মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ হাফিযাহুল্লাহ
মানবজীবনের কিছু সময় আছে, যা কেবল ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয়—বরং আত্মার জাগরণ, ঈমানের নবায়ন এবং রবের দিকে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য আহ্বান। পবিত্র যিলহজ্ব তেমনই এক মহিমান্বিত মাস। এ মাসের প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত, প্রতিটি আমল যেন মুমিনের হৃদয়ে নতুন আলো ছড়িয়ে দেয়।
এ মাসে রয়েছে ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত হজ্ব, রয়েছে ত্যাগের প্রতীক কুরবানী, রয়েছে ইয়াওমে আরাফার অগণিত রহমত, রয়েছে তাকবীর, তাহলীল ও ইবাদতের সুবর্ণ সুযোগ। তাই যিলহজ্ব কেবল একটি মাস নয়; এটি হলো আত্মশুদ্ধি, তাওহীদ, ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক জীবন্ত পাঠশালা।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
“আল্লাহর নিকট মাসসমূহের সংখ্যা বারোটি। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত।”
— সূরা তাওবা : ৩৬
এই চার সম্মানিত মাসের অন্যতম হলো যিলহজ্ব। আর এ মাসের প্রথম দশক সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা শপথ করে বলেছেন—
“শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতের।”
— সূরা ফাজর : ১-২
মুফাসসিরগণের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এখানে ‘দশ রাত’ বলতে যিলহজ্বের প্রথম দশক উদ্দেশ্য। এ থেকেই বোঝা যায়, আল্লাহ তাআলার নিকট এ সময়ের মর্যাদা কত বিশাল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
“যিলহজ্বের প্রথম দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো দিনের আমল নেই।”
— সহীহ বুখারী
কী অপূর্ব সৌভাগ্য! এমন কিছু দিন, যার প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর দরবারে এত প্রিয়—সেই দিনগুলো আমরা আবারও পেয়েছি। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারব?
যিলহজ্বের প্রথম দশক : নেক আমলের বসন্তকাল
যিলহজ্বের প্রথম দশ দিন মূলত মুমিনের জন্য ইবাদতের মৌসুম। এ সময় বেশি বেশি যিকির, তাসবীহ, তিলাওয়াত, নফল নামায, দান-সদকা ও রোযার প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
“তোমরা এ দিনগুলোতে বেশি বেশি তাহলীল, তাকবীর ও তাহমীদ পাঠ করো।”
— মুসনাদে আহমাদ
তাই আমাদের যবান ভিজে থাকুক—
সুবহানাল্লাহ
আলহামদুলিল্লাহ
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ
আল্লাহু আকবার
এই যিকিরগুলোতে।
এ সময় রোযা রাখারও বিশেষ ফযীলত রয়েছে। বিশেষত ৯ যিলহজ্ব তথা ইয়াওমে আরাফার রোযা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
“আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, আরাফার দিনের রোযা পূর্বের এক বছর এবং পরের এক বছরের গুনাহ মাফের কারণ হবে।”
— সহীহ মুসলিম
কত বড় সৌভাগ্যের ঘোষণা! একটি দিনের রোযা, আর দুই বছরের গুনাহ মাফ!
ইয়াওমে আরাফা : ক্ষমা ও রহমতের দিন
আরাফার দিন মূলত আল্লাহর রহমতের সাগরে ডুব দেওয়ার দিন। এ দিন আল্লাহ অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
“আরাফার দিনের মতো এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ এত বেশি বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।”
— সহীহ মুসলিম
এ দিন দুআ কবুলের দিন। কান্নার দিন। ক্ষমা চাওয়ার দিন। আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার দিন।
যারা হজ্বে আছেন তারা আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়ে কাঁদেন। আর যারা দূর দেশে আছি, তারাও যেন দুআ, ইস্তিগফার ও যিকিরে নিজেদের ব্যস্ত রাখি। কারণ রহমতের দরজা সবার জন্যই খোলা।
হজ্ব : ভালোবাসার সর্বোচ্চ সফর
হজ্ব কেবল একটি সফর নয়; এটি আত্মার সফর। দুনিয়ার চাকচিক্য ছেড়ে বান্দা যখন ইহরামের শুভ্র কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে বলে—
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক”
তখন যেন সে পৃথিবীর সব পরিচয় ভুলে গিয়ে কেবল রবের দরবারে নিজেকে সমর্পণ করে।
হজ্ব মানুষকে শেখায়—
ধৈর্য
ত্যাগ
বিনয়
ভ্রাতৃত্ব
তাকওয়া
আত্মসমর্পণ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্ব করল এবং গুনাহে লিপ্ত হলো না, সে নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।”
— সহীহ বুখারী
কত বিশাল পুরস্কার! একটি কবুল হজ্বের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।
কুরবানী : ত্যাগের জীবন্ত প্রতীক
যিলহজ্বের সবচেয়ে মহিমান্বিত দিবস হলো ১০ যিলহজ্ব—ইয়াওমুন নাহর বা কুরবানীর দিন। এ দিন মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কুরবানী করে থাকে।
কিন্তু কুরবানী কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়। এটি হৃদয়ের পরীক্ষা। নিয়তের পরীক্ষা। ভালোবাসার পরীক্ষা।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আল্লাহর কাছে তাদের গোশত বা রক্ত পৌঁছে না; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
— সূরা হজ্ব : ৩৭
অর্থাৎ কুরবানীর মূল বিষয় হলো—আল্লাহর জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার মানসিকতা।
ইবরাহীম ও ইসমাঈলের অনন্য শিক্ষা
কুরবানীর ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালামের সেই অবিস্মরণীয় ঘটনার দিকে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পাওয়া সন্তান। বৃদ্ধ বয়সের ভালোবাসা। অথচ আল্লাহর নির্দেশ এলো—সেই সন্তানকেই কুরবানী করতে হবে।
কী কঠিন পরীক্ষা!
কিন্তু ইবরাহীম আ. দ্বিধা করলেন না। আর ইসমাঈল আ.-ও বললেন—
“হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।”
এ যেন তাওহীদ, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ উদাহরণ।
অবশেষে আল্লাহ তাআলা তাঁদের এই ত্যাগ কবুল করলেন এবং ইসমাঈল আ.-এর পরিবর্তে একটি দুম্বা পাঠালেন।
সেই স্মৃতিই আজও জীবন্ত রয়েছে কুরবানীর মাধ্যমে।
কুরবানীর প্রকৃত শিক্ষা
কুরবানী আমাদের শেখায়—
১. তাওহীদ
ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য।
২. আত্মসমর্পণ
আল্লাহর হুকুমের সামনে নিজের ইচ্ছাকে বিলীন করা।
৩. তাকওয়া
লোক দেখানো নয়; একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা।
৪. ত্যাগ
আল্লাহর জন্য প্রিয় জিনিস উৎসর্গ করতে শেখা।
৫. বিনয়
সবকিছু আল্লাহর দান—এ অনুভূতি হৃদয়ে ধারণ করা।
আজ আমাদের করণীয়
আজ কুরবানী অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, প্রদর্শনী ও সামাজিক মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ কুরবানীর আসল শিক্ষা হলো বিনয়, তাকওয়া ও আত্মত্যাগ।
আমরা কি সত্যিই আল্লাহর জন্য কুরবানী করছি?
আমাদের অন্তরে কি ইবরাহীমী আত্মসমর্পণ আছে?
আমরা কি ইসমাঈলের মতো আল্লাহর হুকুমের সামনে মাথা নত করতে প্রস্তুত?
যিলহজ্ব আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। নতুন করে ফিরে আসতে শেখায়। নতুন করে আল্লাহর পথে দাঁড়াতে শেখায়।
আসুন—
এই যিলহজ্বে আমরা কেবল পশু কুরবানী না করি; বরং কুরবানী করি—
অহংকার
হিংসা
লোভ
গুনাহ
আত্মপ্রবঞ্চনা
দুনিয়ামুখিতা
আর নিজেদেরকে আল্লাহর জন্য সমর্পণ করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যিলহজ্বের মর্যাদা অনুধাবন করার, হজ্ব ও কুরবানীর প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করার এবং ইখলাসের সাথে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক তরুণ আলোচক ও গবেষক বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব পীরজাদা মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ হাফিজা হুল্লাহ
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com