ইসলামে খেলাফত ও প্রচলিত গণতন্ত্র: কোথায় মিল, কোথায় মৌলিক সংঘর্ষ?

Spread the love
মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
লেখক, দাঈ ও গবেষক
রাষ্ট্র মানুষের সামাজিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি যেমন তার পরিবারে দায়িত্বশীল, তেমনি রাষ্ট্রও তার নাগরিকদের নিরাপত্তা, অধিকার, ন্যায়বিচার ও কল্যাণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব বহন করে। একটি রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে, শাসক কীভাবে নির্বাচিত হবে, আইন কীভাবে প্রণীত হবে এবং জনগণের সঙ্গে শাসকের সম্পর্ক কেমন হবে—এসব প্রশ্ন যুগে যুগে মানুষের চিন্তার অন্যতম প্রধান বিষয়।
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলোর একটি হলো গণতন্ত্র। অন্যদিকে ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তায় ‘খেলাফত’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—ইসলামী খেলাফত ও আধুনিক গণতন্ত্র কি একই ধরনের ব্যবস্থা? গণতন্ত্র কি ইসলামের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক? নাকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কিছু উপাদান ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আবেগ নয়, বরং কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের কর্মপদ্ধতি এবং ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক নীতিগুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইসলাম কি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক কাঠামো দিয়েছে?
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। ইসলাম রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কিছু মৌলিক ও অপরিবর্তনীয় নীতি দিয়েছে; কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের মতো প্রতিটি প্রশাসনিক কাঠামোর খুঁটিনাটি একটিমাত্র নির্দিষ্ট ছকে বেঁধে দেয়নি।
ইসলামের রাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি হলো—আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, ন্যায়বিচার, আমানত, শূরা, জবাবদিহিতা, জনকল্যাণ এবং জুলুম প্রতিরোধ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করতে।”
—সূরা আন-নিসা: ৫৮
এ আয়াতের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রয়েছে—আমানত ও ন্যায়বিচার।
ক্ষমতা কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোনো শাসকের ব্যক্তিগত মালিকানা নয়। ক্ষমতা একটি আমানত এবং সেই আমানতের ব্যাপারে শাসককে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
খেলাফত বলতে কী বোঝায়?
‘খেলাফত’ শব্দটি আরবি ‘খলিফা’ থেকে এসেছে। সাধারণ অর্থে এর মধ্যে প্রতিনিধিত্ব, দায়িত্ব গ্রহণ ও উত্তরাধিকারী হওয়ার ধারণা রয়েছে।
ইসলামী রাজনৈতিক পরিভাষায় খেলাফত বলতে মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বকে বোঝানো হয়।
তবে খেলাফতের মূল বৈশিষ্ট্য শুধু একজন শাসকের উপস্থিতি নয়। বরং শাসকের দায়িত্ব হলো আল্লাহর বিধান অনুসারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, জনগণের অধিকার রক্ষা করা এবং সমাজে শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“ইমাম বা শাসক একজন রক্ষক এবং সে তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।”
—সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
অর্থাৎ ইসলামী শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা যত বড়, জবাবদিহিতাও তত বড়।
প্রথম চার খলিফার যুগ থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ ইসলামী রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি।
আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের আলোচনা, মতামত এবং পরবর্তীতে বাইআতের বিষয়টি সামনে আসে।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর ক্ষেত্রে আবু বকর (রা.) তাঁর যোগ্যতা বিবেচনা করে তাঁকে মনোনীত করেন এবং মুসলিম সমাজের গ্রহণযোগ্যতা ও বাইআতের মাধ্যমে বিষয়টি সম্পন্ন হয়।
উসমান ইবন আফফান (রা.)-এর নির্বাচন হয় একটি নির্দিষ্ট শূরা পরিষদের মাধ্যমে। আর আলী ইবন আবি তালিব (রা.)-এর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এগুলো থেকে বোঝা যায়, নেতৃত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসলামের প্রাথমিক যুগে একটি মাত্র যান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি।
বরং যোগ্যতা, শূরা, গ্রহণযোগ্যতা, বাইআত ও জনস্বার্থ—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এখানেই আধুনিক যুগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে: ইসলামের মূলনীতি অক্ষুণ্ণ রেখে নেতৃত্ব নির্বাচন ও প্রশাসনিক কাঠামোর ক্ষেত্রে সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী উপযুক্ত পদ্ধতি গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
শূরা কি গণতন্ত্রের সমতুল্য?
না, শূরা ও আধুনিক গণতন্ত্রকে একেবারে অভিন্ন বলা যাবে না।
তবে উভয়ের মধ্যে কিছু কার্যকরী মিল রয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
“তাদের কার্যাবলি নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।”
—সূরা আশ-শূরা: ৩৮
রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ করতেন।
সুতরাং কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত গ্রহণ, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া এবং জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করা ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু আধুনিক গণতন্ত্রের কিছু দর্শনে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে আইনের চূড়ান্ত উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শূরার ক্ষেত্রে এমন ধারণা ইসলামের মৌলিক আকীদার অংশ নয়।
ইসলামে সার্বভৌমত্ব কার?
এটি দুই ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক পার্থক্যগুলোর একটি।
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলাই সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী।
আল্লাহ বলেন—
“হুকুম তো একমাত্র আল্লাহরই।”
—সূরা ইউসুফ: ৪০
ইসলামে মানুষ আইন প্রণয়ন করতে পারে—কিন্তু সেই আইন আল্লাহর সুস্পষ্ট বিধানের বিরোধী হতে পারে না।
মানুষ প্রশাসনিক আইন, ট্রাফিক আইন, শিক্ষা আইন, বাণিজ্যিক বিধিমালা, নগর পরিকল্পনা, সরকারি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। এগুলোর বড় অংশ মানুষের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও কল্যাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে।
কিন্তু আল্লাহ ও রাসুল ﷺ কোনো বিষয়ে স্পষ্ট বিধান দিয়েছেন—সেখানে মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সেই বিধানকে বাতিল করার ক্ষমতা রাখে না।
এখানেই ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা ও সেক্যুলার গণতান্ত্রিক সার্বভৌমত্বের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি সত্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি।
কিন্তু ইসলামে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিজেই সত্যের মাপকাঠি নয়।
আল্লাহ বলেন—
“তুমি যদি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের আনুগত্য করো, তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।”
—সূরা আল-আনআম: ১১৬
অর্থাৎ কোনো বিষয়ে মানুষের সংখ্যা বেশি হলেই সেটি সত্য হয়ে যায় না।
একটি নির্বাচনে ৬০ শতাংশ মানুষ কোনো ব্যক্তিকে পছন্দ করলেই তিনি নির্বাচিত হতে পারেন—এটি একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু একই ৬০ শতাংশ মানুষ যদি কোনো স্পষ্ট হারামকে হালাল ঘোষণা করতে চায়, তাহলে ইসলামী আকীদার দৃষ্টিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে তা হালাল হয়ে যাবে না।
এখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও শরিয়াহর বিধানের পার্থক্য বুঝতে হবে।
গণতন্ত্রের কোন বিষয়গুলো ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
গণতন্ত্র একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক ধারণা। এর প্রতিটি উপাদান একইভাবে মূল্যায়ন করা যায় না।
যেমন—
শাসক নির্বাচনের ব্যবস্থা:
যোগ্য ব্যক্তিকে জনগণের মতামতের মাধ্যমে নির্বাচন করা ইসলামের শূরা ও জনগ্রহণযোগ্যতার ধারণার সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
জবাবদিহিতা:
শাসককে প্রশ্ন করা, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো ইসলামী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা:
ইসলামে শাসক সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নন। তিনি আল্লাহর বিধান ও ন্যায়বিচারের অধীন।
জনগণের অধিকার:
জান, মাল, ইজ্জত ও ন্যায়বিচারের অধিকার ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সংরক্ষণ করেছে।
শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর:
যদি তা বিশৃঙ্খলা ও জুলুম প্রতিরোধ করে এবং শরিয়াহবিরোধী কোনো উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে এর প্রশাসনিক পদ্ধতিকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
অতএব, শুধু ‘গণতন্ত্র’ নাম থাকার কারণে এর প্রতিটি বিষয়কে হারাম বলা যেমন যথার্থ নয়, তেমনি গণতন্ত্রের প্রতিটি দর্শনকে ইসলামী বলে গ্রহণ করাও সঠিক নয়।
গণতন্ত্রের কোন ধারণা ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ দেখা দেয় যখন বলা হয়—
“জনগণই সর্বোচ্চ সার্বভৌম; জনগণ যা চাইবে তাই চূড়ান্ত আইন।”
একজন মুসলিম এই ধারণা গ্রহণ করতে পারেন না যে মানুষের ইচ্ছা আল্লাহর স্পষ্ট বিধানের ওপরে।
আল্লাহ বলেন—
“কোনো মুমিন পুরুষ বা মুমিন নারীর জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে সে বিষয়ে নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার রাখা সংগত নয়।”
—সূরা আল-আহযাব: ৩৬
অতএব, মুসলিমের কাছে নির্বাচন হতে পারে একটি পদ্ধতি; সংসদ হতে পারে আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিষ্ঠান; জনগণের মতামত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—কিন্তু আল্লাহর সুস্পষ্ট বিধানের বিরুদ্ধে মানুষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে না।
তাহলে সংসদীয় আইন কি সবই ইসলামের বিরুদ্ধে?
এমন সরলীকরণও ঠিক নয়।
আধুনিক রাষ্ট্রে এমন অসংখ্য বিষয় রয়েছে যেগুলোর নির্দিষ্ট বিধান কুরআন-হাদিসে নেই।
যেমন—
রাস্তার ট্রাফিক ব্যবস্থা, গাড়ির লাইসেন্স, সরকারি দপ্তরের প্রশাসনিক কাঠামো, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা ইত্যাদি।
এসব বিষয়ে রাষ্ট্র মানুষের প্রয়োজন, অভিজ্ঞতা ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন করতে পারে—যতক্ষণ তা ইসলামের মৌলিক বিধানের বিরোধী না হয়।
এখানে ফিকহের মাসলাহাহ বা জনকল্যাণ, সিয়াসাহ শরইয়্যাহ এবং প্রশাসনিক নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অর্থাৎ ইসলাম মানুষের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার দরজা বন্ধ করেনি; বরং ন্যায় ও শরিয়াহর সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রেখেছে।
শাসক নির্বাচন: ইসলাম কী বলে?
শাসক নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম যোগ্যতা, আমানতদারি ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেয়।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে।”
—সূরা আন-নিসা: ৫৮
রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব এমন ব্যক্তির হাতে দেওয়া উচিত, যিনি দায়িত্ব পালনে সক্ষম এবং বিশ্বস্ত।
রাসুলুল্লাহ ﷺ আবু যার (রা.)-কে বলেছিলেন—
“হে আবু যার! তুমি দুর্বল, আর এটি একটি আমানত।”
—সহিহ মুসলিম
এ হাদিস থেকে নেতৃত্বের দায়িত্বের ভয়াবহতা বোঝা যায়।
সুতরাং শুধু জনপ্রিয় হলেই কেউ রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য হয়ে যায় না। ইসলামী দৃষ্টিতে যোগ্যতা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা, প্রজ্ঞা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
স্বৈরতন্ত্র কি খেলাফত?
কখনোই শুধু নামের কারণে নয়।
কেউ নিজের রাষ্ট্রকে ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ ঘোষণা করলেই তার প্রতিটি কাজ ইসলামী হয়ে যায় না।
ইসলামী শাসনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো ন্যায়বিচার।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“ন্যায়পরায়ণরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে নূরের মিম্বরে থাকবে।”
—সহিহ মুসলিম
অন্যদিকে জুলুম ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
সুতরাং কোনো শাসক যদি মানুষের অধিকার হরণ করেন, দুর্নীতি করেন, বিরোধীদের ওপর জুলুম করেন, অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করেন কিংবা বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করেন—শুধু ‘খলিফা’ উপাধি ব্যবহার করলে তার জুলুম বৈধ হয়ে যায় না।
গণতন্ত্র মানেই কি ধর্মনিরপেক্ষতা?
এ দুটিকেও এক করে দেখা উচিত নয়।
গণতন্ত্র মূলত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি। ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক-দার্শনিক ধারণা।
কোনো রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হতে পারে কিন্তু তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো ভিন্ন হতে পারে।
তাই ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি শুনেই তার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি দর্শনকে একই প্যাকেজ হিসেবে বিচার করা বৈজ্ঞানিক বা ইসলামী পদ্ধতি নয়।
প্রতিটি নীতিকে আলাদাভাবে বিচার করতে হবে।
ইসলামী রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য কী?
ইসলামী রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য শুধু আইন প্রয়োগ করা নয়; বরং মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ সৃষ্টি করা।
রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা,
জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা,
অন্যায় প্রতিরোধ করা,
দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষা করা,
দুর্নীতি প্রতিহত করা,
শিক্ষা ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করা,
এবং মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।”
—সূরা আন-নাহল: ৯০
এই আয়াত রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক ভিত্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের মুসলিমদের করণীয় কী?
এই প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রজ্ঞা ও ভারসাম্য।
একদিকে ইসলামের আকীদা ও শরিয়াহর মৌলিক নীতিকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
অন্যদিকে রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে মতভেদকে কেন্দ্র করে মুসলিমদের মধ্যে অকারণ বিভেদ, তাকফির, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাও ইসলামের উদ্দেশ্য নয়।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজন—
ইলম, হিকমাহ, শূরা, ন্যায়বিচার, যোগ্য নেতৃত্ব, জবাবদিহিতা এবং জনকল্যাণ।
কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভালো দিক গ্রহণ এবং শরিয়াহবিরোধী দিক বর্জন—এটাই অধিক ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি।
শেষ কথা
ইসলামী খেলাফত ও আধুনিক গণতন্ত্রকে এক কথায় ‘একই’ বলা যেমন ভুল, তেমনি দুটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করাও ভুল যে তাদের মধ্যে কোনো মিলই নেই।
খেলাফতের ভিত্তি হলো আল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্য, ন্যায়বিচার, শূরা, আমানত, জবাবদিহিতা ও জনকল্যাণ।
আধুনিক গণতন্ত্রের মধ্যে রয়েছে নির্বাচন, প্রতিনিধিত্ব, জনগণের মতামত, জবাবদিহিতা ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মতো বিভিন্ন উপাদান। এসবের কিছু ইসলামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
কিন্তু যেখানে গণতন্ত্রের নামে বলা হয়—মানুষই চূড়ান্ত আইনদাতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা আল্লাহর বিধানের ঊর্ধ্বে—সেখানে ইসলামী আকীদার সঙ্গে মৌলিক সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়।
অতএব, একজন মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত—
“নাম নয়, নীতিকে বিচার করো; স্লোগান নয়, শরিয়াহর মানদণ্ডে ব্যবস্থা যাচাই করো।”
খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবি করা সহজ; কিন্তু খেলাফতের ন্যায়বিচার, আমানতদারি, শূরা, জবাবদিহিতা ও আল্লাহভীতি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
আবার গণতন্ত্রের নামে নির্বাচন আয়োজন করাও সহজ; কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে ন্যায়, সততা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মানুষের অধিকার এবং নৈতিকতার নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন।
অতএব, মুসলিম সমাজের প্রকৃত প্রয়োজন শুধু রাষ্ট্রব্যবস্থার নাম পরিবর্তন নয়; বরং এমন নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে আল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্য, মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
কারণ শেষ বিচারে ক্ষমতা মানুষের কাছে সম্মানের বিষয় হলেও আল্লাহর কাছে এটি একটি আমানত—আর প্রত্যেক আমানতের হিসাব একদিন অবশ্যই দিতে হবে।
লেখক দাঈ ও গবেষক 
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD