লেখক: মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ হাফিজাহুল্লাহ
পরকীয়া—শব্দটি উচ্চারণ করলেই যে অন্ধকার, যে দহন, যে ভাঙন সামনে ভেসে ওঠে, তা শুধু ব্যক্তিগত নয়; তা পরিবারকে গ্রাস করে, সমাজকে ছিন্নভিন্ন করে এবং মানুষের ঈমানের ভিত পর্যন্ত নড়বড়ে করে দেয়। আজকের আধুনিক প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অবাধ সম্পর্ক—সব মিলে ধীরে ধীরে এই নৈতিক বিষকে স্বাভাবিক করার এক ভয়াবহ প্রচেষ্টা চলছে। অথচ ইসলামে এটি শুধু একটি গুনাহ নয়—এটি এমন একটি অপরাধ, যার ধ্বংস প্রথমে আঘাত করে নিজের আত্মায়, তারপর পরিবারে, শেষে গোটা সমাজে।
আজ আমি একজন পুরুষ হিসেবে নিজের দিক থেকেই বলছি—পুরুষের জন্য পরকীয়ার ফাঁদ সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ পুরুষের দুর্বলতা, আবেগের অস্থিরতা, সাময়িক উত্তেজনা—এগুলোকে শয়তান খুব সহজেই শিকারে পরিণত করে। চোখের একটি ভুল দৃষ্টি, একটি ভুল আলাপ, একটি সীমালঙ্ঘন… আর তাতেই শুরু হয় ধ্বংসের সিঁড়ি বেয়ে নামার যাত্রা।
পরকীয়া শুধু পাপ নয়—একটি বড় বিশ্বাসঘাতকতা
পরকীয়া মানে শুধু স্বামী বা স্ত্রীর অধিকার লঙ্ঘন নয়; এটি আল্লাহর আমানত ভঙ্গ। পরিবার, দাম্পত্য, দায়িত্ব—এসবকে পদদলিত করা। ইসলাম পরকীয়াকে (zina) চিহ্নিত করেছে সবচেয়ে জঘন্য বড় গুনাহ হিসেবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না। এটি অশ্লীল কাজ এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট পথ।”
—সূরা ইসরা ১৭:৩২
সংসার নামক পবিত্র প্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে সামান্য লোভে, সামান্য উত্তেজনায়, সামান্য আবেগে নিজের স্ত্রী বা স্বামীর প্রতি যে অবিচার করা হয়—তা মানবতার কাছেও লজ্জার এবং আল্লাহর কাছে ঘৃণিত।
পরকীয়ার প্রথম শিকার—নিজের আত্মা
অনেকে মনে করেন পরকীয়া শুধু গোপন সম্পর্ক; বাহিরে কেউ জানে না। কিন্তু মানুষ না জানলেও আত্মা জানে, বিবেক জানে, আল্লাহ তো জানেনই।
হাদিসে বলা হয়েছে—
ব্যভিচার করলে ঈমান হৃদয় থেকে বেরিয়ে যায়। যখন সে তা থেকে ফিরে আসে তখন আবার ফিরে আসে।”
—সহিহ বুখারি (৬৮০৯)
অর্থাৎ পরকীয়া মানুষকে ঈমানহীন, শক্তিহীন, বিবেকহীন করে দেয়।
পরকীয়ায় পতনের ধাপগুলো খুব সূক্ষ্ম
পুরুষ হিসেবে আমাদের সবচেয়ে ভয় পাওয়ার জায়গা হলো—পরকীয়া কখনো হঠাৎ শুরু হয় না। শুরু হয়—
নিষ্পাপ মনে মনে কথাবার্তা
মুঠোফোনে বাড়তি আলাপ
কারো প্রশংসায় গলে যাওয়া
মন খারাপের দিনে কারো সান্ত্বনায় দুর্বল হয়ে পড়া
চোখের একটা ভুল দৃষ্টি, একটি লাইক, একটি স্মাইল
এগুলোই ধীরে ধীরে বিবাহিত জীবনের বাইরে এক অন্ধকারের টানেল তৈরি করে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করে বলেছেন—
“চোখের ব্যভিচার হলো দৃষ্টি; জিহ্বার ব্যভিচার হলো কথা।”
—সহিহ মুসলিম (২৬৭৬)
অর্থাৎ পরকীয়ার আগুন বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই মানুষের মনের ভেতর জ্বলে ওঠে।
পরকীয়া পরিবারকে যেভাবে ধ্বংস করে
পরকীয়ার কারণে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শুকায় না।
স্ত্রী বা স্বামীর প্রতি আস্থার মৃত্যু
সন্তানের সামনে পিতা-মাতার মর্যাদা ভেঙে যাওয়া
ঘরে ঘরে কলহ, সন্দেহ, মানসিক বিষাদ
দাম্পত্যের পবিত্রতা ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া
অপরাধ গোপন রাখলেও, অস্থিরতা, আগ্রাসন, দূরত্ব—সবকিছু পরিবারের সবাই অনুভব করে।
আল্লাহ বলেন—
“শয়তান বিবাদের আগুন জ্বালায়।”
—সূরা ইসরা ১৭:৫৩
পরকীয়া সেই বিবাদের সূচনা, যার শেষ থাকে না।
সমাজের ওপর পরকীয়ার দীর্ঘস্থায়ী আঘাত
যে সমাজে দাম্পত্য ভেঙে যায়, সেখানে—
সন্তান হয় অবহেলার শিকার
নারী-পুরুষ উভয়েই হতাশায় ভোগে
সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে চুরমার হয়
নৈতিকতা ধ্বংস হয়
পরবর্তী প্রজন্ম বিকৃত সংস্কৃতির জন্ম নেয়
ইসলাম তাই ব্যভিচারের দরজা বন্ধ করতে যত নির্দেশ দিয়েছে—তা সবই মানুষের কল্যাণের জন্য।
পরকীয়া থেকে বাঁচার বাস্তব উপায়
১. দৃষ্টি সংযম
কুরআনের নির্দেশ—
“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টি সংযত রাখে।”
—সূরা নূর ২৪:৩০
২. পরনিন্দা, ব্যক্তিগত আলাপ, গোপন মেসেজ এড়িয়ে চলা
এটাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
৩. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যের ভালোবাসা ও যোগাযোগ শক্ত করা
ফাঁকা মনই শয়তানের বাড়ি।
৪. একাকী থাকলে কুমন্ত্রণা বাড়ে—পরিবারকে সময় দেওয়া
পরিবারে যত সময়, বাইরে তত কম ঝুঁকি।
৫. হালাল পথ—দাম্পত্যকে সুন্দর, পরিপূর্ণ ও সুখী রাখা
পুরুষের জন্য বিশেষ শিক্ষা
পুরুষের আবেগ, আকর্ষণ, দুর্বলতা—এগুলো শয়তান সবচেয়ে সহজে ব্যবহার করে।
একজন পুরুষের জন্য সবচেয়ে বড় সম্মান হলো—
নিজের স্ত্রীকে সম্মান করা
নিজের দাম্পত্যকে রক্ষা করা
নিজের চোখ, মন ও দেহকে পবিত্র রাখা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম।”
—তিরমিজি (৩৮৯৫)
পরকীয়া একজন পুরুষকে সেরা থেকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট করে দেয়।
শেষ কথা: পরকীয়া শুধু পাপ নয়—এটি ধ্বংসের নাম
পরকীয়া শুরুতে মিষ্টি মনে হলেও, পরে তা আগুন হয়ে দগ্ধ করে—
হৃদয়কে, সংসারকে, ভবিষ্যৎকে এবং ঈমানকে।
এক মুহূর্তের ভুল পুরো জীবনের শান্তিকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে।
তাই পরকীয়ার দরজা বন্ধ করাই ঈমানের সুরক্ষা, পরিবারের সুরক্ষা এবং সমাজের সুরক্ষা।
আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন।
পরিবার, দাম্পত্য এবং ঈমানকে শয়তানের ফাঁদ থেকে রক্ষা করুন।
আমিন।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com