বাংলাদেশের রূপকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

Spread the love

ড. মিঠুন মোস্তাফিজ

১৭ মার্চ বাঙালি জাতির জীবনে এক অনন্য সাধারণ দিন, আনন্দের দিন। কেননা এদিন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, ‘জাতির পিতা’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস। এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান ও শেখ সাহেরা খাতুনের কোলজুড়ে বাঙালির বহু শতাব্দীর পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে শান্তি ও মুক্তির বার্তা নিয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান শেখ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বাল্যকাল কাটে টুঙ্গীপাড়ার গ্রামেই। টুঙ্গীপাড়া প্রথমে কোটালীপাড়া ও পরে গোপালগঞ্জ থানার অধীনে ছিল। মধুমতি আর বাঘিয়ার নদীর তীরে এবং হাওর-বাঁওড়ের মিলনে গড়ে ওঠা বাংলার অবারিত প্রাকৃতিক পরিবেশের আধার টুঙ্গীপাড়া গ্রামটি।

স্বাধীনতা লাভের পর টুঙ্গীপাড়াকে পৃথক থানা ঘোষণা করা হয়। টুঙ্গীপাড়া গ্রামেই শেখ মুজিবুর রহমান ধন-ধান্যে পুষ্পে ভরা শস্য-শ্যামলা রূপসী বাংলাকে দেখেছেন। তিনি আবহমান বাংলার আলো-বাতাসে লালিত ও বর্ধিত হয়েছেন। শৈশব থেকে তৎকালীন সমাজ জীবনে তিনি জমিদার, তালুকদার ও মহাজনদের অত্যাচার, শোষণ ও প্রজাপীড়ণ দেখেছেন। গ্রামের হিন্দু, মুসলমানদের সম্মিলিত সামাজিক আবহে তিনি দীক্ষা পান অসাম্প্রদায়িকতার। আর পড়শি দরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে সারাজীবন সাধারণ দুঃখী মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসায় সিক্ত করে  তোলে। বস্তুত: সমাজ ও পরিবেশ তাঁকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম করতে শিখিয়েছে শেকড় থেকে। চার বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সাহেরা খাতুনের তৃতীয় সন্তান। ৭ বছর বয়সে তিনি পার্শ্ববর্তী গিমাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

পরবর্তীতে তিনি মাদারীপুর ইসলামিয়া হাইস্কুল, গোপালগঞ্জ সরকারি পাইলট স্কুল ও পরে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে লেখাপড়া করেন। মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনার সময় তিনি চোখের দুরারোগ্য বেরি বেরি রোগে আক্রান্ত হলে কলকাতায় তার চোখের অপারেশন হয়। এই সময়ে কয়েক বছর তার পড়াশোনা বন্ধ থাকে। ১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষার্থে কলকাতায় গিয়ে বিখ্যাত ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন এবং বেকার হোস্টেলে আবাসন গ্রহণ করেন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিএ পাস করেন। শেখ মুজিবুর রহমান এই সময়ে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই সময়ে তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিমের মতো নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং এদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের একমাত্র চাওয়া-পাওয়া। যার জন্য জীবনে তিনি জেল-জুলুম-হুলিয়া কোনো কিছুই পরোয়া করেননি। শত যন্ত্রণা, দুঃখ-কষ্ট-বেদনাকে তিনি সহ্য করেছেন।

ফাঁসির মঞ্চও যার কাছে ছিল তুচ্ছ, তিনি হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ‘জাতির পিতা’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ’৪৮ থেকে ’৫২ এর মহান ভাষা আন্দোলন, ’৫৮ এর আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে ’৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬ দফা স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারারুদ্ধ হন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ষাটের দশকে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। ’৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভূত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতা তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। ’৭০-এর নির্বাচনে বাঙালি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার পক্ষে জানায় অকুণ্ঠ সমর্থন। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর  নেতৃত্বে বাঙালির এ নির্বাচনী বিজয়কে মেনে নেয়নি। বঙ্গবন্ধু স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রথমে স্বাধিকার আন্দোলনে এবং চুড়ান্ত পর্বে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ দিয়ে ’৭১-এর মার্চে শুরু করেন নজিরবিহীন এক অসহযোগ আন্দোলন।

৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’  সেদিন বঙ্গবন্ধু ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিক-নির্দেশনা দেন। মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় ছাত্রসমাজ বঙ্গবন্ধুকে ‘জাতির জনক’ আখ্যায়িত করে। ’৭১-এর ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ শুরু করলে বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাসভবন থেকে ওয়্যারলেসযোগে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বাংলার মাটি থেকে শেষ হানাদারটিকে নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ অব্যাহত রাখার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। স্বাধীনতা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুকে তার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বাধীনতা ঘোষণা ও বিদ্রোহের অপরাধে সেখানে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে শুরু হয় গোপন বিচার।

মৃত্যুভয় বা ক্ষমতার লোভ, কোনো কিছুই তাঁর দৃঢ় সংগ্রামী মনোভাবকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বীর বাঙালি ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে। ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে বিজয়ীর বেশে প্রত্যাবর্তন করেন স্বদেশভূমি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসের মহাপুরুষ শেখ মুজিবের জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না। বঙ্গবন্ধু ছিলেন মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কর্মী থেকে নেতা, নেতা থেকে জননেতা হয়েছেন। দেশনেতা থেকে হয়েছেন জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে একটি দলের নেতা থেকে হয়েছেন  দেশনায়ক।

ঘাতকের বুলেটে বুক ঝাঁঝরা হয়েছে কিন্তু জনগণের সঙ্গে বেঈমানি করেননি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই তিনি বাঙালি জাতির হৃদয়ের মণিকোঠায় আছেন অমর হয়ে; থাকবেন ততোদিন যতো দিন রবে বাংলাদেশ। শিশুদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম মমতার কারণেই তাঁর জন্মদিনকে শিশুদের জন্য উৎসর্গ করে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ পালন করে বাংলাদেশ। শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠন ও দেশপ্রেম জাগ্রত করা এবং আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে জাতির পিতার সংগ্রামী জীবনের প্রকৃত ইতিহাস জানার তাগিদ জোরালো হয় এদিন। একই সাথে কষ্টের সাথে স্মরিত হয় ইতিহাসের কালো এক অধ্যায়।

বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করে মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কাজ শেষে জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির পক্ষে জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণার অব্যবহিত পর ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট নিজ বাসভবনে ক্ষমতালোভী ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হন। তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় তারা প্রাণে বেঁচে যান। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিজ গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বাংলাদেশের রূপকার বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখক: চেয়ারম্যান, ফোকলোর স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ; ডিজিটাল মিডিয়া এডভাইজার, আইসিএসডি, অস্ট্রেলিয়া ও সদস্য, এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইউকে।

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD