বাবুল হাসান বকুল
উন্নয়ন এমন একটি শব্দ যার মাধুর্য নির্যাস জীবনে আসুক তা প্রত্যেক মানুষেরই কাম্য। ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-দেশ কিংবা আন্তর্জাতিক সংগঠন সকলের একটাই উদ্দেশ্য, যতই কঠোর পরিশ্রম করতে হোক না কেন উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে হবে। তাই প্রত্যেকে দিন রাত এক করে ফেলছে নিরন্তর কাজের চাপে নিজে বা নিজেদের উন্নয়নের জন্য। অনেকে মনে করেন শুধু পরিশ্রম করলেই উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। পরিশ্রমের পাশাপাশি থাকা প্রয়োজন সুপরিকল্পিত লক্ষ্য, সঠিক সময় নির্ধারণ, পারস্পারিক সহযোগিতা, সঠিক উন্নয়ন করার প্রকৃত ইচ্ছা। আদর্শিক মূল্যবোধের সাথে এগুলোর সমন্বয় ঘটলে তবেই উন্নয়ন ফলপ্রসু হবে। আর একটি কথা মনে রাখতে হবে শুধু উন্নয়ন করলে হবে না তা দীর্ঘস্থায়ী বা টেকসই হবে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। কেননা দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন হতে পারে ব্যক্তি পরিবার সমাজ দেশ গড়ার হাতিয়ার, মূল ভিত্তি। চাটার দল যদি উন্নয়ন খেয়ে ফেলে তাতে জনগণের কী কল্যাণ হতে পারে তা আমাদের দেশের বর্তমান দৃশ্যপটে উপলব্ধি করতে পারি।
আমি আজ আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে কিছু বলতে চলেছি। দেশ উন্নয়ন হোক সবাই চায়, উন্নয়ন চাই বলেই দেশ দ্রুত উন্নত হচ্ছে। আমাদের দেশে অনেক রাজনৈতিক দল রয়েছে। দেশে নির্বাচন আসলেই এই সব রাজনৈতিক দলের নেতারা দেশের কী কী উন্নয়ন করবেন তার লিখিত ফিরিস্তি জনগণের হাতে তুলে দেন। যাকে আমরা নির্বাচনী ইস্তেহার বলি। সংসদ নির্বাচন, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সকল নির্বাচনে একই প্রতিশ্রুতি। যেকোন রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করার পরে দেশ উন্নয়নের জন্য সংসদে অনেক বিল পাশ করেন। দেশ উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট দেন। বাজেট অনুযায়ী রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সহ সকল অবকাঠামোর উন্নয়ন করেন। পাঁচ বছর পরে আবার দেশে নির্বাচন আসে। অন্য দল সরকার গঠন করেন। স্থানীয় সরকারেরও পরিবর্তন ঘটে। ঐ সরকারও দেশ উন্নয়নের বাজেট দেন। পাঁচ বছর আগের তৈরি ছোট বড় রাস্তাঘাট সরকারি, বেসরকারি অবকাঠামো পুনঃ নির্মাণ ও সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে। প্রয়োজন বোধে তারা তা সংস্কার বা তৈরি করে। এভাবে বার বার সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন হয় দেশের অবকাঠামো। আজ বিশ্বে যারা উন্নত দেশ তাদের উন্নতির বড় হাতিয়ার দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন। তাদের উন্নয়নের স্থায়িত্ব আর আমাদের উন্নয়নের স্থায়ীত্বের মধ্যে রাত দিনের ব্যবধান। আমাদের দেশের কোন জনপ্রতিনিধির কিংবা সরকারের দেশের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের ব্যাপারে কোন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা কিংবা পদক্ষেপ নেই। তাই সরকার যায় সরকার আসে কিন্তু উন্নয়ন কাজগুলো বেশী দিন টিকে থাকে না , স্থায়ী হয় না।
স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও আমাদের দেশে রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। যদি দেশে রাস্তাঘাট সহ অবকাঠামোগুলো দীর্ঘস্থায়ীভাবে তৈরি করা হত তাহলে আমাদের দেশ আরও অনেক বেশি এগিয়ে যেত। যদি দেশে নির্মিত অবকাঠামোগুলো ৫০-১০০ বছর দীর্ঘস্থায়ী হতো তাহলে আমাদের দেশে বছরে বছরে কোটি কোটি টাকা নষ্ট হতো না। ঐ টাকা দিয়ে আমরা দেশের অন্য ধরনের উন্নয়ন করতে বা দেখতে পারতাম। আমাদের দেশে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন কল্পনা করলেও তা বাস্তবে রূপ দিতে পারবেন না; কারণ যে দল যখন সরকার গঠন করে তখন সেই দলের নেতা কর্মীরা ঠিকাদারী লাইসেন্স বানিয়ে নিজেরাই রাস্তাঘাট সহ সকল অবকাঠামোর নির্মাণের দায়িত্ব পায়। এতে দেখা যায় তারা নির্মাণ কাজে যা ইচ্ছা তাই করে। এর বিরুদ্ধে কারও কোন অভিযোগ বা কথা বলার থাকে না। আর কথা বলবেই বা কার কাছে। প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারীরা ঐ ঠিকাদারদের সহযোগিতা করে। এতে প্রশাসনের পকেট ভারী হয়ে উঠে। বর্তমানে এমন ভাবে কাজের টেন্ডার দেওয়া হয় সরকারি দলের নেতা-কর্মী তা নিয়ন্ত্রণ করে। মনে হয় দেশের উন্নয়ন মূল কথা নয়। মূল কথা দলীয় নেতা কর্মীকে কোটিপতি বানানো, তাদের ভাগ্য উন্নয়নই সরকারের প্রধান লক্ষ্য । যেসব নির্বাচনী জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের কথা আমরা ভাবি তারা আজ দলের নেতা কর্মীদের টাকার পাহাড় গড়ে দেওয়ার জন্য সব ঘটনা জেনেও না জানার ভান করছে। আর প্রশাসনের দায়িত্বরত ব্যক্তিরাও একই পুকুরের মাছ, পরস্পরে মিলেমিশে খাচ্ছে।
আমাদের দেশে অনেক বড় বড় ঠিকাদারী নির্মাণ প্রতিষ্ঠান আছে। যাদের উপর ভরসা করে দেশের অনেক বড় স্থাপনার কাজ ভালো হবে বলে তাদের দেওয়া হয়। ঐসব প্রতিষ্ঠান শুধু কাজ নিয়েই তারা নিচের প্রতিষ্ঠানকে তা বিক্রি করে দেয় সাব কন্ট্রাক্টে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো আবার স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে যে সবচাইতে কম মূল্যে কাজটি করে দিতে পারবে তাকে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়। এভাবেই একটি কাজকে বার বার জবাই করা হয় এর রক্ত-মাংস মজ্জা চুষে খাওয়ার জন্য। অনিয়ম এবং নৈরাজ্যের মাধ্যমে শুধু নিজেদের প্রয়োজন ও অভিপ্রায় সিদ্ধি করার উদ্দেশ্যে। আমার নিজের দেখা রানা ট্রেডার্স নামে এক ঠিকাদারী প্রতিষ্টান ২০০২-২০০৩ অর্থ বছরে সিংড়ায় একটি পাকা রাস্তা নির্মাণ করে যা এখনও চলাচলের উপযোগী। অথচ আশেপাশের অন্য রাস্তাগুলো ইতোমধ্যে ২-৩ বার সংস্কার বা নির্মাণ করা হয়েছে। ভাল কার করার কারণে আজ হারিয়ে গেছে রানা প্রতিষ্ঠানটি। শুধু ঐ প্রতিষ্ঠান নয় সারা দেশে যারা দেশের উন্নয়নের জন্য সততা ও নৈতিকতা নিয়ে কাজ করতে চায় সে সকল প্রতিষ্ঠানের কোনটি আজ বেঁচে নেই। ঐ সব প্রতিষ্ঠান হারিয়ে যাওয়ার পিছনে দায়ী এ দেশের নষ্ট রাজনৈতিক দল ও দুর্নীতিপরায়ন প্রশাসনের সহযোগিতার অভাব। আমাদের দেশ যতই অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাক না কেন। আর যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন দেশের দীর্ঘস্থায়ী টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত না করলে দেশকে কখনও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। দেশের মানুষের স্বার্থে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আর এক্ষেত্রে দরকার সত্যকার দেশপ্রেম ও আত্ম স্বার্থের উপরে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখা। দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার চেতনা ও বিবেকবোধ নিয়ে কাজ করা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক, সিংড়া নাটোর।
চলনবিল বার্তা chalonbeelbarta.com