মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ হাফিজাহুল্লাহ
রমাদানের আগমনের আগে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যে বিশেষ প্রস্তুতির সময় দান করেছেন, তার নাম পবিত্র শা‘বান মাস। এই মাস হলো আত্মশুদ্ধির সূচনা, ইবাদতের ধারাবাহিকতা গড়ে তোলার সময় এবং রমাদানের জন্য নিজেকে মানসিক ও আমলগতভাবে প্রস্তুত করার সুবর্ণ সুযোগ। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ মাসটি অনেক সময় আমাদের উদাসীনতার আড়ালে হারিয়ে যায়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, সে মাসের প্রতি গাফেল হওয়া একজন মুমিনের জন্য আত্মঘাতী ক্ষতির কারণ হতে পারে।আসুন, সহীহ হাদীসের আলোকে পবিত্র শা‘বান মাসের ফযীলত, করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো সংক্ষেপে জেনে নিই।
শা‘বান মাসের ফযীলত
শা‘বান মাস এমন একটি সময়, যখন বান্দার আমল আল্লাহ তাআলার দরবারে উত্তোলন করা হয়। সাহাবি উসামা ইবন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, তিনি একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন— কেন আপনি শা‘বান মাসে অন্য মাসের তুলনায় বেশি রোজা রাখেন?রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বলেন, এটি রজব ও রমাদানের মধ্যবর্তী এমন একটি মাস, যে মাস সম্পর্কে মানুষ সাধারণত গাফেল থাকে। অথচ এই মাসেই আমলসমূহ আল্লাহ তাআলার কাছে উত্তোলন করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি, আমি রোজা অবস্থায় থাকতেই যেন আমার আমল উত্তোলন করা হয়।
সহীহুন নাসাঈ, হাদীস নম্বর ২৩৫৭
এই হাদীস আমাদেরকে জানিয়ে দেয়, শা‘বান মাস হলো আত্মসমালোচনার সময়। নিজের ইবাদত, চরিত্র ও গুনাহের হিসাব নেওয়ার উপযুক্ত সময় এটি।এ মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রচুর নফল সিয়াম পালন করতেন। উম্মে সালমা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শা‘বান ও রমাদান ছাড়া অন্য কোনো দুই মাস একসঙ্গে এত বেশি রোজা রাখতে দেখেননি।
সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নম্বর ২৩৩৬ শা‘বান মাসে করণীয় আমলশা‘বান মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা সুন্নাতসম্মত আমল। তবে মাসের শেষ দিন অর্থাৎ ৩০ শা‘বানে রোজা রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে।যারা পুরো মাস রোজা রাখতে পারবেন না, তারা অন্তত সোম ও বৃহস্পতি বার এবং মাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখের রোজা আদায়ের চেষ্টা করবেন।নারীদের জন্য এই মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হায়েজ বা অন্য কারণে পূর্ববর্তী রমাদানের যেসব ফরজ রোজা বাকি রয়েছে, সেগুলো শা‘বান মাসেই আদায় করে নেওয়া উত্তম।
এই মাসে বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দরুদ পাঠ করা উচিত। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করে নিয়মিত পাঠ করলে আত্মশুদ্ধিতে সহায়ক হয়।
শা‘বান মাস থেকেই তাহাজ্জুদের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। রমাদানে রাতের ইবাদত সহজ করতে হলে আগেই অভ্যস্ত হওয়া জরুরি।ফরজ সালাত যথাসময়ে আদায় করা এবং খুশু-খুযু অর্জনের চেষ্টা করা এই মাসের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। পাশাপাশি ইশরাক, চাশত, তাহিয়্যাতুল ওযু প্রভৃতি নফল সালাতের অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে।কুরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য এই মাসকে ভিত্তি বানাতে হবে। নিয়মিত তিলাওয়াত, অর্থ অনুধাবন ও সংক্ষিপ্ত তাফসির পাঠের মাধ্যমে হৃদয়কে কুরআনের আলোয় আলোকিত করা জরুরি।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গুনাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং নফসের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করা। কারণ পরিচ্ছন্ন অন্তর ছাড়া রমাদানের বরকত লাভ করা সম্ভব নয়।
শা‘বান মাসে বর্জনীয় বিষয়
শা‘বান মাসকে কেন্দ্র করে কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে সতর্ক থাকা আবশ্যক।
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর আয়োজন, আতশবাজি, বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা কিংবা নির্দিষ্ট রাতভিত্তিক সম্মিলিত ইবাদতের প্রচলন থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব বিষয়ে সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত কোনো নির্দিষ্ট আমল নেই।
এছাড়া শা‘বান মাসের কোনো দিন বা রাতকে বিশেষভাবে নির্ধারণ করে আলাদা কোনো আমল চালু করাও পরিহার করা উচিত।
শা‘বান হোক আমাদের আত্মশুদ্ধির সূচনা, গুনাহ ত্যাগের দৃঢ় অঙ্গীকার এবং রমাদানের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতির মাস। যে ব্যক্তি শা‘বানকে গুরুত্ব দিয়ে কাটাতে পারে, তার জন্য রমাদান হয়ে ওঠে অধিক ফলপ্রসূ ও জীবনঘনিষ্ঠ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র শা‘বান মাসের মর্যাদা উপলব্ধি করে সুন্নাত অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com