লেখক: মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
গণতন্ত্রের মূল কথা খুব সহজ—রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে এই সহজ সত্যটি প্রায়ই ক্ষমতার হিসাব, দলীয় কৌশল ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে আড়াল হয়ে যায়। এমন বাস্তবতায় গণভোটের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রশ্ন হলো—গণভোট কি সত্যিই জনগণের সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটায়, নাকি এটি কেবল ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ?
গণভোটের দর্শন নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণ সরাসরি মত প্রকাশ করবে—এর চেয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আর কী হতে পারে? কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রক্রিয়া কার্যকর হওয়ার আগেই নানা প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে পড়ে। কারণ সমস্যা পদ্ধতিতে নয়, সমস্যা রাজনৈতিক মানসিকতায়।
আজকের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো আস্থার সংকট। সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করে—ভোট হোক বা গণভোট, ফলাফল আগেই নির্ধারিত থাকে। এই বিশ্বাসহীনতা রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়। যখন জনগণ বিশ্বাস হারায় যে তাদের মতামত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে, তখন গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আরেকটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা। গণভোট সফল করতে হলে প্রয়োজন মুক্ত আলোচনা, নিরপেক্ষ তথ্যপ্রবাহ এবং ভয়মুক্ত পরিবেশ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, প্রশ্ন তোলাকেই অনেক সময় রাষ্ট্রবিরোধিতা বা শত্রুতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এতে জনগণের মতামত স্বাধীন থাকে না; গণভোট তখন গণরায়ের প্রতিফলন না হয়ে ক্ষমতার সংখ্যাগত প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।
এক্ষেত্রে শুধু শাসকগোষ্ঠীকে দায়ী করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার দিকেও তাকাতে হবে। অনেক সময় গণভোট বা গণতন্ত্রের দাবি ওঠে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে। গণতন্ত্র যখন নীতির জায়গা থেকে সরে কৌশলের বিষয়ে পরিণত হয়, তখন জনগণের আস্থা আরও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
তবু হতাশার মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক সচেতনতা এবং তরুণ প্রজন্মের প্রশ্নমুখর অবস্থান একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আজ মানুষ আগের চেয়ে বেশি জানতে চায়, বুঝতে চায় এবং প্রশ্ন তুলতে সাহসী হচ্ছে। সঠিক আইনি কাঠামো, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে গণভোট জনগণের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত একটি কথাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—গণভোট কোনো যাদুকরি সমাধান নয়। এটি কার্যকর হবে তখনই, যখন রাষ্ট্র জনগণকে কেবল ভোটার হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। অন্যথায় গণভোট থাকবে শিরোনামে, রাজনীতি চলবে আগের পথেই, আর জনগণ থেকে যাবে দর্শকের ভূমিকায়।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com