—দীপক কুমার কর (কবিকঙ্কণ)
হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকলেই আমরা বলি—‘বন থেকে হাতি নেমে এসেছে।’ তারপর শুরু হয় আতঙ্ক, মশাল, পটকা, চিৎকার, ধাওয়া। কোথাও বিদ্যুতের ফাঁদ, কোথাও গুলি, কোথাও প্রতিশোধ। মানুষ মারা যায়, হাতিও মারা যায়। পরদিন সংবাদপত্রে খবর হয়—‘হাতির তাণ্ডব’।
কিন্তু সংবাদটির আরেকটি শিরোনাম কি হতে পারে না—‘হারিয়ে যাওয়া হাতির পথের সন্ধানে মানুষ’?
বাংলাদেশে মানুষ ও হাতির সংঘাত আজকের নয়। বন-সংক্রান্ত সরকারি নথিতে ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে হাতির সঙ্গে সংঘাতে ১৬২ জন মানুষ ও ২২টি হাতির মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছে। বন বিভাগের রেকর্ডভিত্তিক একটি প্রকাশিত সারণি অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৩৯৪ জন মানুষ ও ১১৯টি হাতির মৃত্যু ঘটেছে।
এগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একটি পরিবার, একটি জীবনের অবসান, একটি প্রাণীর বিলুপ্তির দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
প্রশ্ন হলো—আমরা এত বছর ধরে কাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছি?
হাতির সঙ্গে?
নাকি নিজেদের তৈরি একটি পরিবেশগত সংকটের সঙ্গে?
হাতিটি কোথা থেকে কোথায় ঢুকেছে?
মানুষের ক্ষতি বাস্তব। একজন কৃষকের এক বিঘা ধান নষ্ট হওয়া তার পরিবারের খাদ্য ও অর্থনীতিতে বড় আঘাত। হাতির আক্রমণে মানুষের মৃত্যু আরও ভয়াবহ। তাই মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব।
কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের একটি প্রশ্ন করতেই হবে—
হাতিটি সত্যিই কোথা থেকে কোথায় ঢুকেছে?
আজ যেখানে গ্রাম, সেখানে একসময় কী ছিল? যেখানে সড়ক, সেখানে কি হাতির চলাচলের পথ ছিল? যেখানে কৃষিজমি, সেখানে কি কোনো বন বা প্রাকৃতিক খাদ্যভূমি ছিল?
মানুষ জমির মালিকানা নির্ধারণ করে দলিল, খতিয়ান, দাগ ও সীমানা দিয়ে। প্রকৃতি তা করে না। প্রকৃতির মানচিত্র তৈরি হয় বন, পাহাড়, নদী, জলাভূমি, খাদ্যভূমি ও প্রাণীর চলাচলের পথ দিয়ে।
এই দুই মানচিত্রের সংঘর্ষ থেকেই মানব-হাতি সংঘাতের বড় অংশের জন্ম।
হাতি কোনো একটি বনের মধ্যে স্থির হয়ে থাকা প্রাণী নয়। খাদ্য, পানি, ঋতু ও প্রজননের প্রয়োজনেই তাকে বিস্তৃত ভূদৃশ্যের মধ্যে চলাচল করতে হয়। দুটি বনাঞ্চলের মধ্যবর্তী একটি সরু পথও তার অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য হতে পারে। এ পথই হাতি করিডর।
আমরা একটি বন রেখে দিই, কিন্তু তার সঙ্গে অন্য বনের সংযোগ কেটে দিই। মাঝখানে তৈরি করি রাস্তা, রেলপথ, বসতি, বাজার ও কৃষিজমি।
আমাদের চোখে এগুলো উন্নয়ন।
হাতির জীববিজ্ঞানের ভাষায়—পথরোধ।
বাংলাদেশের হাতি কমছে, অথচ সংঘাত বাড়ছে
বাংলাদেশে বন্য হাতির সংখ্যা খুবই কম। ২০১৩–২০১৬ সালের একটি ব্যাপক জরিপে দেশে প্রায় ২৬৮টি বন্য হাতির হিসাব পাওয়া যায়। পরবর্তী বিভিন্ন মূল্যায়নেও সংখ্যা কয়েকশর মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের বন্য হাতির ভবিষ্যৎ এমনিতেই অনিশ্চিত।
এই অবস্থায় একটি হাতির মৃত্যু শুধু একটি প্রাণীর মৃত্যু নয়। এটি একটি ক্ষুদ্র ও বিপন্ন বন্য হাতির জনসংখ্যা থেকে আরও একটি প্রাণ কমে যাওয়া।
কিন্তু হাতির সামনে শুধু মানুষের বসতি নয়—ভূদৃশ্যের পরিবর্তনও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন খণ্ডিত হয়েছে, প্রাকৃতিক খাদ্যভূমি কমেছে, চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির স্থাপনের পর বিষয়টি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। পাহাড়ি বনাঞ্চলের ওপর বিপুল চাপ সৃষ্টি হওয়ায় হাতির চলাচলপথ সংকুচিত হয়। তখন মানুষের নিরাপত্তা ও হাতির অস্তিত্ব—দুটিই রক্ষার জন্য একটি অভিনব ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কক্সবাজার দেখিয়েছে সংঘাত অনিবার্য নয়
শরণার্থী শিবির এলাকায় হাতির চলাচল মোকাবিলায় ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ গঠন করা হয়। স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং হাতি এলে মানুষকে সতর্ক করে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের মে পর্যন্ত শরণার্থী শিবির এলাকায় ২৬২টি হাতির অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটলেও কার্যকর সতর্কতা ও প্রতিরোধের কারণে সেখানে কোনো মানুষ বা হাতির প্রাণহানি ঘটেনি।
এই তথ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এটি দেখিয়ে দেয়—
মানুষ ও হাতির সংঘাত অনিবার্য নয়।
পরিকল্পনা থাকলে, স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করলে এবং হাতিকে শত্রু না বানালে প্রাণহানি কমানো সম্ভব।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান শুধু হাতি এলে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া নয়। প্রয়োজন হাতির প্রাকৃতিক চলাচলের পথ ফিরিয়ে দেওয়া।
এব্যাপারে ভারতের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য বিশেষ শিক্ষণীয়।
কেরালার ওয়ানাড় অঞ্চলের থিরুনেল্লি–কুড্রাকোট হাতি করিডরে মানুষের বসতি ও হাতির চলাচলের সংঘাত নিরসনে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ হাতিকে শুধু তাড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে মানুষকে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হয়েছে।
ভারতের অন্যত্র ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি কিনে হাতির করিডর সংরক্ষণের দৃষ্টান্তও রয়েছে।
মানুষ জমি কেনে বাড়ি করার জন্য।
মানুষ জমি কেনে শিল্পকারখানার জন্য।
মানুষ জমি কেনে ব্যবসার জন্য।
কিন্তু সেখানে জমি কেনা হয়েছে—
যাতে হাতি চলতে পারে।
এটি শুধু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ঘটনা নয়; এটি মানুষের মালিকানাবোধেরও এক গভীর পুনর্বিবেচনা।
পৃথিবীর সব জমি মানুষের জন্য নয়—এই সত্যটি মেনে নেওয়ার মধ্যেই সভ্যতার পরিণত বোধ নিহিত।
কৃষকের ক্ষতি উপেক্ষা করে হাতি বাঁচানো যাবে না
তবে হাতির কথা বলতে গিয়ে কৃষকের কান্না ভুলে গেলে চলবে না।
যে কৃষকের ধান এক রাতে হাতির পাল নষ্ট করে দেয়, তার কাছে ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ’ কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়। তার কাছে সেটি সংসারের ভাতের প্রশ্ন।
তাই হাতি বাঁচাতে হলে কৃষককেও বাঁচাতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা থাকতে হবে। হাতির গতিবিধি সম্পর্কে স্থানীয় মানুষকে নিয়মিত তথ্য দিতে হবে।
আর যেখানে মানুষের বসতি ও হাতির করিডর মুখোমুখি, সেখানে প্রয়োজনে মানুষের নিরাপদ পুনর্বাসন নিয়েও ভাবতে হবে।
কেরালার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এটি অসম্ভব কোনো ধারণা নয়।
বাংলাদেশকে হাতির ‘ইতিহাসের মানচিত্র’ তৈরি করতে হবে
আমরা সাধারণত দেখি—আজ কোথায় হাতি ঢুকেছে।
আমাদের দেখা উচিত—কোথা দিয়ে হাতি একশ বছর আগে চলত?
স্থানীয় প্রবীণ মানুষের স্মৃতি, পুরোনো বন-নথি, মানচিত্র, উপগ্রহচিত্র এবং আধুনিক প্রাণিবৈজ্ঞানিক গবেষণা একত্র করে বাংলাদেশের হাতির ঐতিহাসিক চলাচলপথ চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
একজন বৃদ্ধ হয়তো বলতে পারেন—
‘আমাদের ছোটবেলায় এই পথ দিয়ে হাতির পাল যেত।’
এই একটি বাক্যের মধ্যেই হয়তো হারিয়ে যাওয়া একটি করিডরের ইতিহাস লুকিয়ে আছে।
তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে—কোন পথ সংরক্ষণ করা হবে, কোথায় নতুন স্থাপনা বন্ধ হবে, কোথায় বন পুনরুদ্ধার হবে, কোথায় সড়ক ও রেলপথে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা করতে হবে।
হাতির হাতে কোনো খতিয়ান নেই
হাতি আদালতে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে না—
‘এই পথ দিয়ে আমার পূর্বপুরুষেরা চলত।’
তার কোনো দলিল নেই।
খতিয়ান নেই।
নামজারি নেই।
কিন্তু তার আছে পদচিহ্ন, স্মৃতি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা পথ।
মানুষের তৈরি সীমানা প্রকৃতির কাছে চিরস্থায়ী নয়।
তাই প্রশ্নটি হাতির জন্য সব জমি ছেড়ে দেওয়ার নয়।
প্রশ্নটি হলো—
আমরা কি পৃথিবীর প্রতিটি ইঞ্চি নিজেদের জন্য দখল করব?
নাকি কিছু বন বনের জন্য রাখব?
কিছু নদী নদীর জন্য?
কিছু জলাভূমি জলের জন্য?
আর কিছু পথ—
হাতির জন্য?
১৯৯৭ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ১৬২ জন মানুষ ও ২২টি হাতির মৃত্যু। ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৩৯৪ জন মানুষ ও ১১৯টি হাতির মৃত্যু।
এই সংখ্যাগুলো আমাদের বলে—এই যুদ্ধে কেউ জিতছে না।
মানুষ মারা যাচ্ছে।
হাতিও মারা যাচ্ছে।
আর হারিয়ে যাচ্ছে বন, করিডর ও সহাবস্থানের সম্ভাবনা।
হাতির পথ ফিরিয়ে দেওয়া তাই শুধু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কর্মসূচি নয়। এটি মানুষের জীবন রক্ষারও কর্মসূচি, কৃষকের ফসল রক্ষারও কর্মসূচি, বন রক্ষারও কর্মসূচি।
সবশেষে এটি আমাদের বিবেকের পরীক্ষা।
একদিন আমাদের সন্তানরা হয়তো প্রশ্ন করবে—
‘তোমরা যখন জানতে যে এই পথ দিয়ে হাতিরা যুগের পর যুগ চলত, তখন পথটি বন্ধ করলে কেন?’
আমরা কী উত্তর দেব?
বলব—
‘হাতি আমাদের এলাকায় ঢুকেছিল’?
নাকি ইতিহাস তখন আমাদের সংশোধন করে বলবে—
না।
তোমরাই ওদের পথের ওপর এসে দাঁড়িয়েছিলে।
তাই আসুন,আমরা যত দ্রুত সম্ভব হাতির করিডোর, আবাসস্থল, খাদ্য পানীসহ প্রকৃতিগত প্রাপ্তিগুলো তাদের জন্য নিশ্চিত করি এবং আমরাও আমাদের অধিকারের সীমারেখার মধ্যে থেকে সৃষ্টিশীল ধারায় পথ চলি।
—লেখক: সাংবাদিক।
সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ)।
আহ্বায়ক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিরাজগঞ্জ জেলা শাখা।
প্রধান তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের নথি; IUCN Bangladesh-এর Asian Elephant বিষয়ক জরিপ ও প্রতিবেদন; IUCN-এর কক্সবাজার Elephant Response Team সংক্রান্ত প্রতিবেদন; ভারতের Project Elephant ও হাতি করিডর সংরক্ষণসংক্রান্ত নথি।
Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com