গুরুদাসপুরে নিষিদ্ধ জাল ও সরঞ্জাম আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে

Spread the love

গুরুদাসপুরে মতস্য অধিদপ্তরের অভিযানে দেড় কোটি টাকা মুল্যের 

আবুল কালাম আজাদ।।

মাছ  আমাদের অন্যতম জাতীয় সম্পদ এবং প্রধান আমিষ জাতীয় খাদ্য। ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের তথ্য অনুযায়ী  দেশে মোট মাছের উতপাদন ৫১.১১ লক্ষ মে. টন।২০২২ সালের জনশুমারির জনসংখ্যা  হিসেবে  মাথাপিছু  দৈনিক মাছ গ্রহনের পরিমান ৬৭.৮০ গ্রাম। দেশে ১৪ লক্ষ নারী সহ ২ কোটির অধিক অর্থাৎ প্রায় ১২% শতাংশ জনগোষ্ঠি মাছ থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। মাছ ২.৫৮ % শতাংশ আয় জিডিপিতে অবদান রাখছে । কৃষি থেকে জিডিপিতে অবদান রাখছে ২২.০৩৫ শতাংশ এবং মতস্য খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১.৪১ শতাংশ।

“রূপালি মতস্যে স্বনির্ভর দেশ,সবার আগে বাংলাদেশ” প্রতিপাদ্য  সামনে রেখই গত ১৬ আগস্ট থেকে ৩০ আগষ্ট  পর্যন্ত মতস্য ও প্রানিসম্পদ মন্ত্রনালয়ের মতস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে  দেশব্যপী  জাতীয় মতস্য পক্ষ ২০২৬ পালিত হলো প্রতি বছরের ন্যায়। আর গুরুদাসপুরে পালিত হলো ১৬ এথেক ১৮ আগষ্ট ২০২৬  পর্যন্ত।

গত বছর ২০২৫ সালের প্রতিপাদ্য ছিল “ আমিষেই শক্তি, আমিষেই মুক্তি, এবং অভয়াশ্রম গড়ে তুলি , দেশি মাছে দেশ ভরি”। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের  প্রতিপাদ্যের সেই অভয়াশ্রম গুরুদাসপুর তথা চলনবিলে অদ্যাবধি দেশী মাছের সংরক্ষন এবং প্রজনন ও পোনা বৃদ্ধির জন্য একটি অভয়াশ্রমও গড়ে ওঠেনাই। যা আছে যথাযথ সংরক্ষনের অভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে নানা অযুহাতে। অর্থাৎ “কাজীর গরু কাগজে আছে, গোয়ালে নাই “ অবস্থা।

গুরুদাসপুর উপজেলা বিস্তীর্ন চলনবিল অধ্যুসিত হওয়ায় ১০ টি নদি, প্রায় ১৫/২০  টি জলা /খাল এবং সরকারি ৩০/৪০ টি খাস পুকুর ও গাড়ি (  বদ্ধজলাশয় ) বিদ্যমান । যা দিন দিন বৈশ্বিক জলবায়ুর প্রভাব এবং অবৈধ দখল – দুষনে আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে/ যাচ্ছে। নাব্যতা হারিয়ে পানিশুন্যতার কারণে দেশী  মা মাছের প্রজনন ও পোনা বড় হওয়ার সুযোগ কমে গেছে। বর্ষা মওসুমে নিয়মিত বন্যা নাথাকায় স্বল্প বৃষ্টিপাতে  যতসামান্য পানির প্রবাহে  চলনবিলসহ নদী-নালা- খাল-বিলে পানি বাড়লে কিছু মা মাছ  পোনা ছাড়লেও নিষিদ্ধ অবৈধ কারান্ট জাল, বাদাই জাল, চায়না দুয়া্রী জাল, সোতি জাল, বানার ঘেড় দিয়ে নির্মম ভাবে  গন হারে মা মাছসহ পোনা মাছ সমূলে নিধন করে নির্বংশ করছে। প্রশাসন মা মাছ ও পোনা মাছ সংরক্ষন ও পোনা মাছ বৃদ্ধিতে নিষিদ্ধ জাল ও সরঞ্জাম দিয়ে মাছ ধরার জন্য মতস্য সংরক্ষন আইনে  ব্যাপক গন সচেতনায়  মাইকে প্রচার, উঠান বৈঠকসহ আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে  থামানো যাচ্ছেনা মুক্ত জলাশয়ে মা মাছ এবং পোনা মাছ নিধনের মহোতসব।

