জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সার্বিক অর্থনীতি: বাস্তবতার কঠিন চাপে বাংলাদেশ 

Spread the love
অধ্যাপক আব্দুল কাদের: 
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা আর অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের দ্বিমুখী অভিঘাতে আবারও চরম পরীক্ষার মুখে পড়েছে দেশের জ্বালানি খাত। সম্প্রতি দৈনিক জাতীয় পত্রিকাগুলোয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে পেট্রোলিয়াম পণ্য- বিশেষ করে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের মূল্য প্রতি লিটারে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধির অসংখ্য সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের নাড়া দিয়েছে। তবে পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন তথ্য-উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এক জটিল ও নজিরবিহীন অর্থনৈতিক উভসংকটের মুখোমুখি হয়েই এই পদক্ষেপে বাধ্য হয়েছে।
বিশ্বাবাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সবসময়ই বড় ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) এবং ব্লুমবার্গ কমোডিটি ইনডেক্স-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেল এবং পরিশোধিত তেলের স্পট মার্কেটে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে বৃদ্ধির পাশাপাশি শিপিং খরচ বা ফ্রেইট চার্জ এবং বিমা মাশুল উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহনের ব্যয় গত কয়েক মাসে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে এর পুরো খেসারত দিতে হচ্ছে। বিশ্ববাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী দামের প্রভাব সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ খুচরা বাজারে এসে পড়েছে।
জাতীয় পত্রিকাগুলোর প্রতিবেদন ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তির হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়লেও দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) দৈনিক শত কোটি টাকার ওপর লোকসান গুনতে হয়েছে।
বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার অর্থনৈতিক পাতায় প্রকাশিত তথ্য ও অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট মেয়াদের মধ্যে বিপিসির জমানো মুনাফা ও মূলধন থেকে প্রায় ২২,৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হিসেবে গলে গেছে। বিশেষ করে দেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই ডিজেল, যা গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন ও কৃষিকাজে সেচ দিতে ব্যবহৃত হয়। ডিজেলে প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান দ্বিগুণ অঙ্কে পৌঁছেছিল। সরকারের অর্থ বিভাগের পর্যালোচনা অনুযায়ী, সার্বিক বাজেট ঘাটতি কমানো এবং বিপিসির দেউলিয়া হওয়া রোধ করতেই রাষ্ট্র বাধ্য হয়ে এই মূল্য সমন্বয়ের কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র বিভিন্ন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বারবার একটি বিষয় উঠে এসেছে- তা হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্যের ভারসাম্যহীনতা। পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম ভারতে বা মিয়ানমারে বাংলাদেশের তুলনায় বহু আগে থেকেই বেশি ছিল।
পেট্রোলিয়াম অ্যানালিস্টদের মতে, বাংলাদেশ যখন বিপুল পরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা (ইউএস ডলার) ব্যয় করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল আমদানি করে ভর্তুকি মূল্যে বাজারে ছাড়ে, তখন ভারতের সীমান্তসংলগ্ন রাজ্যগুলোতে ওই তেলের মূল্য তুলনামূলক অনেক বেশি থাকে। সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচারের (Smuggling) একটি স্বাভাবিক প্রবণতা তৈরি হয়। কষ্টার্জিত রিজার্ভের টাকায় কেনা তেল যদি সীমান্ত পেরিয়ে পাশের দেশে চলে যায়, তবে তা দেশের অর্থনীতির জন্য দ্বিগুণ ক্ষতি। ভারতের সাথে দরগত ফারাক বা গ্যাপ কমিয়ে সীমান্ত পারের পাচার রোধ করাও এই দরবৃদ্ধির অন্যতম বড় নীতিগত যুক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে, তা সামলানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোতে ডলারের তারল্য সংকটের কারণে জ্বালানি আমদানির জন্য লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) বা ঋণপত্র খোলা কঠিন হয়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকেও তেলের বিল পরিশোধে হিমশিম খেতে হয়েছে।এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের সংকট।
 ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধপরবর্তী বৈশ্বিক গ্যাস সংকটের পর থেকে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যয় আকাশচুম্বী। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বজায় রাখতে সরকারকে এলএনজি আমদানিতে হাজার হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি গুণতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত থেকে পর্যায়ক্রমে ভর্তুকি কমিয়ে আনা এবং বিশ্ববাজারের সাথে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়ের (Automatic Pricing Mechanism) কাঠামোর দিকে যাওয়ার বাধ্যবাধকতাও এখানে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জ্বালানি তেলের এই দরবৃদ্ধি দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে (Inflation) আরও ত্বরান্বিত করবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতেই মূল্যস্ফীতি এমনিতেই উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পণ্য পরিবহন ভাড়া ও গণপরিবহন ভাড়া অবিলম্বে বৃদ্ধি পাবে, যার চূড়ান্ত বোঝা গিয়ে পড়বে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর। কৃষিকাজে সেচের খরচ বৃদ্ধি পেলে চালসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রবল।
তবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কেবল জ্বালানির দাম বাড়িয়ে বিপিসির লোকসান মেটানোই শেষ কথা হতে পারে না। এই সংকট উত্তরণে সরকারকে বহুমাত্রিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে:
১. কৃষি ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা: সেচ মৌসুমে কৃষকদের সরাসরি নগদ সহায়তা বা বিশেষ ভর্তুকিযুক্ত কার্ডের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
২. নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর: আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে।
৩. বিপিসির পরিচালনা দক্ষতা বৃদ্ধি: বিপিসির সিস্টেম লস, পরিবহন অপচয় ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর মাধ্যমে পরিচালনাগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যেন আন্তর্জাতিক বাজার কমলে তার সুফল দ্রুত নাগরিকরা পান।
৪. দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান: আমদানিকৃত এলএনজি ও জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে স্থলভাগ ও সাগরে দেশীয় গ্যাস ও জ্বালানি খনিজ অনুসন্ধানে স্থায়ী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির নাজুক অবস্থার কারণে সরকারের কাছে তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া হয়তো তাৎক্ষণিক বিকল্প কম ছিল। তবে এই কড়া অর্থনৈতিক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে দেশের সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা এবং দেশের উৎপাদন খাতকে সচল রাখা এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সমন্বিত নীতি, বাজার মনিটরিং এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার না করলে জ্বালানি খাতের এই ধাক্কা পুরো অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD