মনিরুল ইসলাম : চতুরদিকে সবুজের সমারোহ। রাস্তার পাশে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে খিরার খেত। আইলে সারি সারি ও জমির মধ্যে ধরে আছে খিরা আর খিরা। খিরা চাষ পাল্টে গেছে ২০ গ্রামের চিত্র। তাড়াশ উপজেলার সেই গ্রামগুলোর একটি দিঘুড়িয়া। খিরা চাষে এ গ্রামের কৃষকের জীবনে এসেছে আর্থিক স্বচ্ছলতা, হয়েছেন স্বাবলম্বী। খিরা চাষ করে বেকার সমস্যার সমাধানের পথও খুঁজে পেয়েছেন অনেকে। তাড়াশ কৃষি অফিস সূত্র জানায়, এ উপজেলার বারুহাস,ঠেঙ্গাপাকুরিয়া, সোরাবাড়ি, সান্দ্রা, বিনোদপুর,সাচান দিঘি, কুসুম্বী, মোনহরপুর, দিঘুরিয়া, তালম, গুল্টা, ব¯ু‘ল প্রভৃতি গ্রমাঞ্চলের প্রায় ৪৪০ হেক্টর জমিতে এ বছর খিরা চাষ হয়েছে। সান্দ্রা গ্রামের খিরাচাষি ওয়াহাব আলী জানান, এ বছর তিনি ৫০ শতক জমিতে হাইব্রিড জাতের খিরা চাষ করেছেন। তিনি পৌষ মাসের মাঝামাঝি, জমিতে দুই হাত দূরে দূরে গর্ত/মাদা করে খিরা বীজ বপন করেন। বীজ বপনের দেড় মাস পর থেকে খিরা সংগ্রহ শুরু করেছেন। গ্রামের পাশের আড়তে পাইকারি বিক্রেতার কাছে তিনি প্রতি মণ খিরা ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। তার এই ৫০ শতক জমিতে খিরা চাষ করতে ২০-৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি এ পর্যন্ত ২৫ হাজার টাকার খিরা বিক্রি করেছেন। এ জমি থেকে আরো অর্ধ লাখ টাকার খিরা বিক্রি করতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই গ্রামের কৃষক আসলাম, তিনিও এ বছর এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে ভাল জাতের খিরা চাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। তিনি এ পর্যন্ত ১৫ হাজার টাকার খিরা বিক্রি করেছেন এবং আরো ৩০ হাজার টাকার খিরা বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান। মুরাদ হাইব্রিড জাতের খিরা চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। এলাকার কৃষকরা আরো জানান, খিরা চাষ করে ধানও চাষ করা যায়, পাশাপাশি জমি থেকে একটা বাড়তি ফসল পাওয়া যায়। পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত খিরা বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। মাটি বেশ উর্বর। এতে চাষকৃত খিরা গাছ চারদিক থেকেই সূর্যের আলো পায়। এতে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন ভালো হয়। জমি উঁ”ু তাই বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যায়। এছাড়া ধানের তুলনায় খিরা চাষে ২/৩ গুণ বেশি লাভ হয়। অল্প পুঁজিতে লাভ বেশি হওয়ায় খিরা চাষ এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, এ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে সবচেয়ে বেশি জমিতে খিরা চাষ হয়েছে। জমিতে খিরা চাষ করে কম সময়ে অধিক ফলন ও ভালো দাম পেয়ে এসব গ্রামের কৃষকরা খুব খুশি। মূলত খিরা চাষ পাল্টে দিচ্ছে তাড়াশ উপজেলার গ্রামগুলোর চিত্র। তবে,খিরা চাষে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পোকা-মাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, খিরা গাছের পাতা ও ফলে অনুখাদ্য বোরন ও ম্যাগনেশিয়ামের অভাব দেখা যায়। নিম্নমানের বীজ ব্যবহারের কারণে অনেক সময় খিরার আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খরার কারণে খিরা চাষ ব্যাহত হয়। উৎপাদিত খিরা কেনাবেচার জন্য গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে খিরার মৌসুমি আড়ত। তাই খিরা বিক্রি করতে সাধারণত পরিবহন খরচ লাগে না। কৃষকরা খেত থেকে খিরা তুলে এনে আড়তে বিক্রি করেন। খিরা চাষে মহিলা ও বেকার যুবকসহ স্কুল-কলেজের ছাত্রদেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এলাকার বাজারের চাহিদা মিটিয়ে ট্রাকযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছে এখানকার খিরা। স্থানীয় বাজারের ক্রেতারা টাটকা ও তাজা খিরা কিনতে পেরে খুশি। তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছাঃ লুৎফুন্নাহার লুনা বলেন, অন্যান্য ফসলের তুলনায় খিরা চাষ লাভজনক হওয়ায় এ উপজেলায় দিন দিন খিরা চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কম খরচে খিরা চাষ করে লাভবান হওয়ার জন্য এ উপজেলার প্রতিটি ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ চাষিদের পাশে থেকে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। ফলে এ বছর কৃষকরা খিরা চাষ করে আশাতীত ফলন পেয়ে লাভবান হয়েছেন। এতে কৃষকের মধ্যে খিরা চাষে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তারা আগামীতে আরো বেশি করে খিরা চাষ করবেন বলে আশা করছেন।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com