উল্লাপাড়াসহ সিরাজগঞ্জের কয়েক উপজেলায় হাজার হাজার টন পেয়ারা নষ্টের শঙ্কা, বিপাকে চাষিরা

Spread the love
মোঃশামছুল হক, উল্লাপাড়া :
বাগানজুড়ে গাছে গাছে থোকায় থোকায় পেয়ারা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এবার বুঝি বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু গাছ থেকে ফল পেড়ে কাটতেই বেরিয়ে আসছে পোকা, ভেতরে পচন। বাজারে নেওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বড় একটি অংশ। আবার ভালো ফলও পোকার আক্রমণের আশঙ্কায় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা।সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়াসহ সদর, শাহজাদপুর, তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পেয়ারায় পোকার আক্রমণ নিয়ে এমন অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের দাবি, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় চলতি মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পেয়ারা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন স্থানীয় চাষিরা।
উল্লাপাড়া উপজেলার আগরপুর গ্রামের পেয়ারা চাষী মোখলেছুরের একটি পেয়ারা বাগানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক ফলের গায়ে ছোট ছিদ্র দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ফল দেখতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হলেও কাটার পর ভেতরে পোকার লার্ভা ও পচন পাওয়া যাচ্ছে। আক্রান্ত ফল গাছেই ঝরে পড়ছে অথবা পচে যাচ্ছে।মোখলেছুর রহমান বলেন, শুরুতে অল্পসংখ্যক ফলে পোকার আক্রমণ দেখা গেলেও পরে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাজার থেকে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক কিনে ব্যবহার করেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।মোখলেসুর আরো বলেন,’ পোকার আক্রমণে এবছর তাঁর কমপক্ষে ৪-৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
রায়গঞ্জের দত্তকুশা কালিপুরের পেয়ারা চাষী শরীফুল ইসলাম জানান,’ বহুদিন ধরে পেয়ারা চাষ করে  আসছি কিন্তু, এ বছর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি।তাঁর অভিযোগ, পোকার আক্রমণ ঠেকাতে একাধিকবার কীটনাশক প্রয়োগ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোন পোকা আক্রমণ করছে এবং কোন অনুমোদিত বালাইনাশক কী মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে—এ বিষয়ে অনেক কৃষকই নিশ্চিত নন।
ফলে কেউ কেউ স্থানীয় কীটনাশক বিক্রেতার পরামর্শে ওষুধ কিনে ব্যবহার করছেন। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে ভুল বা অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পরিবেশ ও ভোক্তা স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।ভুক্তভোগী কৃষকদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সমস্যা এতটা ছড়িয়ে পড়ার পরও মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের কার্যকর নজরদারি কতটা রয়েছে?কৃষকদের দাবি, আক্রান্ত বাগানগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন করে পোকার ধরন শনাক্ত, আক্রান্ত ফল ধ্বংস, ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
কৃষকদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে তারা সমস্যায় পড়ার পর স্থানীয়ভাবে পরামর্শের জন্য ছুটছেন। কিন্তু ক্ষতি হওয়ার আগেই যদি কৃষি কর্মকর্তারা আক্রান্ত বাগানগুলো পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিতেন, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ কমানো সম্ভব হতো।কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ফলের মাছিসহ বিভিন্ন পোকা পেয়ারা উৎপাদনে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে। এসব পোকা দমনে শুধু কীটনাশক ছিটালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না।বাগান পরিষ্কার রাখা, আক্রান্ত ও ঝরে পড়া ফল সংগ্রহ করে মাটিতে পুঁতে বা নিরাপদ উপায়ে ধ্বংস করা, ফেরোমন ফাঁদ ও অন্যান্য উপযুক্ত ফাঁদ ব্যবহার, বাগানে পর্যবেক্ষণ বাড়ানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার—সবগুলো পদ্ধতি সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে হয়।চাষিদের দাবি, উল্লাপাড়াসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে পেয়ারা নষ্ট হলেও ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে এখনো কোনো সমন্বিত মাঠ জরিপ চোখে পড়ছে না।এ কারণে কৃষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—কত হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়েছে, আক্রান্ত বাগানের সংখ্যা কত, কত শতাংশ ফল নষ্ট হচ্ছে এবং কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণই বা কত—এসব তথ্য কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে? কৃষকদের দাবি, দ্রুত উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে জরিপ করে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা হোক।বাগানে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি এর প্রভাব পড়ছে বাজারেও। ভালো মানের পেয়ারা বাছাই করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সময় ও শ্রম বাড়ছে। ফলে অনেক কৃষক প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছেন না।চাষিদের আশঙ্কা, পোকার আক্রমণ অব্যাহত থাকলে একদিকে বাজারে ভালো মানের পেয়ারা সরবরাহ কমবে, অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়তে পারে ভোক্তার ওপরও।
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD