স্টাফ রিপোর্টার : স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিবাহিত হলেও তাড়াশ উপজেরার আশানবাড়ী গ্রামের প্রয়াত মালেকা খাতুন পাননি বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি, হতে পারেননি গৌরাবান্বিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারী তালিকাভুক্ত। তার পরিবারের পক্ষ হতে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনার তালিকাভুক্ত হতে ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি লাভের উদ্দেশ্যে সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
বীরাঙ্গনা মালেকা খাতুন তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের আশানবাড়ী গ্রামের মৃত শব্দের আলীর স্ত্রী। তার পিতা বিনসাড়া গ্রামের মৃত হাচেন আলী প্রামানিক ও মাতা মৃত বেজারী বিবি। তখন তার বয়স ২৫ বছর এবং ১ ছেলে ও ১ মেয়ের মা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকসেনা, মিলিশিয়া ও রাজাকাররা শব্দের আলীর বাড়ীতে দিনের বেলা চড়াও হয়ে তার স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ঘটনার দিন দুপুর বেলা যখন মালেকা খাতুন মধ্যাহ্ন খাবার তৈরীর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখন আচমকা পাকবাহিনীর জোয়ান ও রাজাকাররা তার ঘরে ঢুকে পড়ে। বর্ষাকাল ছিল বলে তারা চুপিসারে নৌকায় এসে পাড়ায় নেমে বাড়ীতে ঢুকে পড়ে এসময় মালেকার স্বামী মাছধরার কাজে বাইরে ছিল। ছেলেমেয়েও কেউ নিকটে ছিল না। ফলে সুযোগ বুঝে পাক সেনা ও রাজাকাররা তাকে জোড়পূর্বক ধর্ষণ করে। আশানবাড়ী গ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও তাড়াশের সর্বজন সুপরিচিত শিক্ষক ফজলুর রহমান সাহেব এবং ঐ গ্রামের আর এক বিশিষ্ঠ লেখক সমাজকর্মী আবদুর রাজ্জাক রাজ ুঘটনার দিন গ্রামেই ছিলেন। গ্রামের অনেকের মত তারা এ ব্যাপারটি ভালভাবে অবগত। তাছাড়া এ ঘটনা কাছে থেকে দেখা কয়েকজন বয়স্ক লোক এখনও জীবিত আছেন। তারা এর সত্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ওদিকে স্বাধীনতার সময় ওই দু:খজনক ঘটনার প্রেক্ষিতে মালেকা খাতুনের দাম্পত্য জীবনে পরবর্তীতে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়। বিশেষত: স্বামী শব্দের আলী ঘটনার কিছুকাল পর থেকেই স্ত্রীর প্রতি অবজ্ঞাসূচক ব্যবহার করতে থাকেন। পরে তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বেশ কিছুদিন বাবার বাড়ী পাঠিয়ে রাখেন। এ পর্যায়ে শব্দেরের শশুরের গ্রামের ও তার নিজ গ্রামের মাতবরদের দফায় দফায় সালিস বৈঠকের ফলে মালেকাকে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে তার স্বামী সম্মত হয়। তারপরও মালেকা খাতুনের জীবন আমৃত্যুই ছিল অশান্তিপূর্ণ যার কারণ মূলত: একটাই। এরপর তার আরো সন্তানসন্ততি হলে মোট ৩ ছেলে ও ৩ মেয়ে রেখে অবশেষে ১৯৯৪ সালে মালেকা খাতুন মৃত্যুবরণ করেন। এর ৮ মাস পর স্বামী শব্দের আলীও মারা যান। বর্তমানে তাদের কনিষ্ঠ ১ মেয়ে ছাড়া অন্যরা সবাই বিবাহিত এবং তাড়াশের বিভিন্ন গ্রামে বসবাস করেন। তবে সবাই ভূমিহীন ও দুস্থ শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত। ইতোপূর্বে আশানবাড়ী গ্রামের স্বনামধন্য লেখক-সাংবাদিক আবদুর রাজ্জাক রাজু মালেকা খাতুনের বীরাঙ্গনা হওয়ার প্রসঙ্গ পত্র-পত্রিকায় স্মৃতিকথা লিখেছেন যা বহু মানুষ পাঠ করে অবগত হয়েছেন, হয়েছেন মর্মাহত।
সম্প্রতি মালেকা খাতুনের মেয়ে সাবিয়া খাতুন তার মায়ের পক্ষে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি লাভের জন্য এবং সরকারী নিয়মে তার মাকে মুক্তিযোদ্ধার সনদসহ ভাতা ও অনান্য সুযোগ-সুবিধাদি দেয়ার জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তারা আশা করে , মৃত্যুর পরে হলেও তাদের মা সরকারী স্বীকৃতি লাভ করে তার বিদেহী আত্মা সন্মানিত হবে এবং শান্তি লাভ করবে।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com