শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচল বানিজ্য বিভাগ কার্যত অচল

Spread the love
এম.আতিকুল ইসলাম বুলবুল
নব্বই দশকে আমি মফস্বলের মাধ্যমিকে ও উচ্চ মাধ্যমিকে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখা- পড়া করতাম। যুগ আন্দাজে সেখানে বিজ্ঞান, মানবিক, বানিজ্য বিভাগে পড়ার পরিপূর্ণ না হলেও বেশ সুয়োগ ও সু- ব্যবস্থাই ছিল বলা চলে। বিশেষ করে হাইস্কুলে পড়ার সময় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষাথীরা যখন বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ল্যাবে বিজ্ঞানের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের সাথে ব্যাঙ বা মাছের পেট কেটে এটা ওটা করতেন তখন ওই গুলো দেখে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মেধাবী ও অনেক কিছু জানে এ ধারনা পোষন করতাম। একই সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের নাক উচু ভাবখানা মানবিকের শিক্ষার্থী হিসাবে আমাকে এক ধরনের পীড়া দিত বৈকি? শুধু বিজ্ঞানের নয় প্রায় ৩০- ৩৫ বছর পূর্বেও বানিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের গদগদ ভাবখানা লক্ষ করার মত ছিল। তারা অংকে অনেক পাঁকা। এ ধারনা ষ্পট ছিল। ভাবতাম ওই দুই বিভাগের শিক্ষার্থীরা মানবিকের শিক্ষার্থীদের অনেক খানি গবেট ছাত্র ভাবে বোধ হয়।
তাই শিক্ষা জীবনে বিজ্ঞান বা বানিজ্য বিভাগে না পড়তে পারার মনকষ্টও কৌশরে আমার অনেক সময় জুড়ে মনোকষ্টে ভুগিয়ে ছিল। যাই হোক এখন প্রায় ২২ বছর কলেজে শিক্ষকতার সুবাদে দেখতে পাচ্ছি বিজ্ঞান, মানবিক, বানিজ্য বিভাগের সহকর্মী শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নিয়ে বেশ ভাবনায় আছেন অনেকে। যেমন- মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে নব্বই দশকে মানবিক, বিজ্ঞান ও বানিজ্য বিভাগে যে পরিমান শিক্ষার্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করতো সেখানে একুশ শতকে মানবিক, বিজ্ঞান না হলেও মাধ্যমিকে ও উচ্চ মাধ্যমিকে বানিজ্য বিভাগে শিক্ষার্থীর আকাল চোখে পড়ার মত। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বানিজ্যের শিক্ষক সংখ্যার চেয়ে ছাত্র কম। বিশেষ করে উপজেলা এলাকায় বা মফস্বলের মাধ্যমিকে ও উচ্চ মাধ্যমিকে বানিজ্য বিভাগ এখনও আছে, আরো আছে শিক্ষক।
কিন্তু নেই কাঙ্খিত শিক্ষার্থী। অবশ্য এটা মানি বিজ্ঞান ও বানিজ্য বিভাগে অপেক্ষাকৃত মেধাবীরা পড়তে পছন্দ করে। এক সময় এমন বলা হতো বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা মেধাবী তাই পড়ার বিষয়টি বিজ্ঞান হলে উনারা চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং বানিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা ব্যাংক, বীমা ইত্যাদি চাকুরী নিমিষেই পেয়ে যাবেন। গাদাগাদা টাকা বেতনও পাবেন। তাহলে এখন কেন বানিজ্য বিভাগ নিবু নিবু করছে মফস্বলের হাইস্কুল ও কলেজে?  