কর্মফল প্রদানে আল্লাহ তায়ালার নীতি

Spread the love
মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ, তরুণ আলোচক, গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদ
এই পৃথিবী শুধু ঘটনাপ্রবাহের সমষ্টি নয়; এটি মহান রবের পরিচালিত এক সুবিশাল পরীক্ষাগার। এখানে মানুষের প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, প্রতিটি পদক্ষেপ এবং এমনকি অন্তরের গোপন ইচ্ছাও আল্লাহ তায়ালার জ্ঞানের বাইরে নয়। অনেক সময় মানুষ মনে করে, তার অন্যায়, জুলুম কিংবা প্রতারণা হয়তো মানুষের চোখ এড়িয়ে গেছে। কিন্তু সে ভুলে যায়—মানুষের আদালত থেকে রেহাই পাওয়া গেলেও আল্লাহর আদালত থেকে কখনো রেহাই পাওয়া যায় না।
আল্লাহ তায়ালার একটি চিরন্তন নীতি হলো—তিনি কর্মের ফল প্রদান করেন। কখনো দুনিয়াতেই, কখনো আখিরাতে, আবার কখনো উভয় জগতেই। তাঁর বিচার বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু বাতিল হয় না। তাঁর শাস্তি দেরি হতে পারে, কিন্তু অবিচার হয় না।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে। আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সেও তা দেখতে পাবে।”
(সূরা আয-যিলযাল: ৭-৮)
এই আয়াত মানবজীবনের এক গভীর সত্যকে তুলে ধরে। আমাদের প্রতিটি কর্মের হিসাব সংরক্ষিত হচ্ছে। কোনো ভালো কাজ হারিয়ে যায় না, কোনো মন্দ কাজও উপেক্ষিত থাকে না।
ইতিহাস সাক্ষী, জালিমের শক্তি যত বড়ই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তার পতন অনিবার্য। ফিরআউনের ছিল রাজত্ব, কারূনের ছিল সম্পদ, নমরূদের ছিল ক্ষমতা। কিন্তু তাদের অহংকার ও সীমালঙ্ঘনের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। অন্যদিকে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা মানুষদের জন্য আল্লাহ তায়ালা সম্মান ও সফলতা নির্ধারণ করেছেন।
আমরা প্রায়ই দেখি, কেউ অন্যায় করে সুখে আছে, আর নিরীহ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—আল্লাহর বিচার কোথায়? কিন্তু মনে রাখতে হবে, আল্লাহর সময় আর মানুষের সময় এক নয়। তিনি যখন বিচার করেন, তখন তা এমনভাবে করেন যে, মানুষ বিস্মিত হয়ে যায়। কখনো সেই বিচার ব্যক্তির জীবদ্দশায় আসে, কখনো তার উত্তরাধিকারীদের মাধ্যমে আসে, আবার কখনো আখিরাতের জন্য সংরক্ষিত থাকে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা শুধু শাস্তির ক্ষেত্রেই কর্মফল দেন না; পুরস্কারের ক্ষেত্রেও তাঁর নীতি সমান কার্যকর। কেউ গোপনে মানুষের উপকার করলে, অসহায়ের পাশে দাঁড়ালে, চোখের পানি মুছে দিলে কিংবা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো ত্যাগ স্বীকার করলে—আল্লাহ তা ভুলে যান না। হয়তো মানুষ তাকে মূল্যায়ন করবে না, কিন্তু আসমানের মালিক তার জন্য এমন প্রতিদান প্রস্তুত করেন, যা মানুষের কল্পনারও অতীত।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিক্ষা দিয়েছেন যে, দয়া করলে দয়া পাওয়া যায়, ক্ষমা করলে ক্ষমা পাওয়া যায়, আর মানুষের জন্য সহজ করলে আল্লাহ বান্দার জন্য সহজ করে দেন। এটি কর্মফল প্রদানেরই এক অপূর্ব উদাহরণ।
আজকের সমাজে আমরা যদি শান্তি, সৌহার্দ্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই কর্মফলের এই নীতির প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে। যে ব্যক্তি জানে তার প্রতিটি কাজের হিসাব হবে, সে অন্যায় করতে ভয় পাবে। আর যে ব্যক্তি জানে তার প্রতিটি ভালো কাজ সংরক্ষিত হচ্ছে, সে নেক আমলে উৎসাহিত হবে।
সুতরাং, আসুন আমরা কারো প্রতি জুলুম না করি, কারো হক নষ্ট না করি, কাউকে কষ্ট না দিই। কারণ কর্মফল অবধারিত। আজ আমরা যা বপন করছি, কাল তারই ফসল ঘরে তুলব। মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালার বিচার থেকে পালানোর কোনো পথ নেই।
মনে রাখবেন—আল্লাহর পাল্লা কখনো ভুল ওজন করে না। তাঁর আদালতে সুপারিশ, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার জোর চলে না। সেখানে শুধু আমল কথা বলবে। তাই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এমন কাজ করি, যা আমাদের জন্য কল্যাণের পাথেয় হবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাঁর ন্যায়বিচারের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী হওয়ার এবং সৎকর্মে অগ্রগামী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক দাঈ ও গবেষক 
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD