গুরুদাসপুরে দশ বছরে মাছ উৎপাদন  বেড়েছে তিনগুন

মোঃ আবুল কালাম আজাদ :  “নিরাপদ মাছে ভরবো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ”প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে রেখে গত ২৩ জুলাই থেকে ২৯ জুলাই/২২ সারা দেশের ন্যায় নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলাতেও জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ পালিত হলো। জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ পালন উপলক্ষ্যে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা একট সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে  জানানো হয়, জাতির পিতা বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে গনভবন লেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্যচাষকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেয়ার শুভ সূচনা করেছিলেন। ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন-“মাছ হবে এ দেশের দ্বিতীয়  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ।“জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার  দুরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেত্রীত্বে মৎস্যবান্ধব বিভিন্ন কর্মসুচি গ্রহনের ফলে  বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন আজ  সফল হয়েছে।মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য আনুযায়ী ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে মাছের মোট উৎপাদন ছিল ৭ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন । ৩৮ বছরের ব্যবধানে ২০২০-২১ অর্থবছরে  এই উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে  হয়েছে ৪৬ লাখ ২১ হাজার মেট্রিক টন। এই সময়ের ব্যবধানে মোট মৎস্য উৎপাদন প্রায় ৬ গুন বৃদ্ধি পেয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানান-প্রকৃতিক জলাশয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা,জীববৈচিত্র সংরক্ষন,পরিবেশবান্ধব ও উন্নত প্রযুক্তির্নিভর  র্কাযক্রম গ্রহনের ফলে দেশ আজ মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ংসর্ম্পুন্। জাতিসংঘের  খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রির্পোট অনুযায়ী বিগত ১০ বছরের হিসাবে মৎস উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। দেমের সাফল্য বিদেশের পরিমন্ডলেও স্বীকৃত।ইলিশ উৎপাদনকারী ১১ টি দেশের মধ্যে  বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম, অভ্যন্তরীন মুক্ত জলাশয়ে আহরণে তৃতীয়, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে  চর্তুথ এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম।তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চর্তুথ এবং এশিয়ার মধ্যে তৃতীয়। পাশাপাশি বিশ্বে  সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ক্রাষ্টাশিয়া ও ফিনফিশ উৎপাদনে  যথাক্রমে ৮ম ও ১২ তম স্থন অধিকার করেছে।চলনবিল অধ্যুসিত নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলায় ২০১০-১১ অর্থবছরে মৎস্য উৎপাদন ছিল ৬ হাজার ২৯ মেট্রিক টন  ১০ বছরের ব্যবধানে ২০২০-২১ অর্থবছরে  মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন।এই সময়ের ব্যবধানে মোট মৎস্য উৎপাদন প্রায় ৩ গুন বৃদ্ধি পেয়েছে।

উপজেলায় মাছের চাহিদা মেটানোর পরও প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন মাছ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বাজারজাত করা হচ্ছে।গুরুদাসপুর উপজলোর সফল মাছ চাষী উদ্যক্তাদের ব্যাক্তি  উদ্যগে প্রশাসনিক সকল বাধা উপক্ষো  করে ফসলি জমিতে পুকুর খনন করে  বিভিন্ন উন্নত  প্রজাতির  মাছ আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করে   মাছের উৎপাদনে নিরব বপ্লিব ঘটিয়েছে। গুরুদাসপুর উপজেলা মৎস অফিসের সুত্রে জানা  যায়,   ৯ টি  নদী যথাক্রমে  নন্দকুঁজা, আত্রাই,ছোট আত্রাই, গুমানি বেশানি মর্জিামামুদ, তুলসি গুড়, বিলকাঠোর , ৩টি খাল এবং ৬ টি বিল  থেকে প্রয় ১০১৬ মে.টন ,৩০ টি প্লাবন ভূমি থেকে ২৮৫ মে. টন  ও অন্যান্য  জলাশয় থেকে ২‘শ মে.টন সহ ১২ হাজার মে.টনেরও  বেশি মাছ উৎপাদন হয়েছে । যার আর্থিক মূল্য  গড়ে প্রতি  কেজি ৩০০/ টাকা করে হলে   ৩০০ কোটি টাকারও বেশী।  গুরুদাসপুর উপজেলা থেকেই প্রতি বছরে  একমাত্র মাছ উৎপাদনের আয় থেকেই ৩ শত কোটি টাকা জাতীয় আয়ের সাথে যুক্ত হচ্ছে ।  আগামিতে আরো বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে । এব্যাপারে গুরুদাসপুর উপজলো মৎস  দপ্তর থেকে  আগামী  পঞ্চর্বাষকিী পরিকল্পনায়  ২০২১-২২ নাগাদ  মাছের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা  ১০৬৭২.৩০ মে. টন ধরা হলেও উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার মেট্রিক টনেরো বেশি । বসেরকারী হিসেবে ২০২২-২৩ সাল নাগাদ  প্রকৃত উৎপাদন ২০ হাজার মে. টন ছাড়িয়ে  যাবে বলে  মাঠ র্পযায় জরিপে  আশা করা হচ্ছে ।

গুরুদাসপুর উপজেলায় ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ১৪  হাজার ৭৮৮জনের মাছের চাহিদা ৪ হাজার ৫ শত মে. টন । উৎপাদন হচ্ছে ১৫ হাজার মেট্রিক টন। উপজেলার চাহিদা মেটানোর পরও সাড়ে ১০ হাজার  মে.টন উদ্বৃত্ত থাকছে। উদ্বৃত্ত মাছ ব্যাবসায়ীদের নিজস্ব   উদ্ভাবতি পদ্ধতিতে ট্রাকে করে চলন্ত পুকুরের পানিতে  জীবন্ত মাছ   দেশের  অভ্যন্তরে রাজধানী ঢাকা, নারায়নগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করছে । এতে মাছ চাষী এবং ব্যাবসায়ীরা অনকে লাভবান হচ্ছে এবং ব্যাপক র্কমসংস্থান বেড়েছে , কমেছে বকোরত্ব।

গুরুদাসপুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য অফিসের বিগত দশ  বছরের মাছ উৎপাদনের   পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে – ২০১০-১১ সালে   ১৪১০ হেক্টর জলায়তন ৪৩২০ টি পুকুরে  মাছ উৎপাদন হয়েছ ৬২৯০ মে.টন । ১১-১২ সালে পুকুর ছিল ৪৩৯০ টি, জলায়তন ১৪৩০ হে. উৎপাদন ৬৫৪২ মে. টন । ১২- ১৩ সালে পুকুর ছিল ৪৫০০ টি, জলায়তন ১৪৫০ হে, উৎপাদন ৬৭১৫ মে.টন।  ১৩-১৪ সালে পুকুর ছিল  ৪৬২০ টি, জলায়তন ১৪৮৮ হে,  উৎপাদন ৭১৩৪ মে.টন । ১৪-১৫ সালে পুকুর ছিল ৪৬৮৫ টি,জলায়তন ১৫২০ হে. উৎপাদন ৭১৭২ মে.টন। ১৫-১৬ সারে পুকুর ছিল ৪৭৩২ টি, জলায়তন ১৫৫৮ হে, উৎপাদন ৭২০০ মে. টন। ১৬-১৭ সালে পুকুর ছিল ৪৭৬২ টি, জলায়তন ১৫৬১ হে. উৎপাদন ৭২২৫ মে. টন এবং ১৭-১৮ সালে পুকুর  সংখ্যা দাঁড়য়িছে  ৫৪৩৫ টি যার জলায়তন ৮ হাজার হেক্টরে  , মাছ উৎপাদন হযেছে ৯ হাজার মে.টনেএবং ২০২০-২১ সালে পুকুরের সংখ্যা ১০ হাজারে দাঁড়িয়েছে । জলায়তন ১হাজার ৪ ‘শ হেক্টর থেকে ৫ গুন বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর ।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে মাছ উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয় ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ ৩৪ হাজার টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪২ লাখ ৭৭ হাজার টন এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩ লাখ ৮১ হাজার টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের মৎস্য উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৬ দশমিক ২১ লাখ মেট্রিক টন। সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশে চলছে মাছের সুদিন।

২০১০ সালের সর্বশেষ খানা জরিপে জানা গেছে, বছরে বাংলাদেশে একেকজন মানুষ প্রায় ১২ কেজি মাছ খেতো। এখন সেটা ৩০ কেজিতে পৌঁছেছে। দেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। জিডিপিতে কৃষির অবদান কমলেও মৎস্য উপখাতের অবদান কিছুটা বেড়েছে। মোট জিডিপিতে মৎস্য উপখাতের অবদান ২০১৬-১৭ সালে ছিল ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। তা কিছুটা কমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে তা গত অর্থবছরে মৎস্য উপখাতের অবদান  বেড়ে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে টাকার অঙ্কে মৎস্য উপখাত থেকে জিডিপিতে যুক্ত হয়েছে ৮২ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৭৪ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ১০ শতাংশ।মৎস ও প্রনিসম্পদ মন্ত্রনালয়ের তথ্যে জানা যায়, গত ১০ বছরে দেশে মাথাপিছু  মাছ খাওয়ার পরিমান প্রায় শতভাগ বেড়েছে।২০১০ সালের সর্বশেষ খানা জরিপে উঠে এসেছে বছরে বাংলাদেশে একজন মানুষ মাত্র ১২ কেজি মাছ খেত। এখন সেটা পৌছেছে ৩০ কেজিতে।দেশে মাথাপিছু প্রতিদিন জনসংখ্যা অনুপাতে মাছ খাওয়ার পরিমান যেখানে ৬২ গ্রাম , সেখানে গুরুদসপুরের মানুষ পাচ্ছেন ৬৫ গ্রামের বেশী।  মৎস ও প্রনিসম্পদ মন্ত্রনালয়ের তথ্যে জানা যায়,বাংলাদেশ এখন মাছ চাষে স্বয়ংসম্পুর্ন। বর্তমান বিশ্বে  মাছ উৎপাদনে  বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা পুর্বাভাষ দিয়েছে,২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বে যে ৪ টি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। হারিয়ে যাওয়া অনেক প্রজাতির মাছ  গবেষ্নার মাধ্যমে এখন সরকারি- বেসরকারি ভাবে উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করা হচ্ছে।##

# আবুল কালাম আজাদ,সাংবাদিক ও কলামিষ্ট,  গুরুদাসপুর, নাটোর -০১৭২৪ ০৮৪৯৭৩,তারিখ- ১৬/৮/২০২২ ##  e mail- akalamazad7711@gmail.com.

 

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this:

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD