মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিকথা
(৯ম পর্ব)
আবদুর রাজ্জাক রাজু
মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী সেনাদের পরেই কুকর্মে ও অপকর্মে যারা শতভাগ লিপ্ত ছিল তাদেরকেই বলা হয় রাজাকার। এদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করত স্থানীয় শান্তি কমিটি এবং স্বাধীনতা বিরোধী শিবিরের পদলেহী ব্যক্তিরা। পাকসেনাদেরও এক নম্বর দোসর ছিল এই রাজাকার বাহিনী। হানাদারবাহিনী যেখানেই অপারেশনে যেত, সাথে ঢাল হিসেবে রাজাকার থাকত তাদের অগ্রভাগে। কারণ রাজাকার গড়ে তোলা হয়েছিল স্থানীয় তরুণ যুবকদের নিয়ে। মূলত রাজাকাররা ছিল স্বাধীনতার ঘোর শত্রু। তাদেরকে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে এবং তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছিল এবং সেভাবেই তালিম দেয়া হয়েছিল। এরা যা ইচ্ছে তাই করত। ধর্মের নামাবলী গায়ে পরে যত অধর্ম এবং গর্হিত কর্ম এরা করে গেছে অবলীলাক্রমে তার কোন পরিসীমা নেই। নৈরাজ্যের চরম পরাকাষ্ঠায় ওরা মানুষকে মানুষ মনে করত না। তাদের ক্ষমতা ছিল অপরিসীম, নিরংকুশ। ফলে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি দাপট ও দৌরাত্মের কোন সীমা ছিল না। তাড়াশে সম্ভবত মুক্তিবাহিনী গঠনের পূর্বেই রাজাকারের প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে শুধু তাড়াশে নয় , সাড়া দেশেই এই কুখ্যাত বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল যার শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক জামায়াত ও শান্তি কমিটির কেন্দ্রীয় নেতারা।
তাড়াশ থানায় সেসময় রাজাকারদের ঘাঁটি বলে পরিচিতি ছিল বারুহাস ইউনিয়নের উত্তরাঞ্চলীয় গ্রাম বস্তুল। এ গ্রামেরই বিরাট আলেম ব্যক্তিত্ব মাওলানা মফিজ উদ্দিন মাদানী সাহেব স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরুদ্ধে আঞ্চলিকভাবে বিশাল নেতৃত্ব দেন। অবশ্য এটা ছিল তার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাড়ী অর্থাৎ শ^শুর বাড়ী। তার আরেক স্ত্রী মানে ১ম স্ত্রীর বাড়ী তথা আরেক শ^শুর বাড়ী ও মাদ্রাসসহ তার কর্মকান্ডের বড় আস্তানা ছিল রায়গঞ্জের পশ্চিম আটঘরিয়ার আক্রা গ্রামে । তাড়াশ-রায়গঞ্জ থানা জুড়ে তারই একচেটিয়া ইন্ধনে ও মদদে প্রথমে থানা পর্যায়ে শান্তি রক্ষা কমিটি গঠিত হয়। পরে শান্তি কমিটির ছত্রছায়ায় জান্তা সরকারের সার্বিক সহায়তায় সৃষ্টি হয় রাজাকার বাহিনী। রাজাকারে নাম লেখায় অধিকাংশ গ্রামীণ অর্ধ, স্বল্প শিক্ষিত ও অশিক্ষিত তরুণ-যুবকেরা। তবে অশিক্ষিত বয়স্ক ব্যক্তিরাও রাজাকার হয়েছিল। তাদের অনেকেই ছিল তৎকালীন মুসলীমলীগ ও শান্তি কমিটির নেতা সদস্যদের আত্মীয় স্বজন। মূলত: মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিহত করতে ও স্বাধীনতা সপক্ষ শক্তিকে দমন পীড়নের উদ্দেশ্যে এদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজাকারদের কোন প্রশিক্ষণ ছিল না। এমনকি সামরিক-বেসামরিক বাহিনীর প্রচলিত বিধিবিধান বা নিয়ম শৃংখলা তথা কমান্ড বলতে কিছুই তাদের জন্য প্রযোজ্য ছিল না। এক কথায় এরা ছিল ক্ষেত বা জঙ্গলের মত অসভ্য, বর্বর। তবে আল বদর ও আলসামস নামধারী রাজাকারের আরেক উর্ধতন অভিজাত সংস্করণ শাখা গঠিত হয়েছিল। তাদের কারো কারো উচ্চতর প্রশিক্ষণ হয়েছিল ঢাকা ও সাভারে তা আমরা তখন শুনেছিলাম। তাড়াশ থেকে এরকম উচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ দু’একজন পেয়েছিল বলে জানা যায়।তারা আবার পরবর্তীতে নামীদামী মানুষে পরিণত হয়ে এমনকি সমাজে অবদান পর্যন্ত রেখে গেছেন বলে মনে করা হয়। রাজাকারের ভোল পাল্টে তারা এরুপ করেছেন বরং অনেক ক্ষেত্রে সাবেক মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগীতায় সেটা ওই রাজাকারদের সৌভাগ্যই বলতে হবে। এমনকি এদের কেউ কেউ দেশের সরকারী চাকুরীতে ঢুকে বৈধ-অবৈধ অর্থ বিত্ত কামিয়ে বিপুল সহায়-সম্পদের মালিক বনেছেন। এ নিয়ে এ নিবদ্ধ লেখক গোড়া থেকে সচেতন দৃষ্টি রাখলেও তাড়াশের কারো কোন মন্তব্য কিংবা আপত্তি তুলতে দেখা যায় নি। বরং রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মধ্যে দহরম-মহরম, সখ্যতা ও মিতালী দেখে চোখ ছানাবড়া হত তথা বিস্ময় লাগতো এই ভেবে যে, কীভাবে মুক্তিযোদ্ধারা সহসাই ভুলে গেল স্বাধীনতার বিপক্ষে রাজাকারদের ন্যাক্কারজনক ভূমিকার কথা। সব কিছু ভুলে এতবড় শত্রুপক্ষকে মাত্র অল্প সময়ের ব্যবধানে একান্ত আপন করে কাছে টেনে নিতে তাদের বিবেকে বাধলো না সেটাই বিস্ময়ের ব্যাপার। কেননা তারা তো চিরকালই দেশ ও জাতির শত্রু যাদের কোনদিন ক্ষমা করা যায় না। তাড়াশ সদরের এমন রাজাকারদের একজনকে আমি জানি (সকলেরই চেনা) যিনি গত বছর সরকারীভাবে রাজাকারদের তালিকা প্রকাশের কথা শুনে খুব ঘাবরে-মুসরে পড়েছিলেন এবং দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তিনি অবশ্য প্রয়াত। কোন ভাষায়, বর্ণনাতেই তাদের পৈশ্চাচিক কর্মকান্ডের আসল চিত্র তুলে ধরা বাস্তবিকই কঠিন।
আগেই বলেছি, তৎকালে তাড়াশ থানায় রাজাকারদের উৎপত্তিস্থল বস্তুল গ্রামের কালাম ও মজদার ছিল রাজাকারদের কুখ্যাত শীর্ষ দুই নেতা। ওরা ছিল মাওলানা মাদানীর ঘনিষ্ঠজন। মজদার ও কালাম উভয়ে ফুটবল খেলার সূত্রে পূর্বে থেকেই এলাকায় সুপরিচিত ছিল। বিশেষ করে মজদারের দৈহিক গঠন ও চেহারা ছিল আকর্ষণীয়। মাদানী পরিবারের সন্তান ও পূর্ব পরিচিতি কাজে লাগিয়ে তারা গোটা এলাকায় রাজাকারদের মূর্তিমান গুরু হিসেবে আবির্ভূত হয়। রাজাকারের নেতা বিবেচনায় তাদের নাম ছিল মানুষের মুখে মুখে। সেটা সুকীর্তির কারণে নয় , কুকীর্তির জন্য । একই সাথে তারা ছিল ভয় , ত্রাস আর আতংকের অপর নাম। প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল মানুষের নিকট অত্যন্ত নিন্দিত আর ঘৃনিত। কিন্তু জীবনাশংকার ভয়ে কেউ মুখে তা প্রকাশ্যে বলতে পারত না।
তাদের ভূমিকা ছিল সাধারণ রাজাকারদের চেয়ে আরো ভয়ংকর এবং উগ্র হিং¯্রতা পূর্ণ। মাদানীর আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে তারা একচ্ছত্র শক্তি ও কুকীর্তির মহা বলয় তৈরী করেছিল। তাদের নাম শুনলে মানুষ ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে পড়ত। রাজাকারদের সাক্ষাৎ দেবতা হিসেবে তাদের ভাবমূর্তি সৃষ্টি করা হয়েছিল। স্বাধীনতার সময় কালাম মারা পড়লেও মজদার স্বাধীনতার পর ঢাকায় বিয়ে করে পরে সৌদি আরব চলে যায় এবং সম্ভবত সেখানেই সে আস্তানা গেড়ে লুকিয়ে আছে বলে জানা যায়। তাড়াশ অঞ্চলের বেশীরভাগ রাজাকার ছিল এই বস্তুলল গ্রাম থেকে। এছাড়া বৈদ্যনাথপুর, পেঙ্গুয়ারী,বিনসাড়া, তাড়াশ, ভাদাশসহ থানার বিভিন্ন গ্রাম থেকে রাজাকারে অনেক লোক ভর্তি করা হয়েছিল। তারা পুলিশী খাঁকি পোশাক পড়ত। হাতে থাকতো রাইফেল ও দেশী বন্দুক। লাঠি-ফলাসহ দেশীয় অস্ত্রও তারা ব্যবহার করত। বাস্তবে ওরা মুক্তিযোদ্ধাদের টিকিটিও ছুঁতে পারতো না। এ কারণে দিনে রাতে গ্রামে গ্রামে গিয়ে সাধারণ নিরীহ মানুষের ওপর নানা রকম অত্যাচার-নিপীড়ন চালাতো। এদের লক্ষ্য ছিল লুটতরাজ,দস্যুবৃত্তি এমনকি নারীদের ইজ্জত ধ্বংস করা। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণে তারা পাক বাহিনীকে সহায়তা করেছে অগ্রভাগে থেকে। শান্তি কমিটির সদস্য ছাড়াও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাকবাহিনীকে গ্রামাঞ্চলে ঢুকতে এবং যাবতীয় অমানবিক ও নিষ্ঠুরতামূলক কর্মকান্ড পরিচালনায় মূখ্য সহায়ক বা দোসর ছিল রাজাকার বাহিনী। পশ্চিমাদের তোষামোদী ও খোষামোদিতে তারা ছিল সদা তৎপড়। শান্তি কমিটি বা পাক সেনার সদস্যরা সন্দেহভাজন অভিযুক্ত লোকজনদের ধরতে ও আটক করতে গ্রামে গ্রামে রাজাকারদের পাঠাতো যমদূত স্বরুপ। এছাড়া তারা সমাজের যাদের সাথে তাদের পূর্ব শত্রুতা বা দ্বন্দ্ব ছিল , রাজাকার হওয়ার সুবাদে তার প্রতিশোধ নিয়েছে নগগ্নভাবে। তাদের হিং¯্র থাবায় অগনিত মানুষের রক্ত ঝরেছে এবং ভিটেমাটি পর্যন্ত হারাতে হয়েছে। রাজাকারদের আরো কিছু কুকর্মের নজির আমি আমার স্মৃতি লেখনীর অন্য পর্বগুলোতেও তুলে ধরেছি। তাতে রাজাকারের হাতে আমি নিজেও কয়েকবার নাজেহাল তথা নাস্তানাবুদের শিকার হওয়ার কথা বর্ণনা করেছি।
সেসময় একবার তাড়াশের বিনসাড়া গ্রামে দু’বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ভগ্নিপতির কাছে শুনলাম, গত রাতে তার সবগুলো খেজুর গাছের রসের হাড়িসহ রস নিয়ে গেছে রাজাকারের দল। শুধু তাই নয়, মানুষের গাছের-বাগানের যত ফলমূল সব জোড়পূর্বক পেড়ে নিয়ে যেত এই দুরাচাররা। জেলেরা মাছ ধরলে সব মাছ তারা কেড়ে নিত। হাটেবাজারে ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে অর্থ-দ্রব্যাদি যা খুশী তারা ছিনিয়ে নিত। মান অপমান ছাড়াও জানমালের ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারত না, সাহস পেত না। নীরব চাঁদাবাজী ছিল তাদের প্রধান পেশা। কতরকম হুমকি ধামকি দিয়ে যে তারা সরল আমজনতার নিকট থেকে অর্থ আদায় করতো তার সীমারেখা ছিল না। রাজাকারের অপ্রতিরোধ্য জুলুম অত্যাচারে বহু মানুষকে আপন ঘরবাড়ী ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। যাদের পরিবার থেকে মুক্তিবাহিনীতে লোক গিয়েছিল কিংবা স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের বহু পরিবারকে তারা ঘরছাড়া হতে বাধ্য করেছিল অথবা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছিল। রাজাকাররা বহু হিন্দু মানুষের বসতবাড়ী ও ধন-সম্পত্তি, জমাজমি ভীতি-হুমকি দেখিয়ে দখল করে রেখেছিল যার অধিকাংশই পরবর্তীতে আর তারা ফেরত দেয়নি। তাছাড়া অনেক হিন্দু শরনার্থী ভারত থেকে আর দেশে ফেরতও আসেনি। আর এটাকেই রাজাকাররা সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। কেননা তারা ছিল সাক্ষাৎ ত্রাস। রাজাকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কোন াউপায় ছিল না। সব ধরনের কুকর্ম ও কুৎসিত কমকার্ন্ড করার জন্য তাদেরকে এক ধরণের দায় মুক্তি দেয়া হয়েছিল। এই রাজাকাররাই পাকবাহিনী কর্তৃক সর্ব প্রথম তাড়াশ সদর অপারেশনের সময় তাড়াশ গ্রামের পশ্চিম পাড়ার চুনিলাল গোসাইকে নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করে তাকে রায়গঞ্জের আক্রা গ্রামে মফিজ উদ্দিন মাদানীর আস্তানায় নিয়ে গিয়ে আবারো অমানুষিক অত্যাচার-নিপীড়নের পর হত্যা করে তার লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয় । অবশ্য পরে তার লাশ তাড়াশে ফেরত আনা হয় বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায় ।
এমনকি নিজ এলাকার নারীদের সম্ভ্রম হানি করতেও তারা দ্বিধা-সংকোচ করত না যা ছিল পাক সেনাদের প্রধান জঘন্য বৈশিষ্ট্য। ইবলিশ শয়তানের জীবন্ত প্রতিমূর্তি ছিল এসব রাজাকার। এরা ছিল মানুষরুপী শয়তান। কিন্তু স্বাধীনতার পরে বহু রাজাকার ভোল পাল্টে খোল নলচে বদলে ফেলেছে। তারা কৌশলে সবচেয়ে নিরাপদস্থল খুঁজে পেয়েছে মুক্তিযোদ্ধা বা স্বাধীনতা যুদ্ধ পক্ষের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে বিয়ে সাদির সূত্রে আত্মীয় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে। এ কাজটা আমাদের রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত তারা সফলভাবে করতে সমর্থ হয়েছে। এমনি করেই পরবর্তীতে স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক দলের লোকেরাও আমাদের দেশ শাসনে ক্ষমতার ভাগীদার হয়েছে যা ছিল আমাদের জন্য বড়ই লজ্জাজনক। এতে করে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের কতককে পাকড়াও বা সাজাশাস্তি দেয়া হলেও অধিকাংশই বেঁচে থেকে জীবন কাটিয়েছে অত্যন্ত নিরাপদে। বলা যায় বীর-গাজী মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়েও রাজাকাদের জীবন কেটেছে ঝামেলাবিহিন নির্ঝনঝাটে যা আজো অকপটে দৃশ্যমান।
পরবর্তীতে তারা বৃহত্তর সমাজের সাথে তেলে জলে মিশে যাওয়ার মত একীভূত হয়ে গেছে। ফলে এত বড় অপরাধযজ্ঞের পরও তাদের গায়ে যে দুস্কর্ম ও দুর্গন্ধের প্রলেপ ছিল এত দিনে নতুন প্রজন্মের কাছে তা আর উপলব্ধি হওয়া সম্ভব নয়। সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করতে গিয়ে আজকে বার বার হোঁচট খাচ্ছে আসল নকল এর গোলক ধাঁধায়। অন্যদিকে জেলা পর্যায়ে রাজাকারদের তালিকা করার কথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিলেও সেভাবে কাজ শুরু হয় নি। তবে আমাদের ধারণা এটা করতেও সরকারী আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় লেজে গোবরে অবস্থা করবে না তা বলা মুশকিল। ওদিকে মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত শীর্ষ জামাত নেতাদের যেভাবে বিচার হয়েছে তা জাতীর জন্য অবশ্যই শান্তনার ও স্বস্তিদায়ক। কিন্তু স্থানীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ে তাদের ধরতে গেলে এবং বিচার করতে গেলে তাতে আরো সমস্যা ও জটিলতা দেখা দিতে পারে। বাড়তে পারে সামাজিক বিভাজন ও বিভক্তি।এমনকি তা পাড়ায় মহল্লায় ভয়াবহ বিষাক্ত অন্তর্দ্বন্দ্বে পরিণত হতে পারে। অনুরুপ সাড়া দেশে রাজাকারের নির্ভূল তালিকা তৈরী করতে ঝামেলা তৈরী হবে- এমনটা সন্দেহ অমূলক নয়। কারণ রাজাকারদের অকেকেই বর্তমানে বেঁচে নেই। যারা জীবিত আছে তারা নানা কৌশলে সমাজে তাদের পাকাপোক্ত আসন গেড়ে বসে আছে যার ইঙ্গিত এ লেখার পূবেই আমি দিয়েছি।
নিবন্ধ শেষে জনৈক রাজাকারের একটা যাদুকরী ধরনের ঘটনা বলি। বর্তমান তাড়াশ ডিগ্রি কলেজের পূর্ব পাশে তৎকালে গৌর-নত্ত্ব ঠাকুরদের জমিদারী বাড়ীর দক্ষিণে রাস্তার ধারে খেজুর গাছের পাশে একটি ইটের নষ্ট কুপ ছিল। জনশ্রুতি ছিল যে, মুক্তিযুদ্ধকালে এ কুপেই দুস্কৃতিকারী ও রাজাকারদের লাশ ফেলা হত। মুক্তিযোদ্ধারা কাজটি করত রাতের বেলা সবার অলক্ষ্যে, অদৃশ্যে। যে কারণে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ পাওয়া কঠিন ছিল। এর মধ্যে আমি কৌতুহল বশত: দু একবার ওখানে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখেছি জনান্তিকে। মরা লাশের গন্ধ পাওয়া যেত তা ঠিক। ফলে উৎসুক্য বেড়ে গেল। একদিন এখানকার প্রতিবেশীদের কাছে লোমহর্ষক এমনি এক ঘটনা শুনলাম। তা ছিল পার্শ্ববর্তী গ্রামের বদনামী এক রাজাকারের মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে পালিয়ে সামান্যর জন্য প্রাণে রক্ষা পাওয়ার গল্প। মুক্তিফৌজেরা বেশ গভীর রাতে তাকে ধরে নিয়ে এসে সেই মরণ কুপের ধারে নিয়ে যায়। উদ্দেশ্য সহজবোধ্য। এসময় রাজাকারটি নানান টালবাহানা করছিল যে, সে একটু পানি খাবে। আবার দু রাকাত নামাজ পড়ে নেবে। মৃত্যু হওয়ার পূর্বে এগুলো তার একান্ত খায়েশ বা ইচ্ছা পূরণের ব্যাপার বলে সে মানবিক আবেদন পেশ করে। শুনে মুক্তিযোদ্ধাদের মন একটু নরম হলো। একজন গেল গ্লাসে পানি আনতে। আরেকজন বদনায় পানি আনতে গেছে ওর ওজুর জন্য। আর একজন মুক্তিফৌজ রাজাকারের পাশ ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে। নিকষ ঘনকৃষ্ণ অন্ধকার রাত। ফৌজদের সতর্ক দৃষ্টির কোন ঘাটতি ছিল না। তারা রাজাকারটির ওপর তীক্ষè নজর রেখে চলেছে। যারা পানি আনতে গেছে তাদের দেরি হচ্ছে বলে প্রহড়ারতরা ওদের ডাকাডাকি করছে চাপা কন্ঠে। কর্তব্যরত ফৌজদের দৃষ্টি ও মনোযোগ একটু অন্যমুখী হতেই রাজাকারটি সুযোগ বুঝে অন্ধকারের মাঝে এমন দ্রুত দৌড়ে পালালো যে মুক্তিফৌজেরা তার হদিস করে আর ধরতে পারলো না। পড়ে জানা গিয়েছিল সে ওখানেই ঠাকুরবাড়ী সংলগ্ন দক্ষিনের হাজরা গাড়ী নামক পুকুরে জলের মধ্যে ডুব মেরে কিছুক্ষণ লুকিয়ে থেকে পরে ফাঁক বুঝে সটকে পড়ে। যাহোক রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে আমার লেখা একটি কবিতা পরিবেশন করে এ লেখার ইতি টানছি।
“রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা”
রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা
তফাত কোথায় আজি
মুক্তিযোদ্ধা করলো বিয়ে
রাজাকার তার কাজি।
আবার রাজাকারের শশুর হলো
মুক্তিযোদ্ধার বাবা
মজা করে সম্পর্ক গড়ে
মারহাবা মারহাবা!
মুক্তিযোদ্ধার তালিকাতে
রাজাকারের নাম
ঢুকলো কত মালের জোরে
চলে ডান আর বাম।
আবার রাজাকারের তালিকাতে
মুক্তিযোদ্ধা গেল
দেশটা স্বাধীন করে এবার
কলংকের ভাগ পেল।
তেলে জলে এমনি করে
মিশে গেল সব
তবু শুনি চর্তুদিকে
“তুই রাজাকার” রব।
মানুষ নামের শয়তান যত
তারাই রাজাকার
তাই এদের না দেয়া উচিৎ
কোন প্রকার ছাড়।
(লেখকের প্রকাশিত কাব্য “প্রতিচ্ছবি”-পৃষ্ঠা-২৫, প্রকাশকাল : ২০১৫)
(এরপর লেখকের ১০ম পর্ব স্মৃতিকথায় চোখ রাখুন)
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com