চলনবিলে পানি সংকট : খনন, সংরক্ষণ ও সংস্কারই আপাত সমাধান

Spread the love

আবুল কালাম আজাদ

‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যুমুনা’- এই শ্লোগানই ছিল বাংলাদেশের ঠিকানা বা পরিচিতি।অথবা জনপ্রিয় সেই গান ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী’ কিংবা বিখ্যাত সিনেমা ‘ পদ্মা নদীর মাঝি’ এখন কেবলই ইতিহাস। সেই প্রমত্তা পদ্মা শুকিয়ে নিজ অস্তিত্ব হারিয়ে মরা নদীতে পরিণত হয়েছে অনেক আগেই। এক সময়ের কুল কিনারাহীন পদ্মা নদীর বুকে জেগে উঠেছে বড় বড় চর। সেই সাথে পদ্মার সংগে সংযুক্ত প্রধান শাখা-প্রশাখা নদী বড়াল, আত্রাই্, নারদ ও গড়াই সহ ঐতিহাসিক চলনবিলের ও পাশর্^বতী এলাকার অন্তত ৮৫টি নদী পানিশুন্য হয়ে পড়েছে। এখন শুকনো নদ-নদীতে চাষ হচ্ছে বোরো ধান। এসব নদীতে পানি না থাকায় এলাকার মৎস্যজীবীরা বেকার হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে পানিসংকটে ব্যাহত হচ্ছে বোরোচাষসহ অন্যান্য ফসলের চাষাবাদ। মূলত: ভারতে গঙ্গা ও পদ্মা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের দরুন বাংলাদেশে পানি সংকট সমস্যার সূত্রপাত। অধিকন্ত ভারত থেকে আসা ৫৪টি নদীর গতিপথ ও জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের ফলে বিশেষত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল মরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আরো আছে চলনবিলে অপরিকল্পিত রাস্তা-ঘাট,বাঁধ-ব্রীজ ও কালভার্ট তৈরী এবং পুকুর খনন ও ভরাট সাথে অবৈধ, প্রকৃত উন্নয়ন বিরোধী স্থাপনা নির্মাণ। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে দেশের হাওর অঞ্চলে সরকারী তরফে আর রাস্তা নির্মাণ না করে উড়াল সড়ক সেতুর স্থাপনা চিন্তা করার মতো চলনবিলেও তেমনটি করার কথা ভাবতে হবে।
অপরদিকে এককালের অথৈ জলরাশির চলনবিল অঞ্চলে দ্রুত নিচে নামছে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর। আগামীতে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।নাটোর,সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার চলনবিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বড়াল,নন্দকুঁজা, আত্রাই,নাগর, বারনই, গুমানি, বেশানিসহ ২৬টি নদ-নদী এবং শত শত খাল জোলা সবগুলোর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় একদিকে মৎস্যজীবীরা বেকার হয়েছেন, অন্যদিকে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিক নেমে যাচ্ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে উত্তরাঞ্চলের খাদ্যভান্ডার বলে খ্যাত চলনবিলের কৃষি জমিতে সেচ কার্যক্রম। এমনকি ১০-১৫ ফুট মাটির গভিরে শ্যালো নামিয়েও স্বাভাবিক পানি উঠছে না। সেচ খরচ বাড়ছে দ্বিগুন। ফসল উৎপাদনে বাড়ছে বিরম্বনা।

এছাড়া পদ্মা, আত্রাই, বড়াল, নন্দকুঁজা, গুমানী, ভদ্র্রাবতী মুসাখাঁসহ অন্যান্য নদীর কোলের (নদীর যেখানে গভীর পানি থাকে) পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চলনবিলের ৮টি উপজেলা যেমন: নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম প্রায় ২০ হাজার, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর উপজেলার প্রায় ১৮ হাজার এবং সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, শাহজাদপুর এবং উল্ল¬াপাড়া উপজেলার ১৫ হাজারসহ অর্ধ লক্ষাধিক মৎস্যজীবী বেকার হয়ে পড়েছেন। নাটোর, পাবনা এবং সিরাজগঞ্জ জেলার মৎস্য কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। একই কারণে এ মুহুর্তে চলনবিলের মাছের বাজারগুলোতে চলছে চরম হাহাকার, মাছের অভাব প্রচন্ড। পানি না থাকায় মাছের সরবরাহ গেছে একেবারে তলানিতে নেমে। ফলে মাছের দাম অস্বাভাবিক চড়া। তবে সূত্রমতে, যারা মুসলিম সম্প্রদায়ের জেলে তারা বর্ষা মৌসমের ৪-৫ মাস মাছ শিকারের পরে খরা মৌসমে অন্য পেশার কাজ-কর্ম করতে পারে। হিন্দু ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জেলেদের বেশির ভাগ লোকই বেকার হয়ে পড়েন। সিংড়া উপজেলার সেরকোল শ্রীরামপুর জেলে পাড়ার বারু হাওলাদার জানান, প্রত্যেক বছর জানুয়ারী মাসে নদীর পানি কমে গেলেও নদীর (কোল বা দহ) পানি তেমন একটা কমে না। কিন্তু নিকট অতিতের চেয়ে এ বছরে দীর্ঘ সময় ধরে অনাবৃষ্টি এবং জলবায়ুর বিরুপ প্রভাবের কারণে জানুয়ারীর শুরুতেই নদ-নদির পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই সব জায়গার পানিও প্রায় শুকিয়ে গেছে। চলনবিলের চাপিলা ইউনিয়নের পুঠিমারী গ্রামের কৃষক মোক্তার আলী জানান, চৈত্র মাস আসতে না আসতেই শ্যালো এবং মটরগুলোতে পানি পাওয়া যায় না। এতে করে আমরা ঠিকমত পানি সেচ দিতে পারছি না। অল্প পানি উঠায় আমাদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি তাড়াশ থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক চলনবিল বার্তা পত্রিকায় খবরের শিরোনাম ছিল “পানির হাহাকার চলনবিলে”। এতে বলা হয়, বন্যা নেমে যাওয়ার পরেই চলনবিলের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো শুকিয়ে যায়। ফলে গোটা চলনবিলের কৃষি চাষাবাদ ভূগর্ভস্থ পানির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বর্তমানে ১০ফুট পর্যন্ত গর্ত খুরে শ্যালো মেশিন বসিয়ে পানি তুলতে হচ্ছে। এছাড়া বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যের চরম তাপদাহের সময় ১৩০ ফুট গভীরে শ্যালো পাইপ বসালেও পানি ওঠে অপ্রতুল।এ প্রসঙ্গে চলনবিলস্থ তাড়াশের ভেটুয়া গ্রামের কৃষকগণ বলেন, আমরা এ খরা মৌসুম ১৫ থেকে ২০ ফুট নীচে গভীর নলকুপ বসিয়ে পানির ব্যবস্থা করছি । এদিকে তাড়াশ উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. ওহীদুজ্জামান বলেন, ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে চলনবিলে প্রতিবছর পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। তাই চলনবিলের নদী-নালা, পুকুর ও খাল-জলাশয়গুলো গভীরভাবে খনন করা হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে।
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে জানা যায়, নারদ নদসহ আত্রাই, বারনই, নন্দকুজা, বড়াল, মুসাখাঁ, খলিশাডাঙ্গা, পচাঁবড়াল, গদাই, নাগর ও পদ্মা (কিছু অংশ)- এই ৮টি নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ার ফলে পানীয় জলের সংকট প্রকট হয়েছে। শুধুমাত্র নাগর, আত্রাই এবং পদ্মার কিছু অংশে পানি রয়েছে। চলনবিল রক্ষা আন্দোলন গুরুদাসপুর উপজেলা আহবায়ক মজিবুর রহমান মজনু বলেন,চলনবিলের প্রাণের উৎস নদ-নদিগুলো দখল-দুষণে ভরাট হয়ে যাওয়া এবং পানি না থাকা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। এখনি প্রস্তুতি না নিলে আগামীতে সেচ ও সুপেয় পানির সমস্যা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে।’ অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে খোলা জায়গা ও জলাধার কমে যাওয়া এবং নিয়ম না মেনে বেপরোয়াভাবে যত্রতত্র গভির নলকুপ, অগভির নলকপ, সাব মারসেবল পাম্প, শ্যালো মেশিন স্থাপন করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে অতিরিক্ত চাপের কারণেই এই সংকট বলে মনে করেন তিনি। নাটোর পৌরসভার মেয়র উমা চৌধুরী জলি, গুরুদাসপুর পৌর মেয়র শাহনেওয়াজ আলী, চাটমোহরের বড়াল রক্ষা আন্দোলনের আহবায়ক মিজানুর রহমান্,বড়াইগ্রামের শাপলা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আশরাফ-উজ জামান এবং রাজশাহীর রুলফাও সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন পানির সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, খরা মৌসুম এলেই চলনবিলে নিরাপদ পর্যাপ্ত পানির সংকটে পড়তে হয়। এসময় পৌর এলাকা সহ নদি অববাহিকা এলাকার টিউবওয়েল অকেজো হয়ে পড়ে। তাঁরা মনে করেন,সরকার যদি পানি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে নদী থেকে দূষণমুক্ত পানি উত্তোলন ও প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো সংরক্ষণে এখনি উদ্যোগ না নেয়, তাহলে সামনে কঠিন বিপদ অপেক্ষা করছে।’ একই বিষয় শতবর্ষী ডেল্টা প্লানের সাথেও যুক্ত করে এর সমাধান খোঁজা যেতে পারে।

নাটোর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী জানান, চলমান অর্থ বছরে নাটোরে তিনটি প্রকল্পে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে কাজ করছেন তারা। এগুলো হলো, সমগ্রদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ, পল্ল¬ী পানি সরবরাহ, অগ্রাধিকারমূলক গ্রামীণ পানি সরবরাহের কাজ চলমান রয়েছে। সূত্র জানায়, রাজশাহীর তুলনায় নাটোর জেলায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর তুলনামূলক ভাবে ভাল। খরা মৌসুমে রাজশাহীর নিকটবর্তী পবা উপজেলায় ১৯৮৫ সালে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল গড়ে ২০ ফুট ৬ ইঞ্চি। ১৯৯৫ সালে ৩০ ফুটের নিচে ও ২০১০ সালে পানির স্তর নেমে দাঁড়ায় প্রায় ৬৬ ফুটে।বরেন্দ্র নাটোর রিজিয়নের এক প্রতিবেদনে উলে¬খ করা হয় , নাটোরের সিংড়া উপজেলার হাতিয়ান্দহ ইউনিয়নের আচলকোট মৌজায় ২০১৩ সালে ১৩ জুলাই স্থিতিশীল পানির গভীরতা ছিল ১২ফিট ২ ইঞ্চি, ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই মাসে পানির গভীরতা নেমে দাঁড়ায় ১৩ ফিট ১ ইঞ্চিতে। অর্থাৎ প্রতিবছর প্রায় ১ফিট করে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। বিএডিসি নাটোর রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন,শ্যালো মেশিন মাটির ওপর থেকে ২৬ ফুট নিচ পর্যন্ত পানি তুলতে পারে। পানির স্তর অব্যাহত নিচে নামতে থাকলে একসময় শ্যালো টিউবওয়েলে পানি উঠবে না। সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার না করে বিকল্প উৎস ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে সেচ কমিটির নীতিমালা মানার তাগিদ দেন তিনি । অন্যথায় এক সময় খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
রাজশাহী পরিবেশ অধিদফতর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জানান, ‘ চলনবিলের নাটোরসহ রাজশাহী অঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে বোম-মোটর সংযুক্ত গভীর নলকূপ বসানো হচ্ছে। এছাড়াও নির্বিচারে গাছপালা ধ্বংস করার কারণে এ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে।’তিনি বলেন, সময় এসেছে চলনবিলের নদ-নদিগুলো দখল-দুষন মুক্ত করে জরুরি ভিত্তিতে খনন করে পানির রিজার্ভ স্থায়িত্বশীল রাখা। তা না হলে অদুর ভবিষ্যতে শুধু চলনবিল নয় সাড়া বাংলাদেশে সেচ ও সুপেয় পানির হাহাকার পড়ে যাবে এবং পরিবেশের বিশাল ও ভয়ংকর বিপর্যয় ঘটবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় অববাহিকা ভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এছাড়া এসডিজিতে পানি সম্পর্কিত বিষয়সহ পানির ব্যবহারে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে যাতে আন্তদেশীয় পানি বন্টন ও পানি ব্যবস্থাপনা সুষম ও ন্যায্যতাভিত্তিক হয়।
সবশেষে বিশেষ করে তাড়াশ উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে প্রাথমিকভাবে অন্তত একটি করে পুকুর বা দীঘি স্বচ্ছ পানির আধার হিসেবে চিহ্নিত করে সরকারীভাবে সর্বসাধারণের উন্মুক্ত ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত করলে ভাল হবে। তাছাড়া তাড়াশসহ চলনবিলের ছোটবড় নদী-খাল-বিল পূনখনন ও সংস্কার করে ভূপৃষ্ঠে পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের প্রচলন বাড়াতে পারলে এবং ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমাতে পারলে তা হবে পরিবেশের জন্য ইতিবাচক ও সহায়ক সেই সাথে তাড়াশ সহ বৃহত্তর চলনবিলের মানুষের াপনির অধিকার ও মানবাধিকার নিশ্চিত হবে।
[গত ২৫ এপ্রিল/২২ তাড়াশে পরিবর্তন কর্তৃক বিশ^ পানি দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে লেখক কর্তৃক এই নিবন্ধটি উপস্থাপিত হয়]

# আবুল কালাম আজাদ, সভাপতি , চলনবিল প্রেসক্লাব ,গুরুদাসপুর, নাটোর ,০১৭২৪ ০৮৪৯৭৩, তারিখ-২৫/০৪/২০২২

 

Please follow and like us:
Pin Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Website Design, Developed & Hosted by ALL IT BD