আবদুর রাজ্জাক রাজু
বহু দিন হলো মনে স্বস্তি পাই না। মর্ম জ্বালায় পুড়ে ছারখার হয়ে যায় বুকের ভেতর। এ কি দেখছি চার পাশে। সবাই মুসলিম। ইসলাম তাদের ধর্ম। মহানবী (স.) তাদের পথ প্রদর্শক। কোরআন তাদের জীবন বিধান। অসংখ্য হাদিস তাদের নীতি নৈতিকতার চিরন্তন বাণী। পৃথিবীতে এই একমাত্র ধর্ম যার শাব্দিক অর্থ শান্তি। মুসলিম মানে আল্লাহর পানে সমর্পিত, অনুগত। যারা সর্ব প্রথম এই পৃথিবীর সভ্যতার সূত্রপাত ঘটিয়েছে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে আলোকিত করেছে বিশ্ব। আজ তারা জঙ্গীবাদ,সন্ত্রাসবাদ ইত্যাকার নানা কলুষিত অভিধায় বিশ্বে নিন্দিত হচ্ছে। খোদ এই বাংলাদেশ। ৯৫ ভাগ মুসলিমের যেখানে বসবাস, সেখানে নারী নির্যাতন, নারী-শিশু ধর্ষণ, খুন ইত্যাকার নিত্য দিনের ঘটনা। যেন খুন ধর্ষণের মহামারী চলছে দেশে। মনে হয় প্রতি মুহুর্তের কুচর্চা এটা। শুনতে শুনতে, পড়তে পড়তে নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন ছুড়ে দিই, এটা কি সত্যি কোনো মুসলিমের দেশ? আমার হিন্দু ও খিষ্টান বন্ধুরা বলেন- নারীদের ওপর যত নিপীড়ণ চলছে তার সবই প্রায় মুসলিমের কাজ। এই নারী ধর্ষণ ও হত্যা মুসলিম ভিন্ন অন্য জাতি সম্প্রদায়ের মানুষের দ্বারা অধিক হচ্ছে তা প্রমাণ করা কঠিন বলে দাবী করেছেন তারা। এ ক্ষেত্রে প্রায় শতভাগ জড়িত মুসলিমরাই। তাহলে এটা কি মুসলিমদের অধপতনের ইঙ্গিত, লক্ষণ অথবা সংকেত দিচ্ছে !
যে ধর্ম নারীকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে সর্ব প্রথম। নারীকে দাসত্বের শৃংখল ও শুধু উপভোগের সামগ্রী করার অমানবিকতা থেকে উদ্ধার করেছে যে ইসলাম। যে ধর্মে বহু নারী এমনকি আলাøহর তরফ থেকে বিশেষভাবে মনোনীত। মায়ের উচ্চমান ও সর্বোচ্চ মর্যাদা আমাদের ধর্মীয় বিধানে স্বীকৃত। মানবজাতির হেদায়েতের বাণী আল কোরআনের একটি সূরাও আছে মহীয়সী নারী “মারইয়ামের” নামে । মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেস্ত। সৃষ্টির কাহিনিতে বলা হয়েছে- মূলত: সঙ্গহীন নিরানন্দ আদমকে শান্তি ও স্বস্তি দিতেই আল্লাহ তায়ালা মা হাওয়াকে সৃষ্টি করেন। যেখানে প্রেম,ভালবাসা, প্রীতি ও মধুময়তা নারী পুরুষের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য। এভাবে নারীকে নানারূপে মহিমান্বিত করা হয়েছে। সেই ইসলামের অনুসারী মুসলমান এসব করছে কি? তারা অম্লীলতার প্লাবনে নিজেদেরকে ডুবিয়ে দিচ্ছে। এটা দু:সহনীয় যে, আজকাল আলেম ওলামা ব্যক্তিরাও নারী ধর্ষণ ও খুনের দায়ে অভিযুক্ত। যে কথা মুখে বলাও পাপ- তা বাস্তবে ঘটছে অহরহ। এটা কি আবার কোন অন্ধকার যুগের বা কেয়ামত আগমনের লক্ষণ কি না। এটা কি মানবজাতি কিংবা মুসলিমের চুড়ান্ত অবনতি তথা ধ্বংসের ইঙ্গিতবাহী। এসব দেখে শুনে আমরা বেঁচে থাকি কী করে। এই অবনতিশীল প্রবণতা অসুস্থ এবং নেতিবাচক সমাজ মানসের পরিচয় বহন করে। আজকে নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতে দ্বিধা-সংকোচে পড়ে যাই। কীভাবে আবারো ¯্রষ্টাকে গভীর কৃতজ্ঞতা জানাবো যে, তিনি আমাদেরকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ আর ধর্মের শ্রেষ্ঠ ইসলামে শামিল হওয়ার তাওফিক দিয়েছেন। তাই যদি হবে ,তবে আমরা এমন নির্লজ্জ জঘন্য কাজ করছি কী করে? সে জন্যই কবি নজরুল বুুঝি এসব দেখেশুনে তাঁর জনপ্রিয় এক গানে বলেছেন:
“পাঠাও বেহেশত হতে হযরত
কোন সাম্যেরও বাণী
আর দেখিতে পারি না মানুষে মানুষে
এই হীন হানাহানি।”
বর্তমানের অশান্ত পৃথিবীতে নজরুলের এই গানের কথা যেন এখনও জীবন্ত সত্য ও জলন্ত বাস্তব প্রতিধ্বনিত। আমরা জিহাদের কথা বলি। আমার মনে হয় আমাদের এই ইন্দ্রিয় অধপতনের তথা কুরুচির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করতে হবে। বাংলাদেশ জঙ্গী-সন্ত্রাস দমনে সাফল্য পেয়েছে। মাদক নির্মূলে সরকার জিরো টলারেন্স দেখিয়েছে। তেমনি খুন ধর্ষণের বিরুদ্ধে এবার সামাজিক আন্দোলন শুধু নয় বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। কেননা, ইয়াবা কিংবা মাদক খুন-ধর্ষণের ঘটনাকে আরো ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এমনি চলতে থাকলে তা রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন,দেশ ও জাতির জন্য ব্যর্থতার পরিচায়ক। এটা অকার্যকর রাষ্ট্রের আলামত। বিশ্বে আমাদের মাথাকে নিচু করে দিচ্ছে এই নীচতার ও হীনতার কাজ। এটা কি মানবের দেশ না দানবের দেশ ? অনুরুপ এটা মানুষের জগত না পশুর জগত? কথায় কথায় পাশ্চাত্যের মুক্ত সমাজ ব্যবস্থার আমরা নিকুচি করি। বলে থাকি, সেজন্যই পৃথিবীতে এইডসের প্রাদুর্ভাব। কিন্তু সেখানে তো নারী-পুরুষ জোড়পূর্বক মেলামেশার কোন পাশবিক ঘটনা বিরল।এমন অশিষ্ট, গর্হিত, নির্লজ্জ কর্মকান্ড সেখানে খুব কম।পক্ষান্তরে আমাদের দেশে নারী-শিশুদের শুধু সামাজিক নিরাপত্তা নয় , কোনো নিরাপত্তাই নাই। তাদের জীবন ও সম্ভ্রম যেন মূল্যহীন। মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় হলে সে সমাজে এমনটাই হয়ে থাকে। নৈতিকতার পতন যেন আমাদের দেশে করোনার চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে দিন দিন। এ পরিস্থিতি একটি দেশ,সমাজ ও জাতীর জন্য অত্যন্ত কলংকজনক। আমাদের সকল অর্জন,গৌরব ও কীর্তিকে ম্লান করে দেয়ার জন্য এ ব্যাধি যথেষ্ট। এটা আমাদের সমাজদেহে ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে যাচ্ছে।
আধুনিক সভ্য গণতান্ত্রিক একটি দেশে এই অন্যায়, অবিচার ও মানবতাবিরোধী কাজকারবার আর একটুও চলতে দেয়া যায় না। আর দেরি নয় । এটাকে এখুনি থামাতে হবে। কেউ কেউ বলছে , এ দায়িত্ব আমাদের দেশের এলিট বাহিনি র্যাবকে দেয়া যেতে পারে। তারা বহু অসামাজিক ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ড দমনে সফলতা দেখিয়েছে। অতএব ধর্ষণকারী ও খুনিদের নির্মূলকরণে র্যাবকে কাজে লাগাবার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। আমাদের সিভিল প্রশাসন, আইন,বিচার সব কিছু যদি এই সামাজিক ব্যাধি রুখতে ব্যর্থ হয় তবে বিকল্প চিন্তা করাই উত্তম। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও তৎপরবর্তী সকল অর্জন ম্লান ও নিস্প্রভ হয়ে যাচ্ছে এই কলংকজনক অধ্যায়ের কারণে। তবে বড় কথা, যে কোনো মূল্যেই হোক আমাদের মরণপণ লড়াই শুরু করতে হবে এই নির্লজ্জ সামাজিক অপরাধপ্রবণতা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করতে। কারণ ইসলাম ও মুসলিমের নামে এই কলংক কিছুতেই বরদাশত করা যায় না। যখন এই লেখা তেরী করেছি তখনো পত্রিকার পাতায় দেখলাম “ শতবর্ষী বৃদ্ধা ধর্ষণ-আমরা যাচ্ছি কোথায় ?” আর প্রতিদিনিই পত্র পত্রিকার পাতায় এধরনের খবর ছাপা হচ্ছে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ও সিলেটের এমসিসি কলেজের সর্বসাম্প্রতিক ঘটনা নিত্যদিনের ধারাবাহিক চিত্র বিশেষ, বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এমনকি সারাদেশে আলোড়ন জাগানো আমাদের তাড়াশের উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে রূপা হত্যার বিচার আজো ঝুলে আছে। প্রতি মুহুর্তেই দেশের কোথাও না কোথাও প্রকাশ্যে – অপ্রকাশ্যে , সরবে বা নিরবে ঘটে চলেছে এই পাশবিক ও লজ্জাকর অশ্লীল ঘটনা। শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে এর প্রকৃত ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়। অথচ পবিত্র কোরআন শরীফে অশ্লীলতা ও ব্যাভিচারের কাছেও যেতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। তাই আর কিছুতেই বিলম্ব নয়- এই শুদ্ধি অভিযান যত শীঘ্র শুরু ও সফল করা যায় ততই আমাদের দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ। সাবইকে চুপ না থেকে সোচ্চার হতে হবে। কেবলমাত্র আইন-বিচার দিয়ে নয়, তীব্র সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে এই সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করতে হবে। আমাদের সমাজের সব অবক্ষয় রুখতে এবার শুদ্ধাচার কায়েম করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নাই। আবারো শেষ করি নজরুলের সেই বিখ্যাত ইসলামী গানের কথা স্মরণ করে – “আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান, কোথা সে মুসলমান ! .
লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক চলনবিল বার্তা, তাড়াশ , সিরাজগঞ্জ। মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৭৩৯২
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com