মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ হাফিজাহুল্লাহ
আজকের ভূমিকম্প এক মুহূর্তে বুঝিয়ে দিল—মানুষ যত শক্তিশালী হোক, পৃথিবী যত ইস্পাত-লোহায় মোড়া হোক, আল্লাহর একটি সামান্য ইশারাই সব পরিকল্পনা বদলে দিতে পারে। এই দোলা শুধু মাটির কম্পন নয়; এটি হৃদয়ের তারে টান দেয়া এক অদৃশ্য বার্তা।
পৃথিবীর কম্পন আল্লাহর নিদর্শন
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
“পৃথিবীতে রয়েছে অনেক নিদর্শন, যারা দৃঢ় বিশ্বাসী তাদের জন্য।”
মানুষ যখন নিজের শক্তিকে সবকিছু মনে করে, আল্লাহ তখন তাঁর ক্ষমতার একটি ক্ষুদ্র ঝলক দেখিয়ে দেন। এই কম্পন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—এই পৃথিবী কার মালিক, কার ইচ্ছায় স্থির থাকে, আবার কার নির্দেশে মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুর্যোগকে অবহেলা করেননি
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কখনোই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদাসীন করেনি। হঠাৎ ঝড়, বজ্রপাত বা কম্পনের শব্দ শুনলেই তাঁর চেহারা পরিবর্তিত হয়ে যেত। তিনি মসজিদে যেতেন, নামাজে দাঁড়াতেন, তাওবায় লেগে থাকতেন, আর বলতেন—এ ধরনের ঘটনা মানুষের জন্য সতর্কবার্তা।
ভূমিকম্প তাই আতঙ্ক নয়; এটি আল্লাহর দরবার থেকে ফেরার ডাক।
এটি শাস্তি নাও হতে পারে, কিন্তু নিঃসন্দেহে শিক্ষা।
আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দেয়
একটি ভূমিকম্প মানুষের ভেতর জমে থাকা বহু ভুলকে সামনে এনে দেয়।
আমরা অনেক গুনাহ করি—
প্রতারণা করি, হিংসা করি, মানুষকে কষ্ট দিই, আল্লাহর হুকুম অমান্য করি।
জীবন চলতে থাকে, আমরা ভুলে যাই।
কিন্তু পৃথিবী যখন হঠাৎ দুলে ওঠে, তখন বোঝা যায়—সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
সেই মুহূর্তে প্রশ্ন জাগে—
আমি কি সত্যিই আল্লাহকে ভুলে গেছি?
আমি কি আমার আমলের হিসাবের জন্য প্রস্তুত?
ভূমিকম্প যেন হৃদয়ের ওপর লেখা একটি অদৃশ্য বাক্য—
“ফিরে এসো, সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।”
দুনিয়া অনিশ্চিত; আখিরাত নিশ্চিত
কিয়ামতের দিন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন—
“যেদিন পৃথিবী তার ভার বহন করে বের করে দেবে সবকিছু।”
আজকের এই ক্ষুদ্র কম্পনই যদি মানুষের বুক কাঁপিয়ে দেয়, তবে কিয়ামতের দিনের সেই মহাআঘাত কেমন হবে?
পৃথিবীর প্রতিটি দোলা মনে করিয়ে দেয়—
দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী।
আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে ভুলে যাই, কিন্তু কবর আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে।
সংকটে মানুষের মানবতা জেগে ওঠে
ভূমিকম্পের মুহূর্তে দেখা যায়—
মানুষ মানুষের দিকে ছুটে যায়, অপরিচিতরাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।
এটাই ইসলামের শিক্ষা—
মুমিনরা পরস্পরের দুঃখে এক দেহের মতো।
এই পরীক্ষার মুহূর্তে বুঝা যায়—
মানুষ যতই ভাগে ভাগ হোক, দুর্যোগ তাদের এক করে।
ভালোবাসা জাগে, সহানুভূতি বাড়ে, অন্তর নরম হয়।
ভূমিকম্পে মুসলমানের করণীয়
প্রথমে কালিমা তায়্যিবা ও লা-হাওলা পড়ে আল্লাহর দিকে মন ফেরাতে হবে।
দ্রুত নিরাপদ স্থানে যেতে হবে; কারণ ইসলাম জীবন রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
তাওবা করতে হবে, দুই রাকাত নফল নামাজ পড়তে হবে।
দান-সদকা করা, মানুষের খোঁজ নেওয়া, ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো—এগুলোই একজন সত্যিকারের মুমিনের পরিচয়।
দুর্যোগে দুআ কবুল হয়
মুসিবতগ্রস্ত মানুষের দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না—এ কথা হাদিসে এসেছে।
তাই এমন সময় আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ হোক—
দেশের জন্য, জাতির জন্য, পরিবারের জন্য, ঈমানের জন্য, গুনাহ থেকে মুক্তির জন্য।
শেষ কথা
আজকের ভূমিকম্প ছিল ক্ষণিকের দোলা।
কিন্তু তার শেখানো শিক্ষা দীর্ঘস্থায়ী।
এটি আমাদের দুর্বলতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, আর আল্লাহর অসীম শক্তির সামনে মাথা নত করায়।
পৃথিবী একটু দুললেই আমরা বুঝে যাই—
আল্লাহ আমাদের ডাকছেন,
ফিরে আসতে বলছেন,
পরিবর্তন করতে বলছেন,
তাওবার দরজা এখনো খোলা আছে বলছেন।
এই শিক্ষাই হোক আমাদের হৃদয়ের আলো,
এই স্মরণই হোক আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার কারণ।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com