করোনা ও বৈশ্বিক মহামারীর  ইতিহাস এবং  ঈদ  প্রাসঙ্গিক কথা

Spread the love

আবুল কালাম আজাদ

 ‘ ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ কাজি নজরুল ইসলামের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ইসলামি  গজলের মর্মার্থের এবারে বিশ্বের মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ত্যাগ ও সংযমের  এক মাস রোজার শেষ হলেও অদৃশ্য মরণঘাতি কভিড-১৯ (করোনাভাইরাস)-র প্রভাবে  রমজানের  সেই চিরাচরিত  ঈদুল ফিতরের খুশি হচ্ছে মলিন। করোনার প্রভাবে সাড়া বিশ্বের মুসলমানেরা  নতুন নতুন পোশাক পড়ে  জায়নামাজ কাঁধে-হাতে নিয়ে ‘ আল্লাহু আকবার, আল্লহু আকবার’ যিকির করে দল বেঁধে মাঠে যেতে পারবে না। একে অপরের সাথে পারবে না কোলাকুলি করতে, পারবে না দাওয়াত খাওয়াতে এবং পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়াতে এমনকি শ^শুর বাড়ি যেতেও। সবকিছুই করতে হবে ঘরে থেকে।

বিশ্ব বর্তমানে কভিড-১৯ আতংকে  অস্থির  হয়ে উঠেছে। এঁর  প্রতিরোধের  কোনো কুলকিনারাই পাচ্ছেন না  বাঘা বাঘা বিজ্ঞানী বিশেষজ্ঞ আর গবেষকেরা। এমনকি ডঐঙ  আশংকা করে বলছে , করোনা সম্পূর্ণ নিরমুল করা সম্ভব হবে না।  আমাদের জেনে রাখা দরকার,  এ সময়ের বৈশ্বিক কভিড-১৯ এ আতংকিত না হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই বুদ্ধিমানার কাজ। এরকম বৈশ্বি দুর্যোগ আগেও  এসেছ আবার আল্লাহর ইচ্ছায়  প্রতিরোধও  হয়েছে ।  যেমন- ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ সাল পর্যন্ত  এশিয়া,আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশে  যখন প্লেগ রোগে প্রায়  তিন ভাগের একভাগ মানুষ মারা যায়  তখন বলনা বিশ্ববিদ্যালয়, প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়, কেম্ব্রিজসহ ইউরোপের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলতে পারেনি  কেন এতো মানুষের মৃত্যু হলো? তখন জ্যোতিষী ধর্মযাযকরা   এমন বিশাল সংখ্যক  মানুষের দু’টি  কারন  প্রচার করেছিলেন। জ্যোতিষীরা এক্সদাবি করেছিলেন- আকাশের নক্ষত্র, গ্রহ ও চাঁদ-সুর্যের আকর্ষনে- বিকর্ষনে  মানুষের এই মৃত্যু ঘটেছিল। অন্যদিকে  ধর্মযাজকেরা এই মৃত্যুকে  মানুষের পাপ ও  সৃস্টিকর্তার  অভিশাপ হিসেবে বর্ননা করেছিলেন।করোনা ভাইরাস নিয়ে  আমরা আতংকিত। কিন্তু আতংকিত না হয়ে আমাদের  সাবধানতা  অবলম্বন ও সতর্ক থাকতে হবে। সতর্ক হওয়ার জন্য  আল্লাহপাক কোরানুল করিমে  ইরশাদ করেছেন- হে মুমিনরা ! তোমরা তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন করো। (সুরা নিসা, আয়াত ৭১)। সুতরাং এ আয়াতে আমাদের সবাইকে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা, আতংকে দিন না কাটিয়ে ভাইরাস থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহর উপড় তাওয়াক্কুল  করতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা কোরানুল করিমে আরাও বলেন- হে নবী , আপনি বলে দিন-আমাদের শুধু তা-ই আক্রান্ত করবে যা আল্লাহ আমাদের জন্য  লিখে রেখেছেন। তিনি আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহর উপরই যেন মুমিনরা  তাওয়াক্কুল  করে। (সুরা আত তাওবা, আয়াত-৫১)। আল্লাহ রাব্বুল মহা পবিত্র কোরানে   সুরা বাকারার ৩য় আয়াতে বলেছন- ‘ ইহা সেই কিতাব;  ইহাতে কোন সন্দেহ নাই, মুত্তাকিদের জন্য ইহা পথ প্রদর্শক”। ক) কস্টদায়ক বস্তু হইতে সাবধানতা অবলম্বন কর। খ) তাকওয়ার আভিধানিক অর্থ ভীতিপ্রদ বস্তু  হইতে আত্মরক্ষা করা। ইসলামী পরিভাষায় পাপাচার হইতে আত্মরক্ষা করার নাম তাকওয়া। (রাগিব)। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, একদা হযরত উমর (রাঃ) হযরত উবায় ইবন কা’ব (রাঃ) কে তাকওয়ার ব্যখ্যা দিতে  অনুরোধ করেছিলেন। তিনি উত্তরে বলেছিলেন-আপনি কি কখনো কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম  করিয়াছিলেন? হযরত উমর( রাঃ) বলিলেন’ হাঁ’। আপনি তখন কী করিয়াছেন? তিনি বলিলেন ,আমি  সাবধানতা অবলম্বন করিয়া দ্রুত গতিতে ওই পথ অতিক্রম করিয়াছিলাম।‘ হযরত উবায় ইবন কা’ব (রাঃ) বলিলেন-‘ ইহাই তাকওয়া’। (কুরতুবী)| প্রিয় বিশ্ববাসী, আমরা মহা ভীতিকর কভিড-১৯ এর সাবধানতা নিয়ে নানা বৈজ্ঞানিক  উপায়  খুঁজছি, যার উপায়  আল্লাহপাক পবিত্র কোরানেই  দিয়েছেন। আসুন কোরানকে আরো ভালভাবে  জানি এবং সাবধানতা অবলম্বন করে চলি।