এছাড়া সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়  যা পোনা অবমুক্ত করা হচ্ছে সেগুলোও সাথে সাথেই  নিষিদ্ধ জাল দিয়ে ছেঁকে সাবার করছেন  মতস্যজীবিরা।  এতে শুধুই লসরকারেরর লক্ষ লক্ষ টাকা জলেই ঢালা হচ্ছে কোন কাজেই আসছেনা।

গত   ২০২৫ সালের মতস্য সপ্তাহ  এবং  ২০২৬  সালের সদ্য সমাপ্ত ম্তস্য পক্ষ দুই বছরের মতস্য অধি দপ্তরের তথ্যমতে  বিশ্বে মতস্য উতপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান অভ্যন্তরীন মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরনে  ২য় , তেলাপিয়া  উতপাদনে ৪র্থ-এশিয়ায় ৩য় এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উতপাদনে ৫ম স্থানে। অপরদিকে  মাছ উতপাদনে রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার মধ্যে নাটোর জেলা ১ম । আবার নাটোর  জ্রলার মধ্যে  সিংড়া  উপজলা প্রথম এবং গুরুদাসপুর উপজেলা ২য় স্থানে ।  কিন্তু যদি নাব্যতা হারানো নোদী-নালা খাল-বিল, সরকারি পুকুর, অভয়াশ্রম,খাস জলাশয় দখলমূক্ত করে পুনঃখনন , পরিমিত রাস্যনিক সার- কীটনাশকের ব্যবহা নিশ্চিতকরা এবং অবাধে সর্বনাশা নিশিদ্ধ কারেন্ট জাল, চায়না  দুয়ারো জাল সহ অবৈধ সরঞ্জাম দিয়ে মা মাছ ও পোনামাছ নিধন নিয়ন্ত্রন করা যায় তাহলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরী(ন মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরনে ১ম স্থানেই থাকতে পারতো অবশ্যই।  এতে মতস্য ও মতস্যজাত পন্য অভ্যন্তরীন চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বিশাল অংকের বৈদাশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

সেই লক্ষ্য অর্জনের লক্ষ্যে মতস্য অধিদপ্ত্রের উদ্যোগে  বিভিন্ন ভাবে সেক্টর ভিত্তিক গন সচেতনা বৃদ্ধির পাশাপাশি কঠোরভাবে আইনী ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু মতস্যজীবিরা  আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হয়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায়  নিজস্ব আর্থিক ক্ষতি দিয়েও জাতীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি করে  মা মাছ  ,পোনা মাছ নির্মম ভাবে নিধন করছেন।

মুক্ত জলাশয়ের মা মাছের নিরাপদ প্রজনন এবং পোনা মাছের  নিরাপদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারা দেশের ন্যায় মতস্য ভান্ডার চলনবিল অধ্যুসিত গুরুদাসপুর, নাটোর সদর , নলডাংগা, বড়াইগ্রাম ,সিংড়া, তাড়াশ   চাটমোহর , বনারি নগর ফরিদপুরএবং ভাংগুড়া  উপজেলা মতস্য অদিদপ্তরের উদ্যোগে নিয়মিত ভাবে প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বিভাগের সহায়তায় বর্ষা মৌসুমে যৌথ  অভিযান চালিয়ে প্রতি দিনই লক্ষ লক্ষ টাকা  মুল্যের  নিষিদ্ধ অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল, কারেন্ট জাল, সোতি জালো অবকাঠামো ,বাদাই জাল্‌ ম্যাজিক জাল,জব্দ করে আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করছে, জেল জরিমানা করছে,।  অর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শত শত গরিব,দরিদ্র ,দুঃস্থ্য  জেলে /মতস্যজীবী পরিবার। আয়ের একমাত্র সম্বল জাল নৌকা হারিয়ে মহাজনের ঋনেন্র বোঝা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেকে ভিটে মাটি ,সোনা দানা বিক্রী করে সর্বশান্ত হচ্ছে। তারপরও রাত পোহালেই এনজিও মহাজন কাবুলি ওয়ালারা  বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিস্তির  টাকার জন্য চাপ দিচ্ছেন। কিস্তির টাকা দিতে না পারায় ঘর তালা দিয়ে পরিরের সবাই বাড়ি ছেড় উধাও হচ্ছে।  এত কিছুর পরও  থেমে নাই অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরা। আবারো এনজিও এবং মহাজনের কাছ থেকে চড়া  সুদে ঋন নিয়ে জাল কিনে আইন শৃংখলা বাহিনী এবং প্রসাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে  এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতেদের ম্যানেজ করে  রাতের আঁধারে মাছ  ধরছে চোরের মত। জানা যায় সংশ্লিষত প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীকেও ম্যানেজ করে মাছ দ্ধরছে। এতে মোটা অংকের মাসোহারা গুনতে হয়।  সব মিলে বেড়ায় ক্ষেত খাচ্ছে।

এব্যাপারে  নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা  সিনিয়র মতস্য কর্মকর্তা  বাবু রতন চন্দ্র  সাহা  এ প্রতিবেদককে জানান,২০২৫-২০২৬ সালে  মতস্য সংরক্ষন আইনে অভিযান চালিয়ে দেড় কোটি টাকা মূল্যের নিষিদ্ধ অবৈধ  জাল   ও সরঞ্জাম, জব্দ করে আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে। মতস্য কর্মকর্তা জানান, গত অর্থ বছরে উপজেলার আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানি।বেশানী, হরদমা ,কাটাগাংসহ চলনবিলে মোট ২৭ টি অভিযানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৫০ লাখ টাকা মুল্যের  ৯৩ হাজার মিটার কারেন্ট জাল, ৬০ লাখ টাকা মূল্যের ১হাজার ৫০০ টি চায়না দুয়ারী জাল, ১২ লাখ টাকা মূল্যের  ৬ টি সোতি জাল ) কাঠামো, আফ্রিকান ম্রাক্ষুসি মাগুর ৩০ টি এবং মাছ ধরার  বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম  ২ টি । এব্যাপারে মোবাইল  নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পরিচালিত মোবাইল কোর্টে ৫৮৪ টি মামলা দায়ের হয়েছে। তিনি জানান গুরুদাসপুর উপজেলায়  নিবন্ধিত মতস্যজীবির সংখ্যা ২ হাজার ৬৬৫ জন। নিবন্ধিতর  বাইরেও আছে প্রায় ৩ হাজার মতস্যজীবি। যারা কৃষি কাজের পাশাপাশি পারটাইম মাছ ধরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

নাটোর সদর উপজেলা  সিনিয়র মতস্য অফিসার আবু সাইদ  জানান , মা ও  পোনা মাছ সংরক্ষনে   প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীর যৌথ অভিযানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে  প্রায় ৫০ লাখট টাকা মূল্যের ২,৯০০ মিটার কারেন্টের নিষিদ্ধ কারেন্ট সুতার বাদাই  ও চায়না দুয়ারী জাল,ম্যাজিক জালসহ    নিষিদ্ধ জাল নৌকা  ও মাছ ধরার সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। জালগুলি জনসম্মুখে আগুন দিয়ে  ধ্বংস করা হয়েছে। জব্দকৃত ৪ টি ইঞ্জিন চালিত নৌকা সরকারের নিয়ন্ত্রনে নেওয়া হয়েছে এবং জব্দকরা ২০ কেজি মাছ এতিম খানায় দেওয়া হয়েছে।  এছাড়া ২২ জন নেলেকে  ৭৫ হাজার টাকা জরিমান  এবং মামলা করা হয়েছে।

বড়াইগ্রাম উপজেলার সিনিয়ার মতস্য অফিসার মোবাশ্বির হোসেন জানান, বড়াইগ্রাম উপজেলায় মা মাছ ও পোনা মাছ বৃদ্ধি ও সংরক্ষনে প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর যৌথ অভিযান চালিয়ে জোনাইল বাজারে ব্যবসা কেন্দ্রে ,বিলে ও নদী , খাল থেকে ১ হাজারের অধিক  নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারি জাল , বাদাই জাল, , কারেন্ট জাল ,বানা সহ বিভিন্ন মাছ ধরার সরঞ্জাম জব্দ করে আগুন জ্বালিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।  যার মূল্য প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা হবে।অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান।

মতস্য সংরক্ষনে আইনি পদক্ষেপ:
The Protection and Conservation of Fish Act, 1950 অনুযায়ী নাটোরে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল বা চায়না দুয়ারি জাল উৎপাদন, পরিবহন, বাজারজাতকরণ এবং ব্যবহার সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মৎস্য সংরক্ষণ আইনে আর্থিক জরিমানা  বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।

 # আবুল কালাম আজাদ, প্রধান উপদেষ্টা, ও সাবেক সভাপতি , চলনবিল প্রেসক্লাব, গুরুদাসপুর, নাটোর, ০১৭২৪-০৮৪৯৭৩ , তারিখ- ৭ /৯/২০২৬, সোমবার।

 

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD