নতুন হিজরি বছর, আত্মসমালোচনা ও আমলের আহ্বান
লেখক: তরুণ আলোচক ও গবেষক মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ
সচিব (দাওয়াহ), কুরআন মজলিস বাংলাদেশ, বগুড়া জেলা
আলহামদুলিল্লাহ! বাংলাদেশের আকাশে পবিত্র মুহাররম মাসের চাঁদ দেখা গেছে। শুরু হয়েছে নতুন হিজরি বর্ষ ১৪৪৮ হিজরি। একটি নতুন বছর মানে শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদল নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও নতুন সংকল্পের এক অনন্য সুযোগ।
মুসলমানের জীবনে প্রতিটি দিনই হিসাব-নিকাশের দিন। তবুও সময়ের বিশেষ কিছু মুহূর্ত আমাদেরকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। হিজরি নববর্ষ সেই রকমই একটি উপলক্ষ, যা আমাদের অতীতের ভুল-ত্রুটি পর্যালোচনা করে ভবিষ্যৎকে আল্লাহর সন্তুষ্টিময় পথে পরিচালিত করার শিক্ষা দেয়।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন—
“প্রত্যেক মানুষ সকালে উপনীত হয়ে নিজেকে বিক্রি করে; কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে নিজেকে মুক্ত করে, আর কেউ নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।”
— (সহীহ মুসলিম)
মুহাররম: আল্লাহর সম্মানিত মাস
মুহাররম ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং আল্লাহ তাআলার ঘোষিত চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। মহান আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট মাসের সংখ্যা বারোটি। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।”
— (সূরা আত-তাওবা: ৩৬)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুহাররমকে “শাহরুল্লাহ” বা “আল্লাহর মাস” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন—
“রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।”
— (সহীহ মুসলিম)
এ মাসের বিশেষ মর্যাদা আমাদেরকে অধিক পরিমাণে নফল ইবাদত, তওবা, ইস্তিগফার এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।
আশুরার রোজা: এক বছরের গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ
মুহাররম মাসের ১০ তারিখকে বলা হয় ইয়াওমে আশুরা। ইসলামের ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন—
“আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।”
— (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)
তবে শুধু ১০ তারিখের রোজা না রেখে এর সাথে ৯ অথবা ১১ তারিখ মিলিয়ে দুইটি রোজা রাখা সুন্নত।
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন—
“তোমরা আশুরার রোজা রাখো এবং ইহুদিদের বিরোধিতা করো; আশুরার আগে বা পরে আরও একটি দিন রোজা রাখো।”
— (মুসনাদে আহমদ)
এ বছরের আশুরার রোজার তারিখ
➤ ৯ মুহাররম — ২৫ জুন (বৃহস্পতিবার)
➤ ১০ মুহাররম — ২৬ জুন (শুক্রবার)
➤ ১১ মুহাররম — ২৭ জুন (শনিবার)
অতএব, ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা রাখা উত্তম।
আইয়ামে বীজের রোজা
প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখা সুন্নত, যা “আইয়ামে বীজ” নামে পরিচিত।
এ মাসে আইয়ামে বীজের রোজার তারিখ:
➤ ১৩ মুহাররম — ২৯ জুন (সোমবার)
➤ ১৪ মুহাররম — ৩০ জুন (মঙ্গলবার)
➤ ১৫ মুহাররম — ১ জুলাই (বুধবার)
আশুরার ঐতিহাসিক তাৎপর্য
আশুরার দিন আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা (আ.) ও বনি ইসরাঈলকে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। সমুদ্রকে দ্বিখণ্ডিত করে তাদের জন্য নিরাপদ পথ সৃষ্টি করেছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ ঘটনার স্মরণে আশুরার রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও তা পালনের নির্দেশ দিতেন।
— (সহীহ বুখারি)
মুহাররমকে ঘিরে প্রচলিত কুসংস্কার
দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে মুহাররমকে কেন্দ্র করে নানা ভিত্তিহীন বিশ্বাস ও কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। যেমন—
এ মাসকে অশুভ মনে করা।
বিয়ে-শাদি বন্ধ রাখা।
নতুন ব্যবসা বা কাজ শুরু না করা।
তাজিয়া মিছিল বের করা।
বুক চাপড়ানো বা শরীর রক্তাক্ত করা।
শোকের নামে বিভিন্ন অনৈসলামিক অনুষ্ঠান পালন করা।
এসবের কোনো ভিত্তি কুরআন ও সহীহ সুন্নাহতে নেই।
কারবালার মর্মান্তিক ঘটনায় হযরত হুসাইন (রাঃ)-এর শাহাদাত নিঃসন্দেহে মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পোষণ করি। কিন্তু শোক প্রকাশের নামে শরীরকে আঘাত করা, মাতম করা বা ইসলামের সীমা অতিক্রম করা বৈধ নয়।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন—
“সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলি যুগের মতো বিলাপ করে।”
— (সহীহ বুখারি, সহীহ মুসলিম)
মুহাররম মাসে করণীয়
তওবা ও ইস্তিগফার করা।
আশুরার রোজা পালন করা।
আইয়ামে বীজের রোজা রাখা।
কুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি করা।
নফল নামাজ ও জিকিরে মনোযোগী হওয়া।
আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করা।
দান-সদকা ও মানবসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া।
পরিবার ও সমাজে ইসলামের শিক্ষা প্রচার করা।মুহাররম মাসে বর্জনীয়
মুহাররমকে অশুভ মনে করা।
বিয়ে-শাদি বা বৈধ কাজ থেকে বিরত থাকা।
তাজিয়া, মাতম ও শোক মিছিল করা।
শরীরকে আঘাত বা রক্তাক্ত করা।
ভিত্তিহীন কাহিনি ও জাল বর্ণনা প্রচার করা।
গুনাহ ও পাপাচারে লিপ্ত হওয়া।
বিদআত ও কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়া।উপসংহার
নতুন হিজরি বছরের সূচনায় আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের জীবনের হিসাব নেওয়া। গত বছরের ভুল-ত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে আল্লাহর পথে নতুন উদ্যমে চলার অঙ্গীকার করা। মুহাররম কোনো শোক, কুসংস্কার বা বিভ্রান্তির মাস নয়; বরং এটি তওবা, ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহামূল্যবান সময়।
আসুন, আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুহাররম মাসকে যথাযথ মর্যাদায় পালন করি এবং আশুরার রোজাসহ অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহীহ আকীদা, বিশুদ্ধ আমল এবং সুন্নাহভিত্তিক জীবন গঠনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহতরুণ আলোচক, গবেষক ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ
সচিব (দাওয়াহ), কুরআন মজলিস বাংলাদেশ, বগুড়া জেলা।
One attachment • Scann
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com