মো: মাজেম আলী মলিন — সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট md.magem1974@gmail.com
বেতন বাড়বে—এই খবর শুনতে কার না ভালো লাগে! সরকারি কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে-স্কেলের অপেক্ষায় থাকেন। সংবাদমাধ্যমে বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনার খবর আসে, আলোচনা হয়, হিসাব-নিকাশ চলে, প্রত্যাশা বাড়ে। কিন্তু মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাজারও যেন নিজের হিসাব কষতে থাকে। চাল, ডাল, তেল, মাছ-মাংস, ওষুধ, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াত—জীবনের প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনীয় খাতেই যখন ব্যয়ের চাপ বাড়তে থাকে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি শুধু বেতন বাড়ার অপেক্ষায় আছি, নাকি কম খরচে স্বাভাবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারটিও ফিরে পেতে চাই?
বেতন বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মচারীদের আয় পুনর্নির্ধারণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন কর্মচারীর হাতে বাড়তি অর্থ গেলে তাঁর ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, ভোগব্যয় বাড়ে, বাজারে চাহিদা তৈরি হয়; এর মধ্য দিয়ে উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয় তখনই, যখন মানুষের আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্য ও সেবার দামও দ্রুত বাড়তে থাকে। মানুষের হাতে টাকা বাড়ল, অথচ সেই টাকা দিয়ে আগের তুলনায় বেশি পণ্য কেনা গেল না—তাহলে আয় বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃত স্বস্তি কতটা বেড়েছে? অর্থনীতির ভাষায় এখানেই নামমাত্র আয় ও প্রকৃত আয়ের পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বেতন বৃদ্ধির আসল মূল্য নির্ধারিত হয় বেতনের অঙ্ক দিয়ে নয়, সেই বেতন দিয়ে একজন মানুষ কতটা পণ্য ও সেবা কিনতে পারছেন, তার ওপর।
এই বাস্তবতাই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে—পে-স্কেল হবে কি হবে না, প্রশ্নটি আসলে এত সরল নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, নতুন বেতন কাঠামো একজন কর্মচারী ও তাঁর পরিবারের জীবনকে কতটা স্বস্তি দিতে পারবে?
‘এক যুগ পর বেতন বাড়ছে’—এমন ঘোষণা শুনতে শুনতেই যদি কয়েক বছর কেটে যায় এবং সেই সময়ের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক দফা বেড়ে যায়, তাহলে নতুন বেতন কাঠামোর একটি বড় অংশ কার্যকর হওয়ার আগেই মূল্যস্ফীতির কাছে তার শক্তি হারাতে পারে। কাগজে বেতন বাড়বে, কিন্তু বাস্তবে সেই বাড়তি অর্থের বড় অংশ যদি বাড়তি ব্যয় মেটাতেই চলে যায়, তাহলে মানুষের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কোথায়?
এ কারণেই ‘বেতন দ্বিগুণ’—এই বহুল আলোচিত ধারণাটিকেও একটু ভিন্নভাবে দেখা প্রয়োজন। ধরুন, কোনো কর্মচারীর বেতন একবারে দ্বিগুণ না হয়ে কয়েক ধাপে কয়েক বছরে বাড়ানো হলো। কাগজে পুরোনো ও নতুন বেতনের অঙ্ক পাশাপাশি বসালে বড় একটি পার্থক্য দেখা যাবে। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় কতটা বেড়েছে, সেটিও যদি হিসাবের মধ্যে না থাকে, তাহলে সেই দ্বিগুণের হিসাব মানুষের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরবে না।
তাই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হলেও জরুরি—বেতন কি সত্যিই দ্বিগুণ হয়েছে, নাকি কাগজের অঙ্ক আর বাস্তব ক্রয়ক্ষমতার মাঝখানে লুকিয়ে আছে সেই চিরচেনা ‘শুভংকরের ফাঁকি’? বেতন বৃদ্ধির সাফল্য তখনই অর্থবহ, যখন তা মূল্যস্ফীতিকে অতিক্রম করে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায় এবং জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান স্বস্তি আনে। শুধু বেতনের অঙ্ক বড় হওয়া আর মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বড় হওয়া এক বিষয় নয়।
আমাদের অর্থনৈতিক আলোচনায় তাই ‘কত টাকা বেতন বাড়ল’—এই প্রশ্নের পাশাপাশি ‘সেই বাড়তি টাকায় কতটা বেশি কেনা গেল’—এই প্রশ্নটিও সামনে আনা দরকার। একজন কর্মচারী যদি নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পরও আগের মতোই সংসারের বাজার, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা ও বাসাভাড়ার হিসাব মেলাতে হিমশিম খান, তাহলে কাগজে বেতন বৃদ্ধির সাফল্য থাকলেও বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন কতটা হলো, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এখানে অবশ্যই পে-স্কেল বাতিলের কথা বলা হচ্ছে না। বরং পে-স্কেলকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখার সময় এসেছে। বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের অপচয় কমানো জরুরি। কারণ একদিকে কর্মচারীর হাতে বাড়তি টাকা দিয়ে অন্যদিকে বাজারে সেই টাকার মূল্য কমিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।
একজন কর্মচারীর হাতে যদি ১০ হাজার টাকা বাড়তি দেওয়া হয়, কিন্তু একই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় এমনভাবে বেড়ে যায় যে সেই ১০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ মেটাতেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হলো? অনেকটা এমন—এক হাতে টাকা দেওয়া হলো, অন্য হাত দিয়ে বাজার সেই টাকা তুলে নিল। মানুষের আয় বাড়ল, কিন্তু স্বস্তি বাড়ল না।আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একবারে বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধি কার্যকর করলে রাষ্ট্রের ওপর হঠাৎ বড় আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে সেই চাপ কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বেতন বৃদ্ধিও যদি ধাপে ধাপে হয় এবং একই সময়ে দ্রব্যমূল্যও ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে, তাহলে কর্মচারীদের কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। তখন বেতন বৃদ্ধি হয়ে উঠতে পারে দীর্ঘ অপেক্ষার আরেকটি অধ্যায়।
এই জায়গাতেই বিকল্প একটি ধারণা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে—নিয়মিত আয় সমন্বয়। পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করে একবারে বড় বেতন বৃদ্ধির পরিবর্তে প্রতিবছর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে বেতন সমন্বয়ের একটি কার্যকর ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার বর্তমান ৫% থেকে কিছুটা বাড়িয়ে বাস্তবসম্মত পর্যায়ে নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। এতে একদিকে কর্মচারীরা প্রতিবছর কিছুটা করে আয় বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন, অন্যদিকে রাষ্ট্রের ওপর একবারে বড় আর্থিক চাপও তৈরি হবে না।অবশ্য এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে মূল্যস্ফীতি পরিমাপ ও আয় সমন্বয়ের জন্য একটি স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য কাঠামো প্রয়োজন। শুধু অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নয়; খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াতসহ জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়ের পরিবর্তনকে বিবেচনায় নিয়েই আয় সমন্বয়ের হার নির্ধারণ করা উচিত। তাহলে বেতন বৃদ্ধি শুধু একটি প্রশাসনিক ঘোষণা হয়ে থাকবে না; তা মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত একটি অর্থনৈতিক নীতিতে পরিণত হবে।
রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতাও অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে, করের আওতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে, সরকারি অর্থের অপচয় ও অনিয়ম কমাতে হবে। রাষ্ট্রের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না রেখে কেবল বেতন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া যেমন টেকসই নয়, তেমনি কর্মচারীদের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় উপেক্ষা করাও বাস্তবসম্মত নয়। তাই প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও কর্মচারীর ন্যায্যতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হবে।সবশেষে আমাদের ভাবতে হবে, একজন সরকারি কর্মচারী আসলে কী চান। তিনি কি শুধু গেজেটে বড় একটি বেতন অঙ্ক দেখতে চান? নাকি চান মাসের শেষে বাজার করতে গিয়ে হিসাবটা যেন কিছুটা সহজ হয়, সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে যেন দুশ্চিন্তা কমে, চিকিৎসার প্রয়োজনে যেন ধার করতে না হয়, বাসাভাড়া দেওয়ার পর যেন সংসার চালানোর মতো অর্থ হাতে থাকে? মানুষের চাওয়া শেষ পর্যন্ত খুব জটিল নয়—আয় ও ব্যয়ের মধ্যে একটি মর্যাদাপূর্ণ ভারসাম্য।
তাই নতুন পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা শুধু কত শতাংশ বেতন বাড়বে—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার মান। পে-স্কেল প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণও প্রয়োজন। বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন, কিন্তু সেই বেতন যাতে মূল্যস্ফীতির কাছে পরাজিত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কারণ বেতনের অঙ্ক যত বড়ই হোক, যদি মাসের শেষে সংসারের হিসাব আগের মতোই কঠিন থাকে, তাহলে সেই বৃদ্ধির সাফল্য কোথায়? মানুষের হাতে বেশি টাকা দিয়ে যদি বাজারের হাতে আরও বেশি টাকা তুলে দিতে হয়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির অর্থনৈতিক সাফল্য হয়তো কাগজে থাকবে, মানুষের জীবনে নয়।শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজন শুধু বড় বেতন নয়—বেতনের বিনিময়ে স্বস্তির জীবন। একটি পে-স্কেলের প্রকৃত সাফল্য তাই গেজেটের পাতায় কত বড় অঙ্ক লেখা হলো, সেখানে নয়; বরং মাসের শেষে একজন কর্মচারীর বাজারের ব্যাগে কতটা প্রয়োজনীয় পণ্য থাকে, তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা কতটা কমে এবং তাঁর পরিবারের মুখে কতটা স্বস্তি ফিরে আসে—সেখানেই তার আসল মূল্যায়ন।হয়তো এখন সময় এসেছে পে-স্কেলের অঙ্ক নিয়ে শুধু অপেক্ষা না করে আয় সমন্বয়ের দর্শন নিয়েই নতুন করে ভাবার।#18.09.26
Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com