এ বিষয়টি এখন ভাবার সময় এসেছে। বিভিন্ন তথ্য- উপাত্ততের মধ্যে আছে বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বানিজ্য বা ব্যবসায় শিক্ষায় চলমান এ সময় নবম বা একাদশে শিক্ষার্থী ভর্তিতে প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। সেটা ভয়াবহ সংখ্যা। তাই বানিজ্যের দুরাবস্থা অথবা সংকটাপূর্ণ যর্থাথ বলা যায়। আমার জানা মতে একটি হাইস্কুল- কলেজে বানিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়াবেন এমন শিক্ষক আছেন ১২ জন। এর বিপরীতে বানিজ্যের ছাত্র আছে মাত্র ৩ জন। যদি ও বানিজ্য বিভাগের এহেন দুরাবস্থার কারণ হিসেবে অনেক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, জটিল ও সেকেলে পাঠ্যক্রম, হিসাববিজ্ঞান পাঠ্যক্রম খুবই ভারী ও জটিল, প্রযুক্তির এ যুগে বানিজ্যের বিষয়ে যুগসই প্রযুক্তির অভাব, ব্যবহারিক নম্বরের অভাব, সফটওয়্যার ভিত্তিক পাঠ্যক্রমে বাস্তবতার সংকট। আবার কম্পিউটার প্রশিক্ষণ বা ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার সাথে গড়মিল, বিষয় ভিত্তিক নীতি গত পরিবর্তন প্রভৃতি। আর এ সকল বাস্তব সম্মত কারণে বানিজ্য বিভাগে ভর্তিতে যারপর নাই প্রভাব পড়ছে।
আবার ওই সব কারণ ছাড়াও আরো অনেক কারণে মাধ্যমিকে ও উচ্চ মাধ্যমিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বানিজ্য বিভাগ, শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার্থীরা বানিজ্যে পড়ার আগ্রহ হারাচ্ছেন। তবে বানিজ্যের শিক্ষার্থীদের পড়ান এমন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের বানিজ্যের শিক্ষার্থী বাড়ানোর নানা প্রস্তাব ও দিক নির্দেশনা রয়েছে। যেমন-  পাঠ্যক্রম যুগোপযোগী ও সহজ করা। ট্যালির মতো আধুনিক আইটি ও সফটওয়্যার ভিত্তিক প্রশিক্ষণ পাঠ্যক্রমে অন্তরভুক্ত করা। বানিজ্যের শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষার সুযোগ ও নম্বর থাকা।
পর্য্যাপ্ত অকাঠামো, দক্ষ শিক্ষকসহ আরো আরো যুগোপোযোগি কার্যকর উদ্দ্যোগ নিতে হবে। নতুবা বলা বাহুল্য, মাধ্যমিক,উচ্চ মাধ্যমিকে বানিজ্য বিভাগ বিমূখ শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগামী দিনে আরো কমবে। যার প্রমান দেশের মফস্বল এলাকায় এমপিওভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান সেখানে মাধ্যমিকে ও উচ্চ মাধ্যমিকে বানিজ্য বিভাগ সচল আছে। কিন্তু পড়ানোর মত শিক্ষার্থী মিলছেনা বলেই অনেক প্রতিষ্ঠানের বানিজ্য বিভাগ অনেকাই অচল। সতীর্থ বানিজ্য বিভাগের অনেক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জানান, কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বানিজ্য বিভাগে শিক্ষার্থী সংকট এতোটাই তীব্র হয়েছে যে, ভর্তির মৌসুমে বেতন- ভাতা আর প্রতিষ্ঠানের বানিজ্য বিভাগ বাঁচাতে দু- চারজন শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বুঝিয়ে- সুঝিয়ে আনতে হচ্ছে খোদ শিক্ষকদেরকেই। কিন্তু এ ভাবে কতদিন? তাই শিক্ষার শ্রেণি বিন্যাসের বানিজ্য বিভাগ সচল ও যুগোপোযোগি করতে সংশ্লিট বিভাগকে এখই উদ্দ্যোগী হওয়া জরুরী বলে সচেতন মহল মনে করেন। তা না হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচল বানিজ্য বিভাগ কার্যত অচল হয়ে পড়বে। সে সময় খুব দূরে নয়।
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক ও কলামিষ্ট।

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD