জাহিদ হাসান :
চলনবিল এলাকার সগুনা অঞ্চলে গড়ে ওঠা একাধিক লেয়ার মুরগির খামারের বর্জ্যে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খামারগুলোর মল-মূত্র ও আবর্জনা দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিতভাবে খোলা স্থানে ফেলে রাখার কারণে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন খামারগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ মুরগির বর্জ্য বের হলেও সেগুলো অপসারণ বা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রক্রিয়াজাত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে খামারের পাশেই দিনের পর দিন বর্জ্য জমিয়ে রাখা হচ্ছে। ফলে আশপাশের গ্রামগুলোতে অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে গরম ও বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেক পরিবার দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও স্বস্তি পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দুর্গন্ধের তীব্রতা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এতে স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়দের অনেকেই নিয়মিত কাশি, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া ও অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় ভুগছেন বলে জানান।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মুরগির বর্জ্য থেকে নির্গত অ্যামোনিয়া গ্যাস, ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও বিভিন্ন জীবাণু বাতাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন এ ধরনের দূষণের মধ্যে বসবাস করলে হাঁপানি, ফুসফুসের জটিলতা, ত্বকের রোগ, চোখে প্রদাহ, ডায়রিয়া এবং শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে মত চিকিৎসকদের।
শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, খামারের বর্জ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষিও। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় খামারের মল-মূত্র পাশের খাল, জলাশয় ও কৃষিজমিতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এতে পানি দূষিত হয়ে মাছ মারা যাচ্ছে এবং কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, দূষিত পানি জমিতে প্রবেশ করায় ভবিষ্যতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
এছাড়াও এলাকাবাসীর অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী খামারের বর্জ্য মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে জলাশয়ের পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের অস্বাস্থ্যকর ও অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তারা দ্রুত খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি চালুর দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে খামার মালিকদের দাবি, দুর্গন্ধ ও বর্জ্য কমাতে তারা বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, বাস্তবে এখনো কার্যকর কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি।
জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখনই কঠোরভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত না করা হলে ভবিষ্যতে এ সমস্যা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com