তাড়াশ পৌরসভার ১৭টি রাস্তা নির্মাণে পুকুর চুরি – জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ

Spread the love

বিশেষ প্রতিনিধি: স্থানীয় সরকার মন্তণালয়ের ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে বৃহত্তর পাবনা ও বগুড়া জেলা নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৭ টি আরসিসি রাস্তা নির্মাণ করা হয় সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ উপজেলার পৌরসভা এলাকায়। অথচ নির্মাণের দুই মাস যেতে না যেতেই রাস্তাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিটি রাস্তার দুই পাশের ডব্লিউ বিমে ফাটল দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় নিমার্ণ সামগ্রী ব্যবহার না করা ও নি¤œমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করায় দ্রুত রাস্তাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে পৌরবাসী অভিযোগ করেছেন।
এদিকে জনস্বার্থে প্রতিকার চেয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন তাড়াশ পৌর শহরের থানা পাড়ার মৃত আব্দুল আজিজ তালুকদারের ছেলে মো. রিপন তালুকদার। অনুলিপি দেওয়া হয়েছে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক নুসরাত জাহানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে।লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, রাস্তাগুলোয় ৬ ইঞ্চি ঢালাই দেওয়ার কথা, ৩ ইঞ্চি দেওয়া হয়েছে। ৪ ইঞ্চি পর রড দেওয়ার কথা, ১২ ইঞ্চি পর দেওয়া হয়েছে। রাস্তার প্যালাসাইডিংগুলোয় রডের রিং নেই বললেই চলে। পাথরের কাজ করা হয়েছে রিজেক্ট পাথর দিয়ে। ডব্লিউ বিম করা হয়েছে মাটি ও খোয়া দিয়ে। ব্যবহার করা হয়েছে অতি নিম্নমানের ইট-খোয়া।
তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে কংক্রিটের প্রসারণ, সংকোচন সামঞ্জস্য করতে ও ফাটল রোধ করতে আরসিসি রাস্তার মাঝে গ্যাপ বা জয়েন্ট রাখতে হয়। গ্যাপ বা জয়েন্ট রাখলে গরমকালে রাস্তা ফুলে ওঠা বা ফেটে যাওয়া প্রতিরোধ করে ও রাস্তা টেকসই রাখে। ১৭টি রাস্তার কোথাও গ্যাপ বা জয়েন্ট রাখা হয়নি। রিং কাঠামোগত শক্তি বৃদ্ধি, মাটির চাপ প্রতিরোধ, গাইড ওয়ালের সমান্তরাল বিন্যাস ও স্থায়িত্ব বজায় রাখার জন্য ব্যবহার করা হয় ডায়াফ্রাম ওয়াল বা গাইডেড স্ট্রাকচার নির্মাণ। অথচ গাইড ওয়ালে রিং দেওয়া হয়নি। গাইড ওয়ালগুলোয় ১২ মিলি রড দেওয়ার কথা। কোন গাইড ওয়ালে রড দেওয়া হয়নি। গাইড ওয়ালের পিলারগুলোয় ফাটল ধরে ধ্বসে পড়ার অবস্থা। প্রতিটি রাস্তায় সাইনবোর্ড দেওয়ার কথা কোথাও সাইনবোর্ড নেই। দৃশ্যত যেনতেনভাবে রাস্তাগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। কারচুপি আড়াল করতেই তথ্য সম্বলিত সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি।অভিযোগ পত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, “ তাড়াশ পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মুকুল হোসেন স্থানীয় ঠিকাদার এস এস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সোহাগ রানার সাথে যোগসাজশ করে রাস্তা নির্মাণের বরাদ্দকৃত অর্থের বেশিরভাগ আত্মসাৎ করেছেন। এক্ষেত্রে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক নুসরাত জাহানের ভূমিকাও পৌরবাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা তার অনুমোদন সাপেক্ষেই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। তাই তার জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌর এলাকার খুটিগাছা রাস্তার ডব্লিউ বিম ধ্বসে গেছে। ভাদাশ পশ্চিম পাড়া রাস্তায় বাঁশের খুঁটি পুঁতে রাস্তার ধ্বস ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কহিত আম্বারিয়া রাস্তায় গাইড ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তার দুই পাশের বেশ খানিকটা জায়গা বাদ রেখে। রাস্তাগুলো কোথাও প্রসস্থ, কোথাও সরু। বিশেষ করে সবগুলো রাস্তার দুই পাশের ডব্লিউ বিমে ফাটল ধরেছে।পৌর এলাকার খুটিগাছা গ্রামের আব্দুল খালেক বলেন, খুটিগাছা রাস্তা নির্মাণের দেড় মাস হতেই ডব্লিউ বিম ধ্বসে পড়ে। পুরো রাস্তা জুড়ে ডব্লিউ বিমে ফাটল ধরেছে। এ রাস্তা এক বছরও টিকবে না। ভাদাশ গ্রামের ছাইফুল ইসলাম বলেন, পুরো রাস্তায় ভাঙন। বাঁশের খুঁটি পুঁতে রাস্তার ধ্বস ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কহিত গ্রামের রোজিনা খাতুন নামে একজন গৃহবধূ বলেন, ঈদের আগের দিন গাইড ওয়াল নির্মাণ করে গেছে। মাঝে এক দিন যেতে না যেতেই গাইড ওয়ালের সবগুলো পিলারে ফাটল ধরেছে। যে কোন সময় ধ্বসে পড়বে।
অপরদিকে উপজেলা নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক আবদুর রাজ্জাক রাজু বলেন, গ শ্রেণির তাড়াশ পৌরসভা ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত। নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এত বছরেও পৌরবাসীর নূন্যতম নাগরিক সেবা দান নিশ্চিত করতে পারেননি পৌর কর্তৃপক্ষ। নেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খেলার মাঠ, বিনোদন কেন্দ্র, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি গ্যারেজ, অটোভ্যান গ্যারেজ। নাগরিকদের নিয়মিত কর পরিশোধের বিপরীতে কাঙ্খিত সেবা নিশ্চিত করাই পৌর কর্তৃপক্ষের বড় চ্যালেঞ্জ। বরং এ পৌরসভাটি দিন দিন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অভিযোগকারী মো. রিপন তালুকদার বলেন, রাস্তা নির্মাণ কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। আমি ঘুরে-ঘুরে দেখেছি। যেভাবে রাস্তাগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, এক বছরও টিকবে না। জনস্বার্থ রক্ষায় বাধ্য হয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছি। তাড়াশ পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মুকুল হোসেন বলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়। রাস্তার নির্মাণ কাজ এখনও চলমান। বস্তুত সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৬টি রাস্তার নির্মাণ কাজ হয়ে গেছে। তাড়াশ কেন্দ্রীয় কবরস্থান পুকুর পাড়ের রাস্তার কাজ এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তাড়াশ পৌরসভার হিসাবরক্ষক মো. রাকিব হোসেন বলেন, ১৬টি রাস্তার পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে। তাড়াশ কেন্দ্রীয় কবরস্থান পুকুর পাড়ের রাস্তার কিছু টাকা ব্যাংকে রয়ে গেছে।
ঠিকাদার এস এস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সোহাগ রানা বলেন, রাস্তা নির্মাণে কোন অনিয়ম হয়নি। তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক নুসরাত জাহান বলেন, আমাকে তালিকা পাঠান। আগে রাস্তাগুলো দেখি। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এসব রাস্তার কাজ না দেখে তিনি বিল দিলেন কীভাবে? এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম সাপ্তাহিক চলনবিল বার্তাকে বলেন, অভিযোগ পত্র পেয়েছি। আমরা এখন তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD