চার খলিফার তাকলিদ রেখে চার ইমামের তাকলিদ কেন?

Spread the love
মুফতি খোন্দকার আমিনুল ইসলাম আবদুল্লাহ হাফিযা হুল্লাহ
কখনো কখনো একটি প্রশ্ন খুব সহজভাবে উচ্চারিত হয়, কিন্তু সেই প্রশ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকে বড় একটি ভুল বোঝাবুঝি। তেমনই একটি প্রশ্ন
“আবু বকর সিদ্দীক, উমর ফারুক, উসমান গনী ও আলী মুরতজা রাদিয়াল্লাহু আনহুম তো চার ইমামের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। তাহলে তাঁদের অনুসরণ না করে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ রহমাতুল্লাহি আলাইহিমের অনুসরণ কেন করা হবে?”প্রশ্নটি শুনতে খুবই আকর্ষণীয়। কিন্তু এর উত্তর জানতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে—অনুসরণ বলতে কী বোঝায় এবং মাযহাবের প্রয়োজনই বা কেন?
অনুসরণ মানে ইমামকে নবীর মর্যাদা দেওয়া নয়কোনো ইমামের অনুসরণ করা মানে তাঁকে কুরআন ও সুন্নাহর সমকক্ষ মনে করা নয়। তাঁর কথা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথার ওপরে স্থান দেওয়াও নয়।বরং একজন সাধারণ মানুষ যখন শরিয়তের কোনো জটিল বিষয়ে নিজে সিদ্ধান্ত দেওয়ার যোগ্যতা রাখেন না, তখন একজন যোগ্য আলেম ও মুজতাহিদের কাছে ফিরে গিয়ে তার নির্দেশনা গ্রহণ করেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—“তোমরা যদি না জানো, তাহলে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।” সূরা নাহল, আয়াত ৪৩একজন মানুষ যেমন রোগ হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যান, নিজে চিকিৎসাবিদ্যা না জেনেও তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেন; তেমনি শরিয়তের সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়ে নিজে মুজতাহিদ না হলে যোগ্য ফকিহের কাছে ফিরে যাওয়াই স্বাভাবিক।সুতরাং মাযহাব মানা মানে কুরআন ও সুন্নাহ ছেড়ে কোনো মানুষের মতামত গ্রহণ করা নয়; বরং কুরআন ও সুন্নাহকে সঠিকভাবে বুঝে জীবনে প্রয়োগ করার একটি সুসংবদ্ধ ফিকহি পদ্ধতি অনুসরণ করা।
তাহলে চার খলিফার অনুসরণ কেন নয়?এখানেই প্রশ্নটির আসল উত্তর।আবু বকর সিদ্দীক, উমর ফারুক, উসমান গনী ও আলী মুরতজা রাদিয়াল্লাহু আনহুম ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি এবং উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের মর্যাদা কোনো পরবর্তী যুগের ইমামের সঙ্গে তুলনা করে খাটো করার প্রশ্নই আসে না।বরং তাঁদের ভালোবাসা, সম্মান এবং তাঁদের সুন্নত ও আদর্শ অনুসরণ করা আমাদের দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন—“তোমরা আমার সুন্নত এবং আমার পর হেদায়াতপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নত দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো।”অতএব, খুলাফায়ে রাশেদীনের পথ অনুসরণ করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।কিন্তু এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় বুঝতে হবে।চার খলিফার প্রত্যেকের সমস্ত ফিকহি মতামত একত্র করে তাঁদের নামে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুসংবদ্ধ মাযহাব আমাদের কাছে সংরক্ষিত হয়নি।
অন্যদিকে চার ইমামের ফিকহি মাযহাব পরবর্তী যুগের অসংখ্য আলেমের গবেষণা, সংকলন, ব্যাখ্যা, যাচাই ও চর্চার মাধ্যমে সুসংবদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।এটাই মূল পার্থক্য।তাহলে কি চার ইমাম চার খলিফার চেয়ে বেশি জ্ঞানী?না, কখনোই নয়।বরং এমন তুলনাই সঠিক নয়।
চার খলিফা ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্যপ্রাপ্ত মহান সাহাবি। তাঁদের মর্যাদা, ফজিলত ও দ্বীনের ক্ষেত্রে অবস্থান অনন্য।
আর ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ রহমাতুল্লাহি আলাইহিম ছিলেন পরবর্তী যুগের মহান মুজতাহিদ ও ফকিহ।
তাই দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে—মর্যাদার প্রশ্ন এক বিষয়, আর ফিকহি পদ্ধতির প্রশ্ন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।কোনো সাহাবি একজন পরবর্তী ইমামের চেয়ে মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ হওয়া এবং তাঁর নামে একটি পূর্ণাঙ্গ মাযহাব প্রতিষ্ঠিত থাকা—এই দুটি বিষয় এক নয়।
চার ইমামের মাযহাব কী দিয়েছে?চার ইমাম নিজেদের পক্ষ থেকে কোনো নতুন ধর্ম তৈরি করেননি।তাঁরা কুরআন, হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্য ও আমল, তাবেঈদের ফতোয়া, আরবি ভাষা, শরিয়তের মূলনীতি, ইজমা, কিয়াসসহ বিভিন্ন শরিয়তসম্মত দলিল ও নীতিমালা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে মাসআলা নির্ণয় করেছেন।পরবর্তী যুগের অসংখ্য মুহাদ্দিস, ফকিহ ও আলেম তাঁদের রেখে যাওয়া ইলমকে সংরক্ষণ, ব্যাখ্যা ও বিস্তৃত করেছেন।ফলে আজ একজন সাধারণ মুসলমান নামাজ, পবিত্রতা, রোজা, যাকাত, হজ, বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ জীবনের অসংখ্য বিষয়ে একটি সুসংবদ্ধ ফিকহি কাঠামো পেয়ে যাচ্ছেন।এটাই মাযহাবের বড় উপকারিতা।মাযহাব কুরআন ও সুন্নাহর বিকল্প নয়; বরং কুরআন ও সুন্নাহ বোঝার একটি সুসংবদ্ধ ইলমি পথ।
তাহলে বিশেষ করে ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহির অনুসরণ কেন?উপমহাদেশে দীর্ঘকাল ধরে বিপুলসংখ্যক মুসলমান হানাফি মাযহাব অনুসরণ করে আসছেন। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইলমি ঐতিহ্য, অসংখ্য ফকিহ, মুহাদ্দিস, মুফতি, মাদরাসা ও গ্রন্থের অবদান।ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন অসাধারণ মেধা, গভীর প্রজ্ঞা ও শক্তিশালী ফিকহি বিচক্ষণতার অধিকারী একজন মহান মুজতাহিদ।তাঁর ফিকহ কুরআন ও সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের ফতোয়া ও আমল এবং শরিয়তের স্বীকৃত মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।বিশেষ করে কুফা ছিল বহু সাহাবায়ে কেরামের ইলমি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাধ্যমে কুফায় যে জ্ঞানধারা গড়ে উঠেছিল, তা পরবর্তী সময়ে তাবেঈ ও ফকিহদের মাধ্যমে বিকশিত হয় এবং ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহির ফিকহি মাদরাসায় সুসংবদ্ধ রূপ লাভ করে।
তবে একথা বলা ঠিক হবে না যে, ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে পৃথিবীর সব সাহাবির সব ফতোয়া পৌঁছে গিয়েছিল। এমন সর্বব্যাপী দাবি ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা কঠিন।“আমি ইলমের শহর, আলী তার দরজা”—এই বর্ণনার ব্যাপারে সতর্কতাএকটি বহুল প্রচলিত বর্ণনা হলো—“আমি ইলমের শহর এবং আলী তার দরজা; যে ব্যক্তি শহরে প্রবেশ করতে চায়, সে যেন দরজা দিয়ে আসে।”এই বর্ণনাটি কিছু হাদিসের গ্রন্থে পাওয়া যায়। তবে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ এটিকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন, আবার কেউ দুর্বল বলেছেন।তাই এই একটি বিতর্কিত বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে “ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহির অনুসরণ করতেই হবে”—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সঠিক পদ্ধতি নয়।হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর মর্যাদা ও ইলমের গভীরতা প্রমাণ করার জন্য বিতর্কিত কোনো বর্ণনার প্রয়োজনও নেই।
তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই, জামাতা, মহান সাহাবি এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের চতুর্থ খলিফা। তাঁর মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত।ইমামরা সাহাবিদের প্রতিদ্বন্দ্বী নন, বরং তাঁদের জ্ঞানধারার উত্তরসূরি এখানেই রয়েছে সবচেয়ে সুন্দর সত্যটি।ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি সাহাবায়ে কেরামের বিপরীতে দাঁড়াননি; বরং তাঁদের জ্ঞানধারার উত্তরসূরি ছিলেন।ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি মদিনার ইলমি ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন।ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি কুফার সাহাবি ও তাবেঈনভিত্তিক ইলমি ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়েছেন।ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি দলিল ও ফিকহের মূলনীতিকে আরও সুসংবদ্ধ করেছেন।ইমাম আহমদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি হাদিস ও সুন্নাহ সংরক্ষণে অসাধারণ অবদান রেখেছেন।চার ইমামের পথ চারটি আলাদা ধর্ম নয়; বরং একই কুরআন ও একই রাসুলের সুন্নাহ বোঝার চারটি সুপ্রতিষ্ঠিত ফিকহি ধারা।তাই প্রশ্নটি “চার খলিফা না চার ইমাম”—এভাবে নয় এটা চার খলিফা বনাম চার ইমামের বিষয় নয়।
বরং সত্যটি হলো—খুলাফায়ে রাশেদীন আমাদের অনুসরণীয়।সাহাবায়ে কেরাম আমাদের অনুসরণীয়।কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের মূল উৎস।
আর চার মাযহাব সেই কুরআন ও সুন্নাহ থেকে ফিকহি মাসআলা বোঝার সুপ্রতিষ্ঠিত ইলমি পথ।একজন সাধারণ মুসলমান যদি নিজে কুরআন-হাদিসের সনদ, হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা, পরস্পরবিরোধী দলিলের সমন্বয়, রহিত ও রহিতকারী বিধান, সাধারণ ও বিশেষ বিধান, সাহাবায়ে কেরামের মতামত এবং ফিকহের জটিল মূলনীতি যাচাই করার যোগ্যতা না রাখেন, তাহলে তিনি কীভাবে নিজেই প্রতিটি মাসআলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন?
তাই আল্লাহ তাআলা বলেছেন—“তোমরা যদি না জানো, জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো।” শেষ কথামাযহাবের অনুসরণ যেন অন্ধ দলাদলিতে পরিণত না হয়—এটিও মনে রাখতে হবে।কোনো মহান ইমামই বলেননি—“আমার কথা কুরআন ও সুন্নাহর ওপরে।”বরং তাঁরা নিজেদের বক্তব্যকে কুরআন ও সুন্নাহর অধীনেই রেখেছেন।তাঁদের অনুসরণ মানে তাঁদের নবীর মর্যাদা দেওয়া নয়; বরং তাঁদের গভীর ইলম, গবেষণা ও ফিকহি প্রজ্ঞার মাধ্যমে কুরআন ও সুন্নাহ বোঝার পথ অনুসরণ করা।তাই কোনো হানাফি যেন মালিকি, শাফেয়ী বা হাম্বলি মুসলমানকে তুচ্ছ না করেন। আবার কোনো মাযহাব অনুসরণকারীকে “কুরআন-হাদিস মানে না”—এমন অপবাদও দেওয়া উচিত নয়।মাযহাব নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু মাযহাবের ইমামদের সম্মান নিয়ে মুসলমানের হৃদয়ে বিদ্বেষ থাকা উচিত নয়।মনে রাখতে হবে—আমাদের ইমাম চারজন, কিন্তু আমাদের নবী একজন।আমাদের মাযহাব চারটি, কিন্তু আমাদের কুরআন একটি।আমাদের ফিকহি মতের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের কিবলা এক।আমাদের ব্যাখ্যার পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের রব এক।অতএব, চার খলিফায়ে রাশেদীনের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেই চার ইমামের ফিকহি অনুসরণ করা যায়। এতে কোনো বিরোধ নেই।বরং সত্যিকারের ভালোবাসা হলো—সাহাবায়ে কেরামকে ভালোবাসা, ইমামদের সম্মান করা, কুরআনকে আঁকড়ে ধরা এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহকে জীবনের আলো বানানো।কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো ইমামের কাছে আমাদের ফিরে যাওয়া নয়—আমাদের সবাইকে ফিরে যেতে হবে সেই মহান রাসুলের সুন্নাহর কাছেই, যাঁর উম্মত হওয়ার সৌভাগ্যই আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মতের ভিন্নতার মধ্যেও সত্যকে বোঝার, আলেমদের সম্মান করার এবং কুরআন ও সুন্নাহর ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক দাঈ ও গবেষক 
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD