানি শোষণ করে। ফলে অন্যান্য ফলদ গাছের ফলন ভালো হয় না। পুকুরের পানি দূষণ করে। এ গাছে কোনো পাখি বাসা বাধে না। পাতা সহজে পচে মাটিতে মিশে না। ইউক্যালিপটাস গাছের ফলের রেণু নিঃশ্বাসের সঙ্গে দেহে প্রবেশ করলে অ্যাজমা হয়। এমনকি যে বসত-বাড়িতে অধিক পরিমাণে ইউক্যালিপটাস গাছ আছে সেসব বাড়ির শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্ট হতে পারে। আমরা কৃষকদের এই গাছের চারা উৎপাদন, রোপণ ও সরবরাহে নিরুৎসাহিত করে থাকি।এব্যাপারে উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদগুলো কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা।

 

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD