মো: মাজেম আলী মলিন গুরুদাসপুর নাটোর থেকে
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৯০৩ সালে। সেই হিসাবে বয়স এখন ১২৩ বছর। জীবনের দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি দেখেছেন ব্রিটিশ শাসনের শেষ অধ্যায়, পাকিস্তান আমল, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সাত দশকের ইতিহাস। সময়ের ভারে শরীর আজ নুয়ে পড়েছে, চলতে লাগে লাঠির ভর, শ্রবণশক্তিও আগের মতো নেই। তবু বিস্ময় জাগানো এক দৃশ্য এখনো অটুট—চশমার প্রয়োজন হয় না, স্পষ্ট চোখে পড়তে পারেন পবিত্র কোরআন শরিফ। নাটোরের গুরুদাসপুরের আব্বাস প্রামাণিকের ১২৩ বছরের জীবন যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর চোখের সামনে পেরিয়ে গেছে ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের দীর্ঘ পথচলা।
উপজেলার বিয়াঘাট ইউনিয়নের যোগেন্দ্রনগর গ্রামের মৃত সদর উদ্দিনের ছেলে আব্বাস প্রামাণিক। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছেলে-মেয়েদের বিনা পারিশ্রমিকে কোরআন শিক্ষা দিতেন।সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে না পারলেও নিজের কাজ নিজে করার চেষ্টা করেন আব্বাস। লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ির উঠানে হাঁটেন। নিয়মিত নামাজ পড়েন এবং চশমা ছাড়াই কোরআন তিলাওয়াত করেন। তার হাতে দেখা যায় একটি ক্যাসিও ঘড়ি। বয়সের তুলনায় দৃষ্টিশক্তি এখনো ভালো থাকায় পরিবারের সদস্যদের কাছেও বিষয়টি বিস্ময়ের।আব্বাসের স্ত্রী মরিয়ম আক্তার আজ থেকে ৫০ বছর আগেই মারা গেছেন। তার সমবয়সীদেরও কেউ এখন জীবিত নেই। দীর্ঘ জীবনের অনেক স্মৃতি এখন আর স্পষ্ট মনে করতে পারেন না। একসময় অর্থ-সম্পদ থাকার কারন মেট্রিকুলেশন পাস করেও চাকুরী করেননি। বর্তমানে ভাঙাচোরা একটি ঘরে বসবাস করেন তিনি। নাতি-বউয়েরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তার দেখাশোনা করেন।
তার বড় ছেলে রবিউল করিম ( ৭৫) জানান, , বাতাসা, গরুর দুধ ও মসুর ডাল তার বাবার পছন্দের খাবার। তবে বয়সের এই পর্যায়ে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয় না বলেও জানান তিনি। আব্বাসের নাতি জাহিদুল ইসলাম (৪৫)বলেন, ‘আমার দাদা খুবই ধার্মিক মানুষ। সৎভাবে জীবন কাটিয়েছেন। সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। গাড়িতে চড়াকেও বিলাসিতা মনে করতেন। জীবনের বেশিরভাগ সময় হেঁটেই চলাফেরা করেছেন। এখন শরীর আগের মতো সায় দেয় না। তবু লাঠিতে ভর করে বাড়ির উঠানে হাঁটেন।’আরেক নাতি বেলাল হোসেন বলেন, ‘দাদার ছেলে-মেয়ে এবং নাতিপুতিরা সবাই নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তাই তাকে দেখাশোনার জন্য নির্দিষ্ট কেউ নেই। আমরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে থাকার চেষ্টা করি। দাদার ঘরটিও ভাঙাচোরা। তারপরও যত টুকু সম্ভব ভালো রাখার চেষ্টা করি।’
আব্বাসের মেয়ে আলিমা বেগম জানান, ছোটবেলা থেকেই আব্বাকে সৎ ও সহজ-সরল জীবনযাপন করতে দেখেছি।তিনি এখনো চশমা ছাড়া কোরআন পড়েন। অথচ তার সন্তানরাই এখন চোখে কিছুটা ঝাপসা দেখেন। আব্বা বর্তমানে সন্তান ও নাতিপুতিদের সঙ্গেই থাকেন। সুযোগ পেলেই তার পছন্দের খাবার নিয়ে তাকে দেখতে যাই।’পরিবারের সদস্যরা জানান, আব্বাস প্রামাণিক সখের বসে বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসায় শিশুদের বিনা পারিশ্রমিকে কোরআন শিক্ষা দেওয়ার কাজও করতেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তার আয় সীমিত হলেও জীবনযাপনে ছিল সাদাসিধে ভাব।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, ‘আব্বাস প্রামাণিক উপজেলার প্রবীণ ব্যক্তিদের একজন। বয়সের কারণে তিনি তেমন চলাফেরা করতে পারেন না। তার চলাচলের সুবিধার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়ির সামনে সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে।’ইউএনও আরও বলেন, ‘আব্বাস আলীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে খুবজীপুর প্রবীণ সেবা কেন্দ্র। উপজেলা প্রশাসনও বিভিন্ন সময়ে তাকে সহযোগিতা করে আসছে।’
১২৩ বছর পেরিয়ে আব্বাস প্রামাণিক আজ যেন একটি জীবন্ত ইতিহাস—যাঁর চোখে ধরা আছে হারিয়ে যাওয়া সময়ের অসংখ্য ছবি। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ, কত মানুষ, কত ঘটনা, কত স্মৃতি পেরিয়ে তিনি আজও কোরআনের অক্ষরে খুঁজে নেন জীবনের শান্তি। কিন্তু ইতিহাসের এই মানুষটিরও প্রয়োজন একটু মমতা, একটু সঙ্গ, একটু আপন করে পাশে থাকা। কারণ বয়স যত বাড়ে, পৃথিবী তত ছোট হয়ে আসে—শেষে থেকে যায় শুধু প্রিয় মানুষের হাতটি ধরে থাকার আকাঙ্ক্ষা।
2 Attachments • Scanned by Gmail
Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com