শায়লা পারভীনঃ সিরাজগঞ্জের তাড়াশের মাধাইনগর এলাকার কৃষক জয়নুল আবেদিন। তিনি এক বিঘা জমিতে রোপা আমনের বীজতলা তৈরি করেছিলেন। সে বীজতলার চারা বীজ দিয়ে তার ১৮ বিঘা জমিতে চারা ধান লাগান। এরপরও উদ্বৃত্ত চারা বীজ প্রায় ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে লাভবান হন।
এভাবে চলনবিলের উত্তরের তাড়াশসহ আশপাশের এলাকার রোপা আমনের উদ্বৃত্ত চারা বীজ ভালো দামে হাতবদল হয়ে চলে যাচ্ছে বিলপাড়ের দক্ষিণ এলাকায়। এতে একদিকে চারা বীজ বিক্রি করে যেমন উত্তর এলাকার কৃষকরা কিছু বাড়তি আয় করছেন, তেমনি বীজ সংকটে থাকা চলনবিলের অন্য অংশের কৃষক বীজ পেয়ে পতিত জমিতে রোপা আমনের আবাদ নেমে পড়েছেন। ফলে চলনবিল অঞ্চলে এ বছর রোপা আমনের আবাদি জমির পরিমাণও বাড়ছে। তাই এ বছর অতিরিক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।
এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও চারা বীজের সংকট থাকার পরও পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় চলনবিল এলাকায় রোপা আমন ধানের আবাদ বাড়ছে। আর চলনবিলের অন্য এলাকায় চারা বীজের সংকটে থাকা অনেক কৃষক তাড়াশ এলাকা থেকে তা সংগ্রহ করছেন। এতে উভয় এলাকার কৃষক লাভবান হচ্ছেন।
মূলত নিকট অতীতে চলনবিল এলাকার ৯টি উপজেলার বিভিন্ন অংশে বর্ষা মৌসুমে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার মাস পানি থাকত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে বিলে পানি থাকার আয়ুকাল কমে এসেছে। এ বছর শেষ আষাঢ়ে চলনবিলের বিভিন্ন অংশে মাঝারি মানের বন্যা হয় যা দেড় মাসের মতো ছিল। আর ভাদ্র মাসের শুরুর প্রায় এক সপ্তাহ আগেই চলনবিলের উল্লাপাড়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, গুরুদাসপুর এলাকার বিভিন্ন অংশ থেকে পানি একেবারে নেমে গেছে। এ কারণে এসব এলাকার শত শত একর পতিত জমি রোপা আমন ধান লাগানোর উপযোগী হয়ে উঠেছে। আর এই সুযোগ এলাকার কৃষকরা হাতছাড়া না করে রোপা আমনের আবাদে মনোনিবেশ করছেন।
চলনবিলের ছাইকোলা এলাকার কৃষক আবদুর রাজ্জাক জানান, রোপা আমন ধান লাগানোর উপযোগী এসব জমির কৃষকদের অনেকেরই চারা বীজ নেই। তাই তারা উত্তরের তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও শেরপুর এলাকা থেকে আবাদের পর উদ্বৃত্ত চারা বীজ সংগ্রহে নেমেছেন। তবে চারা কিনতে হচ্ছে বেশ চড়া দামে।
তাড়াশ কৃষি অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৯২ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যা গত বছরের রোপা আমন ধান চাষের মৌসুমের চেয়ে প্রায় ৬৫০ হেক্টর বেশি। পাশাপাশি এই এলাকায় কৃষক প্রায় ৮৭০ হেক্টর জমিতে ব্রি ৭৫, ৯০, ৮৭, বিনা ধান-১৭ ও ২২ এবং স্বর্ণা, গুটি স্বর্ণা, কাটারি ভোগ, রনজিৎ জাতের ধানের চারা বীজের বীজতলা তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে এই উপজেলায় প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ জমিতে রোপা আমনের ধান লাগানো শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনও অনেক কৃষকের জমিতে উদ্বৃত্ত পড়ে আছে রোপা ধানের চারা বীজ যা এখন তারা বিক্রি করছেন।
ক্রেতাদের বেশিরভাগই চলনবিলের উল্লাপাড়া, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, গুরুদাসপুর এলাকার বিভিন গ্রামের কৃষক। তারা ১০০টির আঁটি প্রকারভেদে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় কিনে অটোভ্যান, নছিমনে বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছেন। কাছিকাটা এলাকার কৃষক রোস্তম আলী সরদার জানান, প্রতিদিন শুধু তাড়াশ এলাকা থেকেই ৩৫ থেকে ৪০ গাড়ি রোপা আমনের চারা বীজ চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে।
অন্যদিকে তাড়াশের বস্তুল গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি নিজের আবাদের পর বেঁচে যাওয়া রোপা আমনের চারা প্রায় ৯ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। এতে তিনি যেমন লাভবান হয়েছেন, তেমনি বীজ সংকটে থাকা অন্য এলাকার কৃষকও সংকট মোকাবিলা করতে পারছেন।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com