হুদায়বিয়ার সন্ধিমুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ ।
ষষ্ঠ হিজরির জিলকদে রাসূল (ﷺ) উমরা করার নিয়তে ইহরাম বাঁধেন। তাঁর সঙ্গে ১৪ বা ১৫ শত সাহাবির বিরাট জামাআত মক্কা অভিমুখে রওনা হয়। হুদায়বিয়া মক্কা থেকে এক মঞ্জিল(১৫৭) দূরে একটি কূপের নাম; এর নামানুসারেই এলাকার নামও হুদায়বিয়া। রাসূল (ﷺ) এখানে যাত্রাবিরতি করেন।(১৫৮)
রাসূল (ﷺ) এর মুজিজাসেখানে একটি কূপ একেবারে শুকনো ছিল। রাসূল (ﷺ) এর মুজিজায় সেটি পানিতে ভরে ওঠে। হুদায়বিয়ায় পৌঁছার পর তিনি উসমান রা.-কে কুরাইশদের এ মর্মে অবহিত করতে মক্কায় পাঠান যে, তিনি এবার শুধু বায়তুল্লাহ জিয়ারত ও উমরা পালনের জন্যই তাশরিফ এনেছেন, এ ছাড়া অন্য কোনো (রাজনৈতিক) উদ্দেশ্য তাঁর নেই।
উসমান রা. মক্কা পৌঁছতেই কুরাইশ কা/ফিররা তাঁকে আটক করে ফেলে। এদিকে মুসলিমদের মধ্যে এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, কাফিররা তাঁকে হত্যা করেছে। রাসূল (ﷺ) এর কাছে যখন এ সংবাদ আসে, তখন তিনি একটি বাবলা গাছের নিচে বসে সাহাবিদের কাছ থেকে জি/হা*দের বায়আত নেন। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে এবং এটিকে বায়আতে রিজওয়ান বলা হয়।(১৫৯)
পরে জানা যায়, উসমান-হত্যার খবরটি ছিল মিথ্যা; বরং কুরাইশরা মুসলিমদের সঙ্গে সন্ধির প্রস্তাবে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং সন্ধির শর্তসমূহ চূড়ান্ত করতে সুহায়েল ইবনু আমরকে পাঠায়। পরে নিম্নোক্ত শর্তগুলো চূড়ান্ত করে অঙ্গীকারপত্র লেখা হয় এবং ১০ বছরের জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি চুক্তি হয় :
১. মুসলিমরা এবার উমরা না করেই ফিরে যাবেন।
২. আগামী বছর হজ করতে এসে মাত্র তিন দিন থেকে ফিরে যাবেন।
৩. অ*স্ত্র সজ্জিত হয়ে আসতে পারবেন না। তরবারি সঙ্গে রাখা যাবে, তবে তা কোষবদ্ধ থাকবে।
৪. মক্কা থেকে কোনো মুসলমানকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবেন না।
৫. কোনো মুসলমান যদি মক্কায় চলে আসতে চায়, তাকে বাধা দেওয়া যাবে না।
৬. যদি কেউ মদিনা চলে যায়, তাহলে রাসূল (ﷺ) তাকে ফেরত পাঠাবেন।
৭. মদিনা থেকে কেউ মক্কায় চলে এলে কা/ফিররা তাকে ফেরত পাঠাবে না।
এসব শর্ত যদিও বাহ্যত মুসলিমদের বিরুদ্ধে এবং প্রকাশ্যভাবে পরাজয় ও বৈষম্যমূলক ছিল; কিন্তু মহান আল্লাহ কুরআনে একে ‘মহা বিজয়’ বলে অভিহিত করেন। সাহাবিগণ এভাবে নতজানু হয়ে সন্ধি করাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। রাসূল (ﷺ) তাঁদের মনোভাব বুঝতে পেরে বলেন, ‘আমার প্রতি এটাই মহান আল্লাহর নির্দেশ এবং এতেই আমাদের ভবিষ্যৎ-কল্যাণ নিহিত।’
পরবর্তীকালের ঘটনাসমূহ এ রহস্যের সমাধান করে দেয়- যেমন : সন্ধির কল্যাণে শান্তি ও পূর্ণ নিরাপত্তার সঙ্গে মক্কা-মদিনার মধ্যে যাতায়াত শুরু হয়। কা/ফিররা রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে এবং মুসলিমদের কাছে বিনা বাধায় আসা-যাওয়া করতে থাকে। এদিকে ইসলামি চরিত্রের চুম্বক শক্তি কা/ফিরদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করতে শুরু করে।
ইতিহাসবিদরা বলেন, এ সময় এত অধিক পরিমাণ লোক ইসলাম গ্রহণ করে, ইতিপূর্বে কখনো এমন হয়নি। প্রকৃতপক্ষে এ সন্ধি ছিল মক্কা-বিজয়েরই ভূমিকা।
বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে চিঠিহুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে দাওয়াতের পথ মসৃণ হয়। তখন রাসূল (ﷺ) সত্যের এই আহ্বান গোটা দুনিয়ার শাসকদের কাছে পৌঁছে দিতে মনস্থ করেন। সুতরাং এ উদ্দেশ্যে আমর ইবনু উমাইয়া রা. কে হাবশার বাদশাহ আসহামা নাজাশির কাছে পাঠান। আসহামা রাসূল (ﷺ) এর চিঠিটি তাঁর উভয় চোখে রেখে সিংহাসন থেকে নিচে নেমে মাটিতে বসে পড়েন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল (ﷺ) -এর যুগেই তিনি ই*ন্তেকাল করেন।
দাহইয়া কালবি রা.-কে রোম-সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে পাঠান। রাসূল (ﷺ) যে সত্য নবি, তা তিনি অকাট্য প্রমাণাদি ও অতীতের আসমানি গ্রন্থসমূহের মাধ্যমে স্পষ্ট জানতে পেরেছিলেন। তখন সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা করেন; কিন্তু এতে তার সকল প্রজা খেপে যায়। তাই তিনি এই চিন্তায় ভীষণ ভয় পেয়ে যান যে, আমি যাদি ইসলাম গ্রহণ করি, এরা আমাকে সিংহাসনচ্যুত করবে। এ জন্য তিনি ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।
আবদুল্লাহ ইবনু হুজায়ফা রা.-কে পারস্যের সম্রাট খসরু পারভেজের কাছে পাঠান। এই হতভাগা রাসূল (ﷺ) এর চিঠির সঙ্গে অত্যন্ত ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করে এবং চিঠিটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে। রাসূল (ﷺ) এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি তার জন্য বদদুআ করেন-‘আল্লাহ তার সাম্রাজ্যকে এমন ভাবে টুকরো টুকরো করে দিন, যেভাবে সে আমার চিঠিটি টুকরো টুকরো করেছে।’ রাসূল (ﷺ) এর দুআ বিফলে যায়নি। কিছুদিন পরই খসরু পারভেজ তার পুত্র শিরওয়াহর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়।
এ ছাড়া হাতিব ইবনু আবি বালতাআ রা.-কে মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার বাদশাহ মুকাওকিসের কাছে পাঠান। আল্লাহ তাঁর অন্তরে ইসলামের সত্যতা ও রাসূল (ﷺ) সম্পর্কে বিশ্বাস ঢেলে দিয়েছিলেন। ফলে বাদশাহ মুকাওকিস হাতিব ইবনু আবি বালতাআর রা. সঙ্গে অত্যন্ত উত্তম আচরণ করেন এবং রাসূল (ﷺ) এর জন্য কিছু উপহারও পাঠান। এর মধ্যে মারিয়া কিবতিয়া নামের একজন দাসী এবং দুলদুল নামে সাদা রঙের একটি খচ্চরও ছিল। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, ১ হাজার স্বর্ণমুদ্রা আর একজোড়া কাপড়ও ছিল।আমর ইবনুল আস রা.-কে চিঠিসহ আম্মানের বাদশাহ জাইফার ও আবদুল্লাহর কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পাঠান। তাঁদের উভয়ের অন্তরেও ব্যক্তিগত অনুসন্ধান আর আসমানি কিতাবাদির মাধ্যমে রাসূল (ﷺ) এর সত্য নবি হওয়া সম্পর্কে বিশ্বাস জন্মে। পরে তাঁরা উভয়ে মুসলমান হন। তখন থেকেই তাঁরা তাঁদের প্রজাদের কাছ থেকে যাকাত সংগ্রহ করতে থাকেন এবং আমর ইবনুল আসের হাতে যাকাতের সেসব সম্পদ অর্পণ করেন।
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) ও আমর ইবনুল আস (রা.) এর ইসলাম গ্রহণখালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. তখন পর্যন্ত প্রতিটি যুদ্ধে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অসাধারণ রণ-নৈপুণ্য দেখিয়ে আসছিলেন। অধিকাংশ যুদ্ধে, বিশেষত উহুদযুদ্ধে তাঁর কারণেই কা/ফিরদের পিচ্ছিল পা দৃঢ় হয়েছিল। তবে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর তিনি নিজ থেকেই ইসলাম গ্রহণের জন্য মক্কা থেকে মদিনার পথে রওনা দেন। পথিমধ্যে আমর ইবনুল আস রা. এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তখন তিনি জানতে পারেন, আমর রা.ও ইসলামগ্রহণের উদ্দেশ্যে সফর করছেন। এরপর তাঁরা উভয়ে একসঙ্গে মদিনায় রাসূল (ﷺ) এর খিদমতে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন।(১৬০)
গাজওয়ায়ে খায়বার বা খায়বার যু/দ্ধমদিনার ই*য়াহুদিদের মধ্যে বনু নাজির সম্প্রদায় যখন খায়বারে(১৬১) গিয়ে বসতি স্থাপন করে, তখন খায়বার ই*য়াহুদিদের কেন্দ্র ভূমিতে পরিণত হয়। সেখান থেকেই তারা পুরো আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকদের ইসলামের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করত।
তাদের শায়েস্তা করতে সপ্তম হিজরির মুহাররাম বা জামাদিউল উলায় রাসূল (ﷺ) ৪০০ পদাতিক এবং ২০০ অশ্বারোহী সেনার বাহিনী নিয়ে তাদের মোকাবিলার জন্য খায়বারে উপস্থিত হন। উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল লড়াই এবং ব্যাপক হতাহত হয়। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের বিজয় দান করেন এবং ই*য়াহুদিদের সব দুর্গ তখন মুসলিমদের হাতে চলে আসে।
খায়বারের এই যুদ্ধে আলি রা. বিশেষ রণনৈপুণ্য দেখান। তিনি একাই হাত দিয়ে খায়বারের দুর্গফটক উপড়ে ফেলে দেন; অথচ ফটকটি একসঙ্গে ৭০ জন লোকও নাড়াতে পারত না। কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে যে, আলি রা. যুদ্ধে এই ফটকটি হাতের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।(১৬২)
ফাদাক বিজয়খায়বার বিজয়ের পর রাসূল (ﷺ) ফাদাকের ই*য়াহুদিদের প্রতি ছোট একটি বাহিনী পাঠান। ই*য়াহুদিরা তখন মুসলিমদের সঙ্গে সন্ধি করে নেয়।
কাজা উমরা আদায়গত বছর (ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে) হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় যে উমরা আদায় করা সম্ভব হয়নি এবং কুরাইশ কা/ফিরদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল যে, ‘মুসলিমরা আগামী বছর উমরা আদায় করবে এবং তিন দিনের বেশি সময় মক্কায় থাকবেন না।’ এ বছর সেই প্রতিশ্রুতি ও চুক্তি অনুযায়ী রাসূল (ﷺ) তাঁর সাহাবিদের নিয়ে মক্কায় উপস্থিত হন এবং চুক্তির সব শর্ত মেনে উমরা পালন শেষে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন।
টীকা :
(১৫৭) ১৬ মাইল বা ২৫.৭৬ কিলোমিটারে এক মনজিল।
(১৫৮) সিরাতে মুগলতাই।
(১৫৯) পবিত্র কুরআনের সুরা ফাতহের ১০ নম্বর আয়াতে বায়আতে রিজওয়ানের আলোচনা রয়েছে।
(১৬০) আল-ইসাবাহ, হাফিজ ইবনু হাজার আসাকালানি রাহ.।
(১৬১) খায়বার মদিনা থেকে শাম দিকে তিন-চার মঞ্জিল দূরে অবস্থিত একটি বড় শহর। জুরকানি : ২/২১৭।
(১৬২) জুরকানি। (তবে বর্ণনাটি ইতিহাসের অনেক গ্রন্থে পাওয়া গেলেও কেউ কেউ এটি বিশুদ্ধ নয় বলে মত; দিয়েছেন।)
লেখা : বই – সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া ﷺ ; পৃষ্ঠা : ১০২-১০৭
লেখক : মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)
অনুবাদক : ইলিয়াস মশহুদ
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com