মো. মাজেম আলী মলিন,সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট # ০১৭১৯৭৩৪৫২০
বর্ষার আকাশ যখন মেঘের নীলচে বিষণ্নতা মুছে জলরঙে ভেসে ওঠে, তখন চলনবিলও যেন বদলে ফেলে তার চিরচেনা শরীর। চারদিকে শুধু জল আর জল। দিগন্তজোড়া জলরাশি, দূরে ভেসে থাকা নৌকা, বৈঠার ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ, জেলেদের ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে মনে হয়, এটি কোনো সাধারণ বিল নয়; প্রকৃতির নিজের হাতে লেখা এক দীর্ঘ কবিতা।
বর্ষায় চলনবিলের রূপ সবচেয়ে বেশি উন্মোচিত হলেও ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় তার সাজও। শরতে নীল আকাশ আর সাদা মেঘের ছায়া পড়ে জলের আয়নায়, হেমন্তে মাঠজুড়ে নামে সোনালি ধানের হাসি, শীতে কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায় চারপাশ। অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে জলাভূমি। আর বর্ষায় নৌকার ছন্দে শুরু হয় এক অন্যরকম জলভ্রমণ। প্রকৃতির এই ঋতুবৈচিত্র্যই চলনবিলকে পর্যটনের জন্য করে তুলেছে অনন্য।
একসময় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল চলনবিল। আজ তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি সম্ভাবনাময় পরিচয়—পর্যটন। তবে চলনবিল কোনো একক জলাশয় নয়। নদী, খাল, ছোট-বড় বিল ও জলাভূমির বিস্তৃত জলজ নেটওয়ার্ক মিলেই এর অস্তিত্ব। বৃহত্তর চলনবিল নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ জনপদজুড়ে ছড়িয়ে আছে। বর্ষায় এর জলময় বিস্তার আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। এই বিশাল জলভূমির বুক চিরে বয়ে গেছে আত্রাই, বড়াল, গুমানীসহ নানা নদ-নদী ও অসংখ্য খাল। নৌকায় চলতে চলতে কখনো মনে হয় নদী পেরোচ্ছি, কখনো মনে হয় ঢুকে পড়েছি অনন্ত কোনো জলরাজ্যে। এই জলপথই হতে পারে চলনবিলের পর্যটনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
তবে চলনবিলের গল্প শুধু জল ও প্রকৃতির নয়; এর ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে ঘুমিয়ে আছে ইতিহাস, লোককথা ও ঐতিহ্যের দীর্ঘ স্মৃতি। গুরুদাসপুরের খুবজীপুরে প্রতিষ্ঠিত চলনবিল জাদুঘর সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। প্রাচীন নিদর্শন, শিলালিপি, টেরাকোটা, মাছ ধরার সরঞ্জামসহ এখানে সংরক্ষিত আছে বিলের জীবন ও সংস্কৃতির নানা স্মারক। চলনবিলঘেঁষা জনপদে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক স্থাপনা, মসজিদ, মাজার, জমিদারবাড়ি ও লোকঐতিহ্যও পর্যটনের সম্পদ হতে পারে। নদী-বিল, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যকে একই সূত্রে গাঁথা গেলে তৈরি হতে পারে একটি সমন্বিত ‘চলনবিল পর্যটন সার্কিট’। তখন এটি শুধু নৌভ্রমণের গন্তব্য থাকবে না; হয়ে উঠবে জল, প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য লিলাভূমি।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, চলনবিলের পর্যটন সম্ভাবনা এখন আর শুধু স্থানীয় মানুষের স্বপ্নে সীমাবদ্ধ নেই। সরকারি পর্যায়েও ইকো-ট্যুরিজমের সম্ভাবনা যাচাইয়ের উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে এর সুফল ছড়িয়ে পড়তে পারে বিলপাড়ের মানুষের ঘরে। নৌযান, স্থানীয় গাইড, খাবার, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য, মাছ এবং লোকজ সংস্কৃতিকে ঘিরে তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের পথ। পর্যটক আসবে, কিন্তু তার সঙ্গে যেন আসে স্থানীয় মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার আলো—পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সেটিই।
তবে এখানেই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—যে জলরাশিকে ঘিরে পর্যটনের স্বপ্ন, সেই জলরাশিই যদি একদিন হারিয়ে যায়, তাহলে পর্যটন হবে কোথায়? অপরিকল্পিত অবকাঠামো, নদী-খালের নাব্যতা কমে যাওয়া, পলি জমা, জলপ্রবাহে বাধা, দখল ও বিভিন্ন স্থাপনার চাপে চলনবিলের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য ইতোমধ্যেই নানা সংকটে। তাই পর্যটনের আগে বাঁচাতে হবে চলনবিলকে। শুধু কংক্রিটের রাস্তা, রেস্টহাউস কিংবা স্থাপনা নির্মাণ করলেই ইকো-ট্যুরিজম হয় না। প্রকৃতিকে অক্ষত রেখে মানুষকে প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাওয়াই হতে পারে এর মূল দর্শন।
চলনবিলকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে একটি সমন্বিত ‘চলনবিল ইকো-ট্যুরিজম সার্কিট’। নিরাপদ নৌভ্রমণ, প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইড, লাইফ জ্যাকেট, পাখি ও জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় খাবার, গ্রামীণ হাট ও লোকজ সংস্কৃতির আয়োজন থাকতে পারে এর অংশ হিসেবে। চলনবিল জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যুক্ত হতে পারে একই পর্যটন রুটে। স্থানীয় নারীদের হস্তশিল্প ও খাদ্যপণ্যের বাজারও হতে পারে বাড়তি আকর্ষণ। আর সর্বত্র থাকতে হবে বর্জ্য ও প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণের কঠোর ব্যবস্থা।
চলনবিলের পর্যটন পরিকল্পনা হতে হবে সমন্বিত, পরিবেশবান্ধব ও স্থানীয় মানুষকেন্দ্রিক। নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের নদী-বিল, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও দর্শনীয় স্থান নিয়ে গড়ে উঠতে পারে ‘চলনবিল ইকো-ট্যুরিজম সার্কিট’। এর আওতায় থাকবে নিরাপদ নৌভ্রমণ, প্রশিক্ষিত গাইড, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র এবং পাখি ও জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা। চলনবিল জাদুঘরসহ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যুক্ত হবে একই পর্যটন রুটে।
বিলের পাড়ে সীমিত পরিসরে পরিবেশবান্ধব কটেজ ও হোমস্টে, স্থানীয় খাবার ও গ্রামীণ হাট গড়ে তোলা যেতে পারে। মাছ, কৃষিপণ্য, নারীদের হস্তশিল্প ও লোকজ সংস্কৃতিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে তৈরি করা যেতে পারে স্থানীয় আয়ের নতুন সুযোগ। বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত ও শীত—প্রতিটি ঋতুকে ঘিরে চালু করা যেতে পারে আলাদা পর্যটন প্যাকেজ। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ।
সবচেয়ে বড় কথা, স্থানীয় মাঝি, জেলে, কৃষক, নারী ও তরুণদের পর্যটনের অংশীদার করতে হবে, যাতে এর সুফল সরাসরি তাঁদের ঘরে পৌঁছায়। পর্যটন হবে মানুষের জন্য, প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে—চলনবিলকে বদলে নয়, চলনবিলকে বাঁচিয়েই।
আজ একজন পর্যটক সকালে চলনবিলে আসেন, বিকেলেই ফিরে যান। অথচ পরিকল্পিত উদ্যোগে এই জলমগ্ন জনপদেই গড়ে উঠতে পারে পরিবেশবান্ধব কটেজ, স্থানীয় খাবার, নৌভ্রমণ, পাখি দেখা, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত আর লোকগানের আয়োজন। শীতের অতিথি পাখি, বর্ষার ঢেউ, শরতের নীল আকাশ কিংবা হেমন্তের সোনালি ধান—প্রতিটি ঋতুকেই ঘিরে তৈরি হতে পারে আলাদা পর্যটন অভিজ্ঞতা। তখন চলনবিল হবে না শুধু এক দিনের ভ্রমণস্থল; হয়ে উঠবে সারা বছরের পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য।
কিন্তু সেই স্বপ্নের ভিত্তি হতে হবে প্রকৃতি সংরক্ষণ। উন্নয়নের নামে বিল ভরাট, নদীর পথ রুদ্ধ কিংবা জলপ্রবাহ থেমে গেলে হারিয়ে যাবে মাছ-পাখি, মুছে যাবে চলনবিলের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। তাই উন্নয়ন বনাম প্রকৃতি—এমন দ্বন্দ্ব নয়; প্রয়োজন প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়েই উন্নয়ন। চলনবিল শুধু একটি বিল নয়—এটি জল, মাটি, মাছ, পাখি, নৌকা, কৃষক, জেলে, লোকগান আর মানুষের হাজার বছরের জীবনযাত্রার এক জীবন্ত গল্প।
সেই গল্পকে বাঁচিয়ে, প্রকৃতিকে আগলে, ইতিহাস-ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে যদি পর্যটনের নতুন দুয়ার খোলা যায়, তবে চলনবিল হয়ে উঠতে পারে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পর্যটনের এক নতুন সম্ভাবনার নাম। দিগন্তজোড়া জলের ওপর তখন শুধু নৌকা ভাসবে না—ভাসবে একটি জনপদের নতুন স্বপ্নও।
Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com