মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ (হাফিযাহুল্লাহ)
একটি জাতির নৈতিক ভিত্তি নির্মাণে মাদরাসা শিক্ষার অবদান অনস্বীকার্য। যুগে যুগে এদেশের মাদরাসা কেবল আলেম-উলামাই তৈরি করেনি; বরং অসংখ্য নীতিবান মানুষ, সমাজসংস্কারক, ইমাম, খতিব, শিক্ষক ও মানবসেবক গড়ে তুলেছে। ইসলামী জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের ধারক-বাহক হিসেবে মাদরাসার মর্যাদা ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মাদরাসা শিক্ষা এক কঠিন ইমেজ সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। কোথাও কোথাও শিশু নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের হৃদয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। উভয় অবস্থাই উদ্বেগজনক।
আমাদের মনে রাখতে হবে—কয়েকজন অপরাধীর অপরাধ কখনোই হাজার বছরের একটি শিক্ষাধারার পরিচয় হতে পারে না। আবার প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করার নামে অপরাধকে আড়াল করাও ইসলামের শিক্ষা নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে জুলুমের পক্ষ নেওয়া যেমন হারাম, তেমনি অপরাধীর পরিচয় গোপন করে তাকে প্রশ্রয় দেওয়াও অন্যায়।দীর্ঘদিন মাদরাসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে বর্তমান সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
প্রথমত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহু পরিবার সন্তানদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে মাদরাসামুখী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা অঙ্গনে বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা ও মতভেদও তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও মাদরাসাবিরোধী প্রচারণার অভিযোগও শোনা যায়। তবে এসব বিষয়ে আবেগ নয়, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণ করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, মাদরাসা অঙ্গনের অনেক নেতৃত্ব ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয় হলেও আত্মসমালোচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সংস্কৃতি এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। মতভিন্নতাকে শত্রুতা মনে করা, পারস্পরিক কটূক্তি, হিংসা, গীবত ও বিভাজন অনেক সময় নিজের শক্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
তৃতীয়ত, সমাজের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মাদরাসার সম্পর্ক আরও গভীর হওয়া দরকার। দারিদ্র্য বিমোচন, রক্তদান, দুর্যোগে সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ, যুব উন্নয়ন ও মানবিক কর্মকাণ্ডে মাদরাসার সম্পৃক্ততা যত বাড়বে, মানুষের আস্থাও তত সুদৃঢ় হবে।
চতুর্থত, শিক্ষকতার মর্যাদা অত্যন্ত পবিত্র। তাই শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে কঠোর পেশাগত নীতিমালা থাকা আবশ্যক। শিক্ষার্থীদের দিয়ে ব্যক্তিগত সেবা নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় একান্ত মেলামেশা কিংবা এমন কোনো আচরণ, যা সন্দেহের জন্ম দেয়—এসব সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রতিটি মাদরাসায় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা (Child Protection Policy), আচরণবিধি (Code of Conduct), অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা এবং স্বাধীন তদন্ত কমিটি থাকা উচিত। অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এবং প্রমাণিত হলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, শিক্ষক নিয়োগে লিখিত আবেদন, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, পুলিশ ভেরিফিকেশন, পূর্ববর্তী কর্মস্থলের তথ্য এবং চারিত্রিক যাচাই বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি। একজন শিক্ষক শুধু জ্ঞানদাতা নন; তিনি একজন চরিত্র নির্মাতা।
সপ্তমত, আবাসিক মাদরাসাগুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অবস্থান, তত্ত্বাবধান এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আধুনিক নীতিমালা প্রয়োগ করা জরুরি। শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের শৈথিল্যের সুযোগ নেই।
অষ্টমত, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ব্যক্তিগত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ যোগাযোগব্যবস্থা চালু করা উচিত। প্রতিটি যোগাযোগের রেকর্ড সংরক্ষণ করা হলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।নবমত, যত্রতত্র মানদণ্ডহীনভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা বন্ধ করতে হবে। নির্ধারিত অবকাঠামো, যোগ্য শিক্ষক, নিরাপদ পরিবেশ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।দশমত, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে মাদরাসার ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। বিচ্ছিন্নতা নয়; সহযোগিতা ও স্বচ্ছতাই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।একাদশত, শিক্ষক প্রশিক্ষণে কেবল পাঠদানের কৌশল নয়; শিশু মনোবিজ্ঞান, নৈতিকতা, যোগাযোগ দক্ষতা, আইনি সচেতনতা এবং শিশু সুরক্ষা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত।
আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি অপরাধীকে রক্ষা করব, নাকি মাদরাসাকে রক্ষা করব? এই দুই পথ কখনো এক হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করাই মাদরাসার মর্যাদা রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
মাদরাসা শিক্ষা আমাদের ঈমান, আকিদা, আখলাক ও সভ্যতার এক মহামূল্যবান আমানত। এই আমানত রক্ষার দায়িত্ব শুধু আলেমদের নয়; বরং অভিভাবক, শিক্ষার্থী, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং সমগ্র জাতির।
আসুন, আমরা দোষ আড়াল না করে সংশোধনের পথ বেছে নিই। ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করি। আবেগ নয়, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করি। কারণ একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও আদর্শ মাদরাসাই পারে আগামী প্রজন্মকে আলোকিত, নৈতিক ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে।
বিঃদ্রঃ এই নিবন্ধটি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বিশেষ গোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে নয়। মাদরাসা শিক্ষার মর্যাদা, শিশুদের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এটি লিখিত।আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অবস্থান নেওয়ার এবং দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ ও আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলার তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক দাঈ ও গবেষক
Weekly Chalonbeel Barta chalonbeelbarta.com