অথচ  ইদুর ও মাছি তাদের সম্মুখেই  বিস্তার দেখা যেত। কিন্তু ইদুর ও মাছির কোন অনুজীব মানুষের শরীরে  সক্রমিত করতে পারে  এমন ধারনাই তাদের ছিলনা। ব্ল্যাক ডেথের পর ৫০০ বছর কেটে গিয়েছিল সংক্রমিত কোন মহামারির কারণ জানা ও প্রতিকার করা যায়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৮-১৯২০ সালের জানুয়ারী  মাস পর্যন্ত  বিশ্বব্যাপী স্প্যানিস ইনফ্লুয়েঞ্জা  মহামারীতে ডঐঙর তথ্যমতে ১০ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। ৫০ কোটিরও বেশী মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। তখনো এই মহামারীর  কারণ জানতে পারেনি। তবে এরপর থেকে  চিকিৎসা বিজ্ঞানের দ্রুত অনুজীব নির্ধারণের গবেষনা ও প্রতিষেধক উদ্ভাবনে মানুষের মেধার প্রয়োগ ঘটতে থাকে। করোনাভাইরাসের সার্স ও মার্স নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। ইবোলা ২০১৪-২০১৬ সালে  ছড়িয়েছিল।  ডেঙ্গু ভাইরাসে গেল বছরে শুধু বাঙ্গলা দেশেই নয়  অনেক দেশে ছড়িয়েছিল। সেটাও নিয়ন্ত্রণের ওষুধ  আবিস্কৃত হয়েছে। গত বছর ২০১৯ সালে ডিসেম্বরে চিনের উহানে  করোনাভাইরাস সংক্রমিত হলে  অনেকেই প্রথমে এর আচরনকে দূর থেকে  বুঝে উঠতে পারেনি। কেউ এটিকে প্রাণীবাহিত অনুজীব মনে করেছিল। প্রাণীবাহিত অনুজীব বিশেষস্থানে সীমাবদ্ধ থাকে। সে কারণে চীনের বাইরে  অনেকেই খুব একটা আতংকে ছিল না। কিন্তু এই প্রথম মানব ইতিহাসের কোন অনুজীব সম্পর্কে  দুই সপ্তাহের মধ্যেই  চিকিতসাবিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছিলেন  যে, এটা পশু বা প্রাণীবাহিত নয়, মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত অনুজীব যা একেবারেই বিশেষ বৈশিষ্টের অধিকারি। এর বিবর্তন ও পরিবর্তনও বিস্ময়কর।

বাংলাদেশে ৮ মার্চ ২০২০  সালে সর্বপ্রথম  করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর থকেই সংক্রমন শুরু হয়। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংক্রমনের মাত্রা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েই চলেছে। মানছে না কেউ স্বাস্থ্যবিধি। আইনকে তোয়াক্কাই করছে না। দিন দিন করোনায় আক্রান্ত আর মৃত্যুর মিছিলে যোগের হার বেড়েই চলেছে। মানুষের জীবন বাঁচাতে হলে সরকারকে ভিয়েতনামের মত কঠোর হতেই হবে। এর বিকল্প নেই। গত ২৩ এপ্রিল  বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিন এশিয়ার অর্থনীতিতে কভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায়  আঞ্চলিক সহযোগিতা জোড়দার করা বিষয়ক ভারচুয়াল সম্মেলনে বলেন- বিশ্বের সবাইকে  একযোগে এই সংকট  মোকাবেলা করতে হবে। এই  ভার্চুয়াল সম্মেলনের আয়োজন করেছিল বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম। তিনি আরো বলেছিলেন , বিশ্ব সম্ভবত  গত ১০০ বছরের মধ্যে  এত বড় সংকটের মুখোমুখি হয়নি। সুতরাং সবার এক সঙ্গে মোকাবেলা করা দরকার। তিনি এ কথাও বলেছেন- আমরা জানিনা এই মহামারি আর  কতদিন থাকবে। এটা এরই মধ্যে  অর্থনীতির  গুরুতর ক্ষতি করে ফেলেছে। এসময় তিনি ৫ টি প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাহল ঃ

১.মানবকল্যাণ বৈষম্য দুরিকরণ। দরিদ্র  জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দান এবং কভিড ১৯ এর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে  নতুন পরিকল্পনার কথা ভাবতে হবে। ২.আমাদের প্রয়োজন জি-৭, জি-২০ এবং  ই সি ডি-র  মত সংগঠনগুলো থেকে  দৃঢ় ও পরিকল্পিত বৈশ্বিক নেতৃত্ব।  জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন বহুপক্ষিয়  ব্যবস্থাকেও এগিয়ে আনা। ৩.এরই মধ্যে  বিশ্বব্যাপি কাজ ,ব্যবসা- বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন লক্ষ করা যাছে। কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে নতুন নীতি, নতুন ষ্ট্যান্ডার্ড ও রীতি-নীতি দেখা যাবে। সরবরাহে শৃংখলা থকা  বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড  দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে না। তাতে ক্ষতি হচ্ছে বাংলাদেশের মত  দেশগুলোর। সুতরাং এই দেশগুলোর টিকে থকার জন্য  বাস্তবমুখী সহায়তা  দরকার। ৪.প্রস্তাবে শেখ হাসিনা বলেছিলেন- অভিবাসী কর্মিরা বেকারত্বসহ অনেক কঠিন সময় পার করছেন। সুতরাং এই বোঝা এবং দায়িত্ব শেয়ার করার মত বৈশ্বিক কৌশল ও পরিকল্পনা নিতে হবে, ৫.এই মহামারির সময়ে  কার্যকরভাবে বেশকিছু  ডিজিটাল প্রযুক্তি  ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন: কৃত্রিম  বুদ্ধিমত্তা। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভাইরাস চিহ্নিত করা। ভবিষ্যতের প্রস্ততির জন্য বিভিন্ন সেক্টরে এরকম উদ্ভাবনীমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: সভাপতি,চলনবিল প্রেসক্লাব, গুরুদাসপুর, নাটোর। মোবাইল : ০১৭২৪ ০৮৪৯৭৩

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD