গল্পের নয়, জীবনের সত্যিকারের নায়ক বাবা

Spread the love
লেখকঃ মোঃ হাফিজুর রহমান
পৃথিবীতে নায়কের অভাব নেই। সিনেমার পর্দায়, গল্পের বইয়ে কিংবা ইতিহাসের পাতায় আমরা অসংখ্য নায়কের কথা পড়ি। তাদের সাহস, সংগ্রাম আর সাফল্যের গল্প আমাদের মুগ্ধ করে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় নায়ককে আমরা অনেক সময় দেখতে পাই না। কারণ তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন না, নিজের গল্প নিজে বলেন না। তিনি আমাদের ঘরেই থাকেন। তিনি আমাদের বাবা।
শৈশবে বাবাকে আমরা শুধু একজন অভিভাবক হিসেবে দেখি। তিনি আমাদের স্কুলে নিয়ে যান, হাত ধরে রাস্তা পার করান, বাজার থেকে পছন্দের খাবার কিনে আনেন। তখন মনে হয়, এসবই স্বাভাবিক। বাবা তো এমনই। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন জীবনের বাস্তবতা সামনে আসে, তখন বুঝতে পারি, এই স্বাভাবিকতার পেছনে ছিল অসাধারণ ত্যাগ আর নিরন্তর সংগ্রাম।
একজন বাবা কখনো চান না তার সন্তান তার কষ্ট দেখুক। তাই তিনি নিজের দুঃখ, অভাব আর ব্যর্থতাগুলো হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে রাখেন। মাসের শেষে সংসারের হিসাব মেলাতে না পারলেও সন্তানের মুখে হতাশা দেখতে চান না। নিজের প্রয়োজনকে ছোট করে সন্তানের প্রয়োজনকে বড় করে দেখেন। নিজের স্বপ্নগুলো নীরবে গুছিয়ে রেখে সন্তানের স্বপ্ন পূরণের জন্য ছুটে চলেন।আমাদের নতুন জামা কেনার আনন্দের পেছনে হয়তো ছিল বাবার অপূর্ণ একটি শখ। আমাদের পড়াশোনার খরচ চালাতে গিয়ে হয়তো তিনি নিজের অনেক ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়েছেন। কিন্তু কখনো মুখ ফুটে বলেননি। কারণ একজন বাবার সবচেয়ে বড় সুখ হলো, তার সন্তান ভালো থাকুক।
বাবার ভালোবাসা অনেকটা নদীর গভীর জলের মতো। বাইরে থেকে শান্ত, কিন্তু ভেতরে সীমাহীন। তিনি হয়তো প্রতিদিন বলেন না, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।” কিন্তু ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে কাজে যাওয়ার মধ্যে, অসুস্থ সন্তানের পাশে নির্ঘুম রাত কাটানোর মধ্যে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করার মধ্যে সেই ভালোবাসা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ধীরে ধীরে বাবাকে নতুন করে চিনতে শুরু করি। একসময় লক্ষ্য করি, তার চুলে পাক ধরেছে। যে হাত একসময় আমাদের শক্ত করে ধরে রাখত, সেই হাতেও বয়সের ছাপ পড়েছে। যে মানুষটি সারাজীবন আমাদের জন্য লড়াই করেছেন, তিনিও আজ ক্লান্ত হন, অসুস্থ হন, বিশ্রাম চান। তখন বুকের ভেতর এক ধরনের অপরাধবোধ জন্ম নেয়। মনে হয়, মানুষটাকে আমরা কত কম বুঝেছি!জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্যগুলোর একটি হলো, বাবার ত্যাগের পুরো হিসাব কোনো সন্তানই কখনো বুঝে উঠতে পারে না। কারণ তার দেওয়া ভালোবাসা মাপার কোনো যন্ত্র নেই, তার নির্ঘুম রাতগুলোর কোনো হিসাব নেই, তার বিসর্জন দেওয়া স্বপ্নগুলোর কোনো তালিকা নেই।
অনেক সময় আমরা জীবনের ব্যস্ততায় বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় পাই না। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় চাওয়া হয়ে দাঁড়ায় সন্তানের একটু সময়, একটু খোঁজখবর, একটু আন্তরিকতা। হয়তো তিনি কিছু বলবেন না, কিন্তু আপনার একটি ফোন কল, একটি খোঁজ নেওয়া কিংবা পাশে বসে কিছুক্ষণ গল্প করাই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান উপহার।যাদের বাবা আজও জীবিত আছেন, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষদের একজন। কারণ তাদের মাথার ওপর এখনো এমন একজন মানুষ আছেন, যিনি নিঃস্বার্থভাবে তাদের জন্য দোয়া করেন, তাদের সফলতা দেখে আনন্দ পান, আর বিপদে পড়লে নীরবে কষ্ট পান।বাবাকে ভালোবাসার জন্য কোনো বিশেষ দিনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু তাকে অনুভব করার। তাকে জানিয়ে দেওয়ার যে, তার ত্যাগ বৃথা যায়নি। তার সন্তানেরা আজও তাকে জীবনের সবচেয়ে বড় নায়ক মনে করে।
কারণ সত্যিই, জীবনের সবচেয়ে বড় নায়ক কোনো গল্পের চরিত্র নয়। তিনি কোনো সিনেমার সুপারহিরো নন। তিনি আমাদের ঘরেই আছেন। তিনি আমাদের বাবা।
লেখকঃ মোঃ হাফিজুর রহমান
সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
মোবাইলঃ ০১৬০৮-৩৯০৭০৬;
